kalerkantho

মঙ্গলবার। ৫ মাঘ ১৪২৭। ১৯ জানুয়ারি ২০২১। ৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বিজয় ৭১

আবুল বাশার মিরাজ, বাকৃবি    

৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বিজয় ৭১

নির্মাণকাল : ২০০০ ভাস্কর : শ্যামল চৌধুরী

ছয় ফুট উঁচু বেদির ওপর এক কৃষক মুুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরেছেন আকাশ পানে। ডান পাশেই শাশ্বত বাংলার সংগ্রামী নারী কাঁধে রাইফেল নিয়ে দৃঢ়চিত্তে দিচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ডাক। অন্যদিকে তেজোদীপ্ত এক ছাত্র বাঁ হাতে রাইফেল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে গ্রেনেড ছোড়ার ভঙ্গিমায়। নতুন প্রজন্মের কাছে প্রেরণার উৎস হয়ে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তনের সামনে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ‘বিজয় ৭১’। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিসংগ্রামে বাংলার সর্বস্তরের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মূর্ত প্রতীক হয়ে আছে ভাস্কর্যটি।

পরম আকাঙ্ক্ষিত বিজয়ের চিহ্ন ‘বিজয় ৭১’ শুধু একটি ভাস্কর্য নয়, এটি বাঙালির প্রেরণার উৎস বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. লুৎফুল হাসান। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের সব ষড়যন্ত্র, ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে শহীদও হয়েছেন। নতুন প্রজন্মের কাছে সেসব ত্যাগের স্মৃতি ধরে রাখতেই বাকৃবি ক্যাম্পাসে এই ভাস্কর্যটি নির্মিত হয়। ড. লুৎফুল হাসান বলেন, ‘তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ হোসেনের কাছে আমরা ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি জানাই। মনে পড়ে, সে সময় উপাচার্যও এ ব্যাপারে অনেক আন্তরিক ছিলেন। ভাস্কর্য নির্মাণের জন্য ডাকা হলো বিখ্যাত ভাস্কর্য শিল্পী শ্যামল চৌধুরীকে। তিনি একটি নকশার পরিকল্পনা করে দিলেন, যা সবারই পছন্দ হলো। পরে ১৯৯৮ সালে তাঁর তত্ত্বাবধানে ভাস্কর্যটির  নির্মাণ শুরু হয়। নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০০০ সালের জুনে। ভাস্কর্যটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২৪ লাখ টাকা।’

উপাচার্য জানান, বিজয় দিবস সামনে রেখে ভাস্কর্যটি ঘিরে আরো নতুন কিছু কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভাস্কর শ্যামল চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে এটিকে আমরা নতুনত্ব দেওয়ার জন্য চেষ্টা করছি। তাঁর উপস্থিতিতে আজ শুক্রবার থেকে ভাস্কর্যটির সংস্কারকাজ শুরু হবে।

মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা ইতিহাসের সাক্ষী এই ভাস্কর্যটি অবলোকনে প্রতিদিনই অগণিত মানুষ ক্যাম্পাসে ভিড় জমায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাস সম্পর্কে জানাতে অনেকেই ছুটে আসে ‘বিজয় ৭১’-এর পাদদেশে। ভাস্কর্যটির পাদদেশ ব্যবহার হয় মঞ্চ হিসেবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা- কর্মচারীরা বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও প্রতিবাদ জানাতে জড়ো হন ‘বিজয় ৭১’ প্রাঙ্গণে। এখানেই দাঁড়িয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ জানানো হয়।

‘বিজয় ৭১’ নিয়ে অনুভূতি জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের শিক্ষার্থী হামীম সুহাইব বলেন, “আমরা নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। কিন্তু ভাস্কর্যের দিকে যখন তাকাই, তখন মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের কথা মনে করিয়ে দেয়। ‘বিজয় ৭১’-এর সামনে গিয়ে যখন দাঁড়াই তখন একজন তেজোদীপ্ত ছাত্র রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে আমাকে মনে করিয়ে দেয় আমি তরুণ, আমি ছাত্র। দেশের সেবার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাই আমার কর্তব্য। নারী স্তম্ভ অনুপ্রাণিত করে একসঙ্গে পথ চলার। পতাকা হাতে কৃষক আমাদের জানান দেন, আজ আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক।”

ঢাকা থেকে আসা দর্শনার্থী মিনার হোসেন বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গর্ব। মুক্তিযুদ্ধ না হলে আমরা স্বাধীন হতে পারতাম না। অনেক কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এসেছে আমাদের স্বাধীনতা। পৃথিবীর খুব কম দেশই আছে যারা আমাদের মতো এত ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে। ‘বিজয় ৭১’ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের কথা স্মরণ করে দেয়।”

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা