kalerkantho

শনিবার। ২ মাঘ ১৪২৭। ১৬ জানুয়ারি ২০২১। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

জীবনমঞ্চ ছেড়ে অন্যলোকে আলী যাকের

‘হামার মরণ হয় জীবনের মরণ যে নাই’

আজিজুল পারভেজ   

২৮ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘হামার মরণ হয় জীবনের মরণ যে নাই’

রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আলী যাকেরের প্রতি সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘পুন্নিমায় চান বড় হয় রে ধবল। জননীর দুগ্ধের মতন তার দ্যাখোঁ রোশনাই। ভাবিয়া কি দেখিবো, আব্বাস, যদি মরোঁ, কোনো দুঃখ নাই। হামার মরণ হয়, জীবনের মরণ যে নাই।’

কাব্যনাটক ‘নূরলদীনের সারা জীবন’-এ এই সংলাপ উচ্চারণ করতেন তিনি কণ্ঠের মাধুর্য দিয়ে। সত্যিই তো কীর্তিময় যে জীবন, সে জীবনের কি মৃত্যু হয়? হয় না। সে জীবন অমর। সেই অমরত্বের পথেই যাত্রা করলেন আলী যাকের; যিনি মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে দাপুটে অভিনয়ের জন্য দর্শক হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।

প্রায় চার বছর ধরে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন এই মুক্তিযোদ্ধা। সম্প্রতি আক্রান্ত হয়েছিলেন করোনাভাইরাসে। চিকিৎসা নিচ্ছিলেন রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে। সেখানেই গতকাল শুক্রবার সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে জীবনের মঞ্চ ছেড়ে অনন্তলোকে পাড়ি জমান একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক, অভিনেতা ও নির্দেশক আলী যাকের। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।

সকাল ১১টার দিকে শেরেবাংলানগরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে নিয়ে যাওয়া হয় আলী যাকেরের মরদেহ; যিনি এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম ট্রাস্টি। জাদুঘর প্রাঙ্গণে তাঁর কফিন জাতীয় পতাকায় মুড়ে দেন জাদুঘরের ট্রাস্টিরা। সেখানে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন স্ত্রী সারা যাকের, ছেলে ইরেশ যাকের এবং আলী যাকেরের অভিনয় জীবনের বন্ধু সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। আলী যাকেরের মেয়ে শ্রিয়া সর্বজয়া এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন।

প্রথমে রাষ্ট্রের পক্ষে তাঁর কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। পরে তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানিয়ে দেওয়া হয় গার্ড অব অনার। এরপর একে একে ভক্ত-অনুরাগী, বন্ধু ও বিশিষ্টজনরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান শক্তিমান এই অভিনেতাকে। সেখান থেকে বনানীর উদ্দেশে শেষযাত্রা।

বনানীতে প্রথমে নিজের বাসায় ও পরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এশিয়াটিক কার্যালয়ে নেওয়া হয় মরদেহ। এরপর আসরের নামাজের পর জানাজা শেষে রাজধানীর বনানী কবরস্থানের সবুজ মাটিতে সমাহিত করা হয় তাঁকে। মৃত্যুর দুই দিন আগেই তাঁর করোনা শনাক্ত হওয়ায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে সর্বস্তরের শ্রদ্ধা নিবেদনের অনুষ্ঠানটি বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ছেলে অভিনেতা ইরেশ যাকের।

বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন আলী যাকের। তবে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন অভিনয়ে। মুক্তিযোদ্ধত্তোর বাংলাদেশের গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র তিনি। এ দেশের নবনাট্য আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা। শিল্পের আলোকচ্ছটা ছড়িয়েছেন অভিনয় মঞ্চে। তাঁর হাত ধরেই বাংলার মঞ্চে উদ্ভাসিত হয়েছে বিশ্বনন্দিত নাটক। যেমন উঠে এসেছে সৈয়দ শামসুল হকের লেখা বাংলার লড়াকু কৃষকসংগ্রামী নূরলদীন, তেমনি উঠে এসেছে শেকসপিয়ারের গ্যালিলিও। নূরলদীনের সারা জীবনে ‘জাগো বাহে কোনঠে সবায়...’ তাঁর এই বিপ্লবী আহ্বান মানুষের মনে গেঁথে আছে। ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার পরও মঞ্চে সক্রিয় ছিলেন এই পরাক্রমশালী অভিনেতা। এ কারণে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ মঞ্চশিল্পীদের কাছে আরো বেশি বেদনার, হাহাকারের। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর জাতীয় নাট্যশালার এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে ‘গ্যালিলিও’ নাটকে নাম ভূমিকায় প্রাণবন্ত অভিনয়ের মাধ্যমে বিস্ময় জাগিয়েছিলেন, মুগ্ধ করেছিলেন দর্শকদের।

মঞ্চে নূরলদীন, গ্যালিলিও ও দেওয়ান গাজীর চরিত্রে আলী যাকেরের অভিনয় দর্শকদের মনে স্থায়ী আসন গেড়ে আছে। ‘বহুব্রীহি’, ‘তথাপি পাথর’ ও ‘আজ রবিবার’ টিভি নাটকে অভিনয় করেও তিনি ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছেন। ‘অচলায়তন’, ‘বাকী ইতিহাস’, ‘সৎ মানুষের খোঁজে’, ‘তৈল সংকট’, ‘এই নিষিদ্ধ পল্লীতে’, ‘কোপেনিকের ক্যাপ্টেন’সহ বেশ কয়েকটি মঞ্চ নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন। কয়েকটি নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। বিকল্পধারার চলচ্চিত্র ‘আগামী’, ‘নদীর নাম মধুমতী’, ‘লালসালু’ ও ‘রাবেয়া’য় তিনি অভিনয় দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বেতারে অর্ধশতাধিক শ্রুতি নাটকেও কাজ করেছেন।

আলী যাকেরের জন্ম ১৯৪৪ সালের ৬ নভেম্বর চট্টগ্রামের রতনপুরে। তবে তাঁর পৈতৃক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে। মহকুমা প্রশাসক বাবার চাকরির সুবাদে তিনি কুষ্টিয়া ও মাদারীপুরে শৈশব কাটিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর আলী যাকের প্রথমে ভারতে গিয়ে রণাঙ্গনের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। চলচ্চিত্র পরিচালক ও সাংবাদিক আলমগীর কবির তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেন প্রচারযুদ্ধে অংশ নিতে। তখন তিনি যুক্ত হন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। যুদ্ধ শেষে দেশে ফেরার পর যোগ দেন এশিয়াটিককে দাঁড় করানোর কাজে। অভিনেতা, নির্দেশক মামুনুর রশীদের সঙ্গে তখন তাঁর দারুণ বন্ধুত্ব। সেই সূত্র ধরেই ১৯৭২ সালে আরণ্যক নাট্যদলের হয়ে মামুনুর রশীদের নির্দেশনায় মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন আলী যাকের; শুরু হয় মঞ্চে তাঁর পথচলার। নাটকটি প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে। সেই নাটক দেখে পরে জিয়া হায়দার ও আতাউর রহমান তাঁকে নিয়ে যান তাঁদের দল নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে। সেখানে তিনি আতাউর রহমানের নির্দেশনায় ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আলী যাকের এই নাট্যদলের সভাপতি ছিলেন।

অভিনয়, নির্দেশনা ও নাট্যসংগঠকের ভূমিকার বাইরে তিনি যুক্ত ছিলেন লেখালেখির সঙ্গেও। নাটকে অবদানের জন্য ১৯৯৯ সালে সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ দ্বিতীয় বেসামরিক সম্মান ‘একুশে পদকে’ ভূষিত করে। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী পদক, নরেন বিশ্বাস পদকসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।

বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিক থ্রিসিক্সটির কর্ণধার ছিলেন আলী যাকের। তিনি ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী। ফুল, পাখি, প্রকৃতি নিয়ে তিনি কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন। এসব নিয়ে তাঁর বইও প্রকাশিত হয়েছে। তিনি শৌখিন ফটোগ্রাফার ছিলেন। সেই সূত্রে যুক্তরাজ্যের রয়াল ফটোগ্রাফিক সোসাইটিরও সদস্য ছিলেন।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক

কীর্তিমান এই নাট্যজনের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদসহ বিশিষ্টজনরা। রাষ্ট্রপতি এক শোকবার্তায় বলেন, ‘বরেণ্য অভিনেতা আলী যাকের ছিলেন দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর মৃত্যুতে দেশ একজন বরেণ্য অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে হারাল।’

পৃথক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ, দেশের শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আলী যাকেরের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

বিশিষ্টজনদের শ্রদ্ধা

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আলী যাকেরের কফিনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান দলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। এ ছাড়া শ্রদ্ধা জানায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শিল্পকলা একাডেমি, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, উদীচী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সংগঠন। সতীর্থ নাট্যযোদ্ধাকে শেষ বিদায় জানাতে উপস্থিত ছিলেন নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার, মামুনুর রশীদ, নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী, মফিদুল হক প্রমুখ। দীর্ঘজীবনের সহযাত্রী নাট্যব্যক্তিত্ব ও সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর শ্রদ্ধানুষ্ঠান পরিচালনা করেন।

মন্তব্য