kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৭ মাঘ ১৪২৭। ২১ জানুয়ারি ২০২১। ৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

করোনার ভ্যাকসিন যুগে বিশ্ব

প্রথম দেশ হিসেবে ফাইজারের টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাজ্য

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৩ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




করোনার ভ্যাকসিন যুগে বিশ্ব

যে সুখবরের জন্য প্রায় এক বছরের প্রতীক্ষা, শেষমেশ তা পেয়েই গেল যুক্তরাজ্যের মানুষ; পরোক্ষভাবে বিশ্ববাসীও। করোনা মহামারি মোকাবেলায় বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে গণহারে টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়ে দিল ব্রিটিশ সরকার। এ ক্ষেত্রে নিজ দেশের টিকার (অক্সফোর্ডের) জন্য অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ করেনি; বরং যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফাইজার’ ও জার্মানির ‘বায়োএনটেক’ কম্পানির টিকাতেই আপাতত আস্থা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।

সবচেয়ে কম সময়ে টিকা তৈরির এই নজির গড়তে কম পরিশ্রম করেনি ফাইজার-বায়োএনটেক। তত্ত্ব থেকে বাস্তবতায় পৌঁছতে মাত্র ১০ মাস সময় নিয়েছে তারা। কোনো টিকা তৈরির ক্ষেত্রে ১০ বছরে সাধারণত যেসব ধাপ সম্পন্ন করতে হয়, এই ১০ মাসে সেগুলোর কোনোটিই বাদ দেয়নি তারা। তাদের অক্লান্ত সেই প্রচেষ্টার কল্যাণে শিগগিরই হয়তো স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে যুক্তরাজ্যের মানুষ; পর্যায়ক্রমে পুরো বিশ্বও।

এদিকে রাশিয়ার উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন ‘স্পুিনক-ভি’ আগামী সপ্তাহ থেকে সাধারণ মানুষের ওপর প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। যদিও এই ভ্যাকসিনটি প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা যথাযথভাবে সম্পন্ন করেনি বলে সমালোচনা রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের ওষুধ ও চিকিৎসা উপকরণ বিষয়ক নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমএইচআরএ জানিয়েছে, ‘বিএনটি১৬২বি২’ নামের এই টিকা কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে ৯৫ শতাংশ সুরক্ষা দেয়। এটি জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য নিরাপদ। ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক বলেছেন, ‘টিকা অনুমোদনের ক্ষেত্রে আমাদের ন্যূনতম যে মানদণ্ড রয়েছে, ফাইজারের টিকা তা পূরণ করেছে।’

মন্ত্রী জানান, আগামী সপ্তাহেই টিকার আট লাখ ডোজ পাওয়া যাবে। তবে ৫০ থেকে ৬০ লাখ ডোজ পাওয়া যাবে চলতি মাসেই। মন্ত্রী জানান, স্বাস্থ্যকর্মী ও বৃদ্ধাশ্রমে থাকা ব্যক্তিরা টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন।

এখন পর্যন্ত ছয়টি দেশে ৪৩ হাজার ৫০০ জনের শরীরে ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে। তাতে ঝুঁকিপূর্ণ কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এরই মধ্যে ফাইজারের চার কোটি টিকার ক্রয়াদেশ দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার, যা দিয়ে দেশটির দুই কোটি মানুষের চাহিদা মেটানো যাবে। তবে সবার টিকা নিশ্চিত করতে আগামী মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত সময় লেগে যাবে। মন্ত্রী বলেন, ‘আশা করি আগামী গ্রীষ্মটা আমরা একসঙ্গে কাটাতে পারব।’

প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, ‘এই টিকার মাধ্যমে আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব এবং আবারও অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারব।’

অবশ্য জনসন সরকারের চিকিৎসাবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন, টিকা হাতে পেলেও সামাজিক দূরত্ব কিংবা মাস্ক পরার মতো স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই মেনে চলতে হবে।

ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই টিকাদান কর্মসূচি চলবে তিনটি স্থানে—হাসপাতাল, টিকাকেন্দ্র ও অস্থায়ী কেন্দ্রে। বিভিন্ন কনফারেন্স হল ও খেলার মাঠ অস্থায়ী কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে।

যুক্তরাজ্যের গবেষকরা বলছেন, শিগগিরই হয়তো অক্সফোর্ডের টিকাও ব্রিটিশ সরকারের অনুমোদন পেয়ে যাবে। সেটা হতে পারে আগামী দু-এক মাসের মধ্যেই। ব্রিটিশ সরকার অক্সফোর্ডকে ১০ কোটি টিকার ক্রয়াদেশ দিয়েছে। দেশটির মোট জনসংখ্যা সাড়ে ছয় কোটির মতো।

ফাইজারের এই টিকা মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সংরক্ষণ করতে হয়। একজন ব্যক্তিকে ২১ দিনের ব্যবধানে দুটি ডোজ নিতে হবে। আর করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠতে সময় লাগবে কয়েক সপ্তাহ। এটি একটি নতুন ‘এমআরএনএ’ ধরনের টিকা। নভেল করোনাভাইরাসের জেনেটিক কোডের ক্ষুদ্র একটা অংশ দিয়ে এই টিকা বানানো হয়েছে। এ ধরনের (এমআরএনএ) টিকা এর আগে মানবশরীরে প্রয়োগ করা হয়েছে পরীক্ষামূলকভাবে। এবারই প্রথম এটি চিকিৎসার জন্য প্রয়োগ করা হবে।

ফাইজারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলবার্ট বোরলা বলেন, ‘ব্রিটিশ সরকারের এই স্বীকৃতি করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক একটা মুহূর্ত হয়ে থাকবে।’

গবেষকরা জানিয়েছেন, যে কয়েকটি টিকা শিগগিরই অনুমোদন পেতে পারে, তার মধ্যে মডার্নার একটি টিকাও আছে। সেটিও ‘এমআরএনএ’ ধরনের এবং ৯৫ শতাংশ কার্যকর। এ ছাড়া ‘স্পুিনক-ভি’ নামের একটি টিকা উৎপাদনের অনুমোদন দিয়েছে রাশিয়া। চীনের দুটি টিকাও পরীক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে টিকার দৌড়ে এখন পর্যন্ত ফাইজার-বায়োএনটেকই এগিয়ে থাকল। যুক্তরাজ্য স্বীকৃতি দেওয়ায় আরো অনেক দেশ সহজেই এই টিকাকে অনুমোদন দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে জরুরি বৈঠক ডেকেছে ‘ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সি’। ২৯ ডিসেম্বরের ওই বৈঠকে তারা খতিয়ে দেখবে, ফাইজার-বায়োএনটেকের এই টিকা জরুরি ভিত্তিতে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় কি না।

এদিকে বৈশ্বিক পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের ২১৩টি দেশ ও অঞ্চলে শনাক্ত কভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ছয় কোটি ৪৩ লাখে। মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১৪ লাখ ৯০ হাজার। সেরে ওঠার সংখ্যাও কম নয়; সাড়ে চার কোটির বেশি। চিকিৎসাধীন আছে এক কোটি ৮২ লাখ মানুষ। তাদের মধ্যে মৃদু উপসর্গ রয়েছে এক কোটি ৮১ লাখ মানুষের (৯৯.৪ শতাংশ)। বাকিদের (০.৬ শতাংশ) অবস্থা আশঙ্কাজনক। আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুর হার ৩ শতাংশ। সূত্র : বিবিসি, এএফপি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা