kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ২০২০

এবার নির্ভার ঢাকা

মেহেদী হাসান   

২৬ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



এবার নির্ভার ঢাকা

২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী ছিলেন হিলারি ক্লিনটন। গ্রামীণ ব্যাংক, ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে মতপার্থক্যের পটভূমিতে তাঁর প্রার্থিতার বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি ছিল সরকারসহ বিভিন্ন মহলে। সেই নির্বাচনে হিলারির প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়েও নানা সংশয় ও দ্বিধা ছিল মুসলিম বিশ্বে। নির্বাচনের পর বিজয়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানানো মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে প্রথমেই ছিল বাংলাদেশ। ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাঠানো বার্তা পশ্চিমা গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিল। মুসলিম দেশগুলো ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানাতে যখন স্পষ্টতই দ্বিধান্বিত ছিল, তখন বাংলাদেশের অভিনন্দনবার্তায় ‘আমেরিকান জনগণ ও বিশ্বমানবতার সেবায় অনন্য নেতৃত্বের’ প্রশংসা ছিল।

চার বছর পর আগামী সপ্তাহে যখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশ কার্যত নির্ভার। নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তন হলেও তা নিয়ে বিশেষ কোনো দুশ্চিন্তা নেই বাংলাদেশের।

ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার করতে চায় বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রে যিনিই ক্ষমতায় আসুন না কেন, তাঁর সঙ্গেই বাংলাদেশ কাজ করবে। বাংলাদেশ তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, বিশেষ করে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরো জোরালো উদ্যোগ আশা করে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ডেপুটি সেক্রেটারি স্টিফেন বিগান এ মাসের মাঝামাঝি বাংলাদেশ সফরকালে কথা দিয়েছেন, আগামী মাসে মিয়ানমারে নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে দেশটিকে চাপ দেবে। যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে (আইপিএস) বাংলাদেশের সহযোগিতা চায়।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করে বাংলাদেশ অভ্যস্ত। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত পাঠানো, বাণিজ্যসুবিধা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। রাশেদ চৌধুরীর ইস্যুটি আইনি বিষয় এবং এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে। বাণিজ্যসুবিধার বিষয়টিও দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও পর্যালোচনার বিষয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরো অগ্রগতির সুযোগ আছে বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের বড় আকারের কোনো প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ার কথা নয়। যদি ট্রাম্পের রিপাবলিকানরা আবারও যুক্তরাষ্ট্রে সরকার গঠন করে, তাহলে ডেপুটি সেক্রেটারি স্টিফেন বিগান যা বলার তা তো বলেই গেছেন। যুক্তরাষ্ট্র এখন আমাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রাখতে চাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘যদি জো বাইডেনের ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় আসে তাতেও বড় আকারে কোনো পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। তখন আমাদের দেখতে হবে, জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বড় ধরনের কোনো উদ্যোগ নেয় কি না। তবে ট্রাম্প বা বাইডেন যিনিই প্রেসিডেন্ট হন না কেন, আমার মনে হয় না সম্পর্কে বড় পরিবর্তন আসবে।’

বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে ২০১৬ সালের নির্বাচনের সঙ্গে এবারের নির্বাচনের পার্থক্য বিষয়ে জানতে চাইলে ড. ইমতিয়াজ বলেন, ‘হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটা সম্পর্ক ছিল এবং আমাদের পত্রপত্রিকা বিষয়টি বেশি ফোকাস করেছিল। এবারের নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন ফ্যাক্টর নেই। তাই এখানে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন হওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।’ তিনি বলেন, ‘হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে আমাদের দেশের একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল বিভিন্ন কারণে। জো বাইডেন বা ডেমোক্র্যাটদের ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমালা হ্যারিসের সঙ্গে সে ধরনের সম্পর্ক নেই। রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারা কী করবে সে বিষয়ে আমাদের চিন্তা। মিয়ানমার যদি রোহিঙ্গা সংকট সমাধান না করে তবে তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করবে কি না সে বিষয়ে আমাদের আগ্রহ থাকবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা অতীতে দেখেছি, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুর প্রভাব থাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে। আবার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের যে ধারাটি দেখেছি সেটা কিন্তু গত এক দশক ধরে ওবামা প্রশাসন ও ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগামী নির্বাচনে যিনিই ক্ষমতায় আসুন না কেন এটি সেভাবে পরিবর্তন হবে না। কারণ এর সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ জড়িত।’ তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র ও সরকার—দুটির স্বার্থের মধ্যে একটু পার্থক্য আছে। সে কারণে আমি মনে করি, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে গুণগত কোনো পরিবর্তন আসবে না।’

লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে হয়তো আমাদের একটু অন্য ধরনের চিন্তা ছিল। আমি মনে করি, এবার বিশেষ কোনো প্রার্থীকেন্দ্রিক চিন্তা বাংলাদেশের নেই। বাংলাদেশের এখন বড় পরিসরে লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততাকে কিভাবে নিশ্চিত করা যায়।’

এদিকে ট্রাম্পের আমলে প্রবর্তিত ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির’ (আইপিএস) আওতায় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক নিয়ে চীন উদ্বিগ্ন। লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, যখনই যুক্তরাষ্ট্র তার আইপিএস প্রবর্তন করেছে, তখনই কিন্তু বলা হচ্ছে যে এটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) প্রতিযোগী। এ ধরনের একটি চিন্তা কিন্তু সব মহলেই আছে। এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অংশ। একটি রাষ্ট্র সম্পৃক্ততা বাড়ালে আরেকটি রাষ্ট্রের জন্য চিন্তার বিষয় হয়। চীন হয়তো সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প বা জো বাইডেন—যিনিই ক্ষমতায় আসুন না কেন, তাঁদের বড় মনোযোগ দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে। বিশেষ করে, কভিড পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিকভাবে বেশ নাজুক অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র। এর বাইরে বিশ্বের দিকে তাঁরা যে মনোযোগ দেবেন, তাতে আমাদের দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ধারা পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।’

হুমায়ুন কবির বলেন, ‘যুক্তরা    ষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের স্বার্থের বিষয় হলো ব্যবসা-বাণিজ্য। এ ক্ষেত্রে সরকারে যে-ই থাকুক না কেন তাতে প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সম্প্রদায় যে রেমিট্যান্স পাঠায় সেটিতেও প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না। তবে বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতি সহজ করার কথা বলছেন। এটি হলে এবং আমাদের যে অনিবন্ধিত বাংলাদেশিরা যুক্তরাষ্ট্রে আছেন, তাঁরা সবাই বৈধ হওয়ার সুযোগ পেলে আমাদের জন্য ভালো। অবৈধ বা অনিবন্ধিত অভিবাসীদের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান কঠোর।’ তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদে পুনর্নির্বাচিত না হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রকে আবার ‘ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপে (টিপিপি)’ ফেরাতে পারেন। হুমায়ুন কবির আরো বলেন, বাংলাদেশ এখনো আইপিএসে খুব বেশি সক্রিয় নয়। যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরো ভূমিকা চাইলে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিনিয়োগ চাইতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ডেভিস ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড ফরেন পলিসির এশিয়ান স্টাডি সেন্টারের পরিচালক ওয়াল্টার লোম্যানের মতে, ট্রাম্প বা বাইডেন যিনিই নির্বাচনে জয়ী হন না কেন যুক্তরাষ্ট্রের আইপিএসে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তিনি তিনটি প্রেক্ষাপটের কথা বলেছেন। যদি ট্রাম্প আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ সিনেট ও ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিসভা থাকে তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বদলাবে না। ট্রাম্পের চীনবিরোধী অবস্থান নেওয়া অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে বাইডেন প্রেসিডেন্ট হলে এবং সিনেটে রিপাবলিকানদের ও প্রতিনিধিসভায় ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে বাইডেন শিবিরেই তুমুল প্রতিযোগিতা দেখা দেবে। একটি পক্ষ ওবামার চীন নীতি অনুসরণ করতে চাইবে। আরেকটি পক্ষ চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দৃষ্টি দেবে। চীনের বিষয়ে তিনি যে উদ্যোগই নেন না কেন তা শক্তিশালী বলে বিবেচিত হবে না।

ওয়াল্টার লোম্যান মনে করেন, বাইডেন প্রেসিডেন্ট হলে এবং ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠ সিনেট ও প্রতিনিধিসভা থাকলে সংখ্যালঘু রিপাবলিকানরা বাইডেনের চীন নীতির সমালোচনা করবে। কিন্তু সিনেটে নিয়ন্ত্রণ না থাকায় তাঁরা নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারবেন না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা