kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

আইনের বাতিঘর নিভে গেল

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৫ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আইনের বাতিঘর নিভে গেল

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, জন্ম : ২ নভেম্বর ১৯৩৫, মৃত্যু : ২৪ অক্টোবর ২০২০

আইনের বাতিঘর সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আর নেই। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৮টায় ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) তিনি। রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। একমাত্র ছেলে ব্যারিস্টার ফাহিম-উল হকসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন তিনি। গতকাল বিকেলে বনানী কবরস্থানে স্ত্রী ডা. ফরিদা হকের কবরের পাশে তাঁর লাশ দাফন করা হয়।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এমপি, কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহ্মুদ, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকসহ মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান পৃথকভাবে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের পক্ষ থেকেও গভীর শোক প্রকাশ করা হয়।

রফিক-উল হকের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় আদ্-দ্বীন হাসপাতালে। তিনি আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন। গতকাল সকালে সেখানে জানাজা শেষে মরদেহ নেওয়া হয় তাঁর পল্টনের বাসায়। সেখানে দুপুর ১টা পর্যন্ত রাখা হয়। এরপর সেখান থেকে নেওয়া হয় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে। সেখানে বাদ জোহর জানাজা শেষে নেওয়া হয় তাঁর চিরচেনা আইনাঙ্গন সুপ্রিম কোর্টে। দুপুর সোয়া ২টায় সেখানে জানাজা শেষে নেওয়া হয় বনানী কবরস্থানে। সেখানেই তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণের জানাজায় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনসহ আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু এমপিসহ আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং আইনজীবীরা অংশ নেন। এরপর তাঁর কফিনে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্ট, বিএনপি, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক অসুস্থ হলে গত ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়। এরপর তিনি কিছুটা সুস্থ বোধ করলে গত ১৭ অক্টোবর সকালে পল্টনের বাসায় ফিরে যান। তবে ওই দিনই দুপুরের পর তাঁকে আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর গত ১৯ অক্টোবর তাঁর করোনা পরীক্ষা করা হয়। করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ এলেও তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ২০ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টার পর তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। এরপর থেকে গত কয়েক দিন তিনি সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর শোকবার্তায় বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয়ে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক নানা পরামর্শ দিতেন। তিনি বলেন, ২০০৭ সালে তত্কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁকে মিথ্যা মামলায় বন্দি করেন। সেই দুঃসময়ে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক তাঁকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে আইনি লড়াইয়ে এগিয়ে আসেন। তাঁর অবদান গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি। মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী।

রফিক-উল হকের মৃত্যুতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক চলে যাওয়ায় আইন অঙ্গনের বিরাট ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা বিএনপির পক্ষ থেকে, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি, তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।’

ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের জুনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহসানুল করীম বলেন, ‘ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ছিলেন একজন আদর্শ সিনিয়র আইনজীবী, অভিভাবক, পিতা। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সকল পর্যায়ের মানুষের। তিনি ছিলেন সর্বজনীন। কোনো জুনিয়র ভুল করলে যেমন বকা দিতেন, তেমনি আবার আদর করে কাছে ডেকে নিতেন। আমি ভাগ্যবান যে তাঁর মতো একজন সিনিয়র পেয়েছিলাম। দেশের সকল ক্রান্তিকালে তিনি দিশা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ওয়ান ইলেভেনের সময় রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পক্ষে মামলা করেছেন। সে সময় তাঁর জুনিয়র হিসেবে সব সময় পাশে পাশে থেকেছি।’

রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড কিংবা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের কাজে বা কথায় উল্টোপাল্টা কোনো কিছু দেখলেই তিনি সরব হয়েছেন। সমালোচনা করতে দ্বিধা করেননি। শুধু সমালোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, সঙ্গে বাতলে দিয়েছেন উত্তরণের পথও। দেশের যে কোনো সংকটের সময় এগিয়ে এসেছেন। কেউ শুনুক আর না শুনুক, তিনি এ কাজটি করে গেছেন নিয়মিত। এ জন্য তাঁকে কখনো কখনো তির্যক কথাও শুনতে হয়েছে। তার পরও তিনি থেমে যাননি। কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আইনি প্রতিকার পাওয়ারও পথ করে দিয়েছেন তিনি। তবে তাঁর শেষ আক্ষেপ ছিল দুই নেত্রীকে একসঙ্গে বসাতে না পারার।

রফিক-উল হকের জীবনী

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর কলকাতার সুবর্ণপুর গ্রামে জন্ম নেন। তাঁর বাবা মুমিন-উল হক ছিলেন চব্বিশ পরগনা (বর্তমান কলকাতা) মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান। আর মা নূরজাহান বেগম ছিলেন গৃহিণী। তিনি ইসলামিয়া কলেজ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন ১৯৫১ সালে। এই কলেজের ছাত্র ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ১৯৫৭ সালে দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এ সময় তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে পর পর দুইবার সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে এলএলবি পাস করেন। এরপর আইনজীবী হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টে আইন পেশা শুরু করেন। ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্য থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে তত্কালীন পাকিস্তানের নাগরিক হয়ে চলে আসেন ঢাকায়। ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট, ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্ট এবং ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফৌজদারি আইন নিয়ে পড়াশোনা করে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদকও পেয়েছিলেন।

পেশাগত জীবনে রাজনীতি না করলেও রফিক-উল হক ছাত্রজীবনে রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। ওয়েস্ট বেঙ্গল যুব কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। তখন ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন সেন্ট্রাল যুব কংগ্রেসের সভাপতি। কলকাতায় পড়ার সময় তাঁর বন্ধু ছিলেন ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। ছাত্রজীবনে তিনি ইন্দিরা গান্ধী, নেহরু ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্য পেয়েছেন।

নিজের প্রজ্ঞা ও মেধা দিয়ে দেশের উচ্চ আদালতকে সহযোগিতা করে অনেকবার হয়েছেন আদালতের বন্ধু (অ্যামিকাস কিউরি)। ১৯৯০ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা (অ্যাটর্নি জেনারেল) ছিলেন। ১৯৭৭ সালে কম্পানি আইন সংস্কার কমিটির সদস্য, ১৯৮৪ সালে অর্থ, ব্যাংকিং এবং ঋণসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির ব্যাংকিং সাব-কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে ব্যাংকিং আইন সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ, প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট আইনসহ বিভিন্ন আইন প্রণয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তিনি বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেট উন্নয়নে গঠিত কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি করপোরেট আইন কমিটির চেয়ারম্যান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব আর্বিট্রেশনের সদস্য ছিলেন।

আইন পেশায় ৬০ বছর পার করা এই আইনজীবী ছিলেন এক অনন্য সমাজসেবী। বারডেম, আদ্-দ্বীন, আহ্ছানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, গাজীপুরে একশ শয্যার সুবর্ণ হাসপাতালসহ ২৫টির বেশি হাসপাতাল, এতিমখানা, মসজিদ ও মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভূমিকা ছিল তাঁর। এ ছাড়া যেখানে সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন মানবতার সেবায়।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা