kalerkantho

শনিবার । ৯ মাঘ ১৪২৭। ২৩ জানুয়ারি ২০২১। ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

বিশেষজ্ঞ মত

মানবিক ঢাকার জন্যই বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা

হিসাম উদ্দীন চিশতী, নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরামর্শক, ড্যাপ প্রকল্প

১ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মানবিক ঢাকার জন্যই বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা

রাজউকের আওতায় এক হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার (ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ) বিস্তৃত এলাকা নিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকার ২০১০ সালের ১০ জুন ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) (২০১০-২০১৫) গেজেট আকারে প্রকাশ করে। ওই প্ল্যানকে আরো যুগোপযোগী ও মানবিক ঢাকা গড়ার লক্ষ্যে রাজউক খসড়া রিভাইজড ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (২০১৬-২০৩৫) প্রণয়ন করে। ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এবং দ্রুত বর্ধনশীল মহানগরের মধ্যে অন্যতম। খসড়া পরিকল্পনায় প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি ৬০ লাখ হবে। এসব মানুষের বাসস্থান, যাতায়াত, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন, কৃষি ও বন্যাপ্রবাহ এলাকা সংরক্ষণ এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সুরক্ষার লক্ষ্যে নানা প্রস্তাব রয়েছে।

ওই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিনিয়োগের সর্বজনীন স্বাধীনতা, উন্নত জীবনমান, সহনশীল শহর এবং বাস্তুসংস্থান সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবন। ঢাকা শহরের আয়তন গোটা দেশের আয়তনের ১ শতাংশ, অথচ এই শহর দেশের এক-দশমাংশ জিডিপি জোগান দেয় এবং দেশের প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ বাস করে। সুতরাং ঢাকা শহর হচ্ছে এই দেশের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। জনবহুল এই শহরের জন্য পরিকল্পিত আবাসন এবং কর্মসংস্থানের জোগান দেওয়াটা এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা বাসস্থান ও শিল্পায়ন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অবদান অতুলনীয়। যেসব শিল্প লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানসহ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করছে, সেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে আজকের বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে রয়েছে। সেই ক্ষেত্রে টেকসই পরিবেশসম্মত উপায়ে যাতে বিনিয়োগ করতে পারে, সে লক্ষ্য অর্জনে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা বিনস্ত করা হয়েছে। নিম্ন-নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের ভবনের নির্মাণ অনুমোদন সহজ যেমন—এর আগে ২.৫ মিটার প্রশস্ত রাস্তার নিচে কোনো ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার বিধান ছিল না, অথচ পুরাতন ঢাকাসহ ঢাকা শহরের প্রায় ৩৬ শতাংশ রাস্তার প্রশস্ততা ২.৫ মিটার নিচে। সমাজের সেই সুবিধা বঞ্চিত মানুষ যাতে আইনের আওতায় এসে ভবন নির্মাণের অনুমোদন পায়, সেই সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি উদ্যোক্তার পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তারা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আবাসনের জোগান দিতে উৎসাহিত হয়, সেই লক্ষ্যে ফার

(FAR) বোনাসের প্রস্তাব করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর, অথচ বাসযোগ্যতার মানদণ্ডে ঢাকার নিচের দিকে যেখানে একটি শহরের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ জায়গা রাস্তা কিংবা পরিবহন যোগাযোগের জন্য থাকা প্রয়োজন, সেখানে ঢাকার বিদ্যমান রাস্তার পরিমাণ মোট আয়তনের প্রায় ৫.১৫ শতাংশ। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নীতকরণের জন্য প্রস্তাব রয়েছে দুই হাজার ৭৪৯ কিলোমিটার সড়কপথের, যার প্রথম পর্যায়ে ৫৬৭ কিলোমিটার এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৭৬০ কিলোমিটার নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। গোটা ঢাকা শহরকে ব্লু-নেটওয়ার্ক আওতায় আনার লক্ষ্যে ৫৬৬ কিলোমিটার জলপথ সংযোগের সুপারিশ করা হয়েছে। পানিপ্রবাহ যাতে বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য বক্স কালভার্ট নির্মাণকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এ ছাড়া পুরো ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানের আওতাভুক্ত এলাকাকে ৭৫টি উপ-অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ঢাকার ওপর চাপ কমাতে  প্রতিটি উপ-অঞ্চলভিত্তিক স্কুল নির্মাণ, পার্ক এবং কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। নাগরিক সুবিধা বিবেচনায় ভবনের উচ্চতা নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। ব্লকভিত্তিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করা হয়েছে। কারণ ব্লকের অভ্যন্তরে নাগরিক সুবিধাদি সংস্থানের সঠিক সুযোগ পাওয়া যায়। এ ছাড়া ভূমির পুনঃ উন্নয়ন, ভূমির পুনর্বিন্যাস, উন্নয়ন স্বত্ব প্রতিস্থাপন পন্থা (জলাশয় রক্ষাসংক্রান্ত পরিকল্পনা), ট্রানজিটভিত্তিক (পরিবহনের স্টেশন) উন্নয়নসহ বেশ কিছু নতুন কর্মকৌশল যুক্ত করা হয়েছে, যেগুলো আগের কোনো পরিকল্পনায় ছিল না। নগরজীবন রেখাকে খসড়া পরিকল্পনায় গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যেমন—সড়কপথ, জনপথ ও রেলপথকে গুরুত্ব দিয়ে একটি সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে থাকবে সব ধরনের মানুষের প্রবেশাধিকার, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দের নিশ্চয়তা। রায়েরবাজার খাল, কল্যাণপুর খালসহ তিনটি খালকে নগর জীবন রেখা হিসেবে রূপান্তর করার লক্ষ্যে বিশদ নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে; যাতে ড্যাপ গেজেট প্রকাশের পরই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া যায়।

ঢাকা শহরের বিদ্যমান জনসংখ্যার অনুপাতে স্কুল-কলেজ, খেলার মাঠ, পার্ক, পরিবহন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার সংকট রয়েছে। যানজট ও জলজট নিত্যদিনের সঙ্গী। এই সমস্যা নিরসনে রিভাইজড ডিটেইলড প্ল্যানে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব করা হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে সিএস, আরএস এবং মহানগর জরিপে চিহ্নিত খালগুলোকে উদ্ধারের বিষয়ে জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে জলকেন্দ্রিক পার্ক নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় ঢাকার ওপর চাপ কমিয়ে পুরো ঢাকার সুষম উন্নয়নে এলাকাভিত্তিক জনঘনত্ব জোনিং কিংবা ভবনের উচ্চতাবিষয়ক সুপারিশমালা সব স্টেকহোল্ডার এবং জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে খসড়া প্রস্তাব সংশোধন করা হবে। বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়ে এবং গণশুনানি থেকে পাওয়া মতামত পর্যালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ২০৪১ সালের মধ্য উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করে একটি বাস্তবসম্মত ও জনকল্যাণমুখী ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান চূড়ান্তকরণ করার লক্ষ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নেতৃত্ব কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আশা করা যায়, বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানবিক ঢাকা গড়ার স্বপ্ন পূরণ হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা