kalerkantho

শুক্রবার । ১৪ কার্তিক ১৪২৭। ৩০ অক্টোবর ২০২০। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

শ্রমবাজারে নতুন শঙ্কা

মাসুদ রুমী   

১৯ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



শ্রমবাজারে নতুন শঙ্কা

ফাইল ছবি

কুয়েত থেকে তিন মাসের ছুটি নিয়ে দেশে ফেরেন চাঁদপুরের পুরানবাজারের হাবিবুর রহমান মুন্না। কিন্তু এক সপ্তাহ পরই করোনাভাইরাস মহামারি শুরু হয়। ফলে সাত মাস পার হয়ে গেলেও ফ্লাইট বন্ধ থাকায় কর্মস্থলে যোগ দিতে পারেননি এই প্রবাসী কর্মী। মুন্না বলছেন, ভিসা জটিলতার কারণে শিগগিরই কুয়েত যাওয়া হচ্ছে না তাঁর। নতুন করে কাগজপত্র তৈরি হলে হয়তো আবারও কর্মস্থলে ফিরতে পারবেন তিনি। কিন্তু সেই অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে না। জমানো টাকা শেষ করে ক্রমেই বাড়ছে ঋণের বোঝা।

কাজের সন্ধানে জমিজমা বিক্রি করে মালয়েশিয়া পাড়ি জমাতে গিয়ে সব হারিয়েছেন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ধামারন গ্রামের শরিফ মোল্লা। করোনা পরিস্থিতিতে ভিসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ভেঙে গেছে। এখন দেশেই একটি অটোরিকশা কিনে চালাতে শুরু করেছেন।

মুন্না ও শরিফ মোল্লার মতো প্রবাস থেকে দেশে ফিরে আটকা পড়া ও নতুন করে বিদেশ যেতে না পারাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই। করোনাভাইরাসের কারণে ক্রমেই এই প্রধান রপ্তানি বাজার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ায় বিভিন্ন মাত্রার ‘লকডাউন’ শুরু হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই টিকিট ও টোকেনের জন্য সৌদিপ্রবাসী কর্মীরা রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সোনারগাঁও হোটেলে অবস্থিত সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনসের অফিসের সামনে বিক্ষোভ করছেন। রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অর্থনীতি জিইয়ে রাখা মানুষজন এবার টোকেন নিতে গিয়ে লাঠিপেটার শিকার হচ্ছেন। সৌদির মতো একে একে কাতার, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এসে আটকে পড়া প্রবাসীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন।

প্রবাসফেরত শ্রমিকদের ঢল ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো, শ্রমবাজার দালালমুক্ত করা, নতুন বাজারে দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

করোনার কারণে সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান, আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কাতার, সিঙ্গাপুর, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বহু প্রবাসী ফিরে এসে ভয়াবহ দুর্দিনের মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন। গত কয়েক মাসে দেশে ফিরেছেন দুই লাখের মতো প্রবাসী শ্রমিক। এর মধ্যে অনেকেই স্থায়ীভাবে ফিরে এসেছেন। এ ছাড়া বিদেশে অবস্থানরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী এখন কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এই অবস্থায় যাঁরা দেশে ফেরত এসেছেন, তাঁরা কবে নাগাদ যেতে পারবেন কিংবা আদৌ যেতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রবাসীরা।

এতে দীর্ঘ মেয়াদে প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রেমিট্যান্স এত দিন বেড়েছিল, যারা ফেরত আসবে, তারা তাদের সঞ্চিত অর্থ ফেরত পাঠিয়েছিল। তবে এই প্রবৃদ্ধি আগামীতে আর থাকবে না। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। সেখানে নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি খুব খারাপ না হলেও যারা ফেরত এসেছে, তাদের পক্ষে ফিরে যাওয়া সহজ হবে না। কাজেই রেমিট্যান্স কমলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সংকট তৈরি হবে। দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ বেশি বিদেশ যায়। তারা আরো দরিদ্র হয়ে যাবে। শহর থেকে এমনিতেই অনেক লোকজন গ্রামে চলে গেছে। তাতে চাপে আছে গ্রামীণ অর্থনীতি। এরপর প্রবাসফেরতদের চাপ সামলানো কঠিন হবে।’

শ্রমবাজারের সংকটের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রবাসীদের পাঠানো যে ২০ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স, তাতে শুধু রাষ্ট্রের রিজার্ভ বাড়ছে তা নয়, এই টাকাটা গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করছে। যে জেলাগুলো থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ বিদেশ যায়, সেখানার উন্নয়ন অন্য যেকোনো জেলার চেয়ে বেশি। যেসব এলাকায় দারিদ্র্য বেশি, আমরা দেখেছি ওই এলাকাগুলোতে আন্তর্জাতিক মাইগ্রেশন হয় না।’ অর্থনীতি সচল রাখার জন্য জনশক্তি রপ্তানি খাত স্বাভাবিক রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, করোনার আগে প্রতিবছর ছয় লাখ থেকে সাত লাখ মানুষ বিদেশ যেত। কিন্তু করোনাকালে চার লাখের বেশি মানুষ বিদেশে যেতে পারেনি। অর্থাৎ বাকিদের কর্মসংস্থান হয়নি।

শরিফুল হাসান বলেন, যারা দেশে আটকে আছে এমন অন্তত এক লাখ মানুষের প্রত্যেকের চার-পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে পাসপোর্ট-ভিসা সব চূড়ান্ত ছিল। করোনার কারণে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে দুই লাখ মানুষ চলে এসেছে। এ ছাড়া জানুয়ারিতে ছুটিতে এসে আটকা পড়া মানুষের সংখ্যা আরো লাখখানেক। একদিকে কর্মসংস্থান বন্ধ, অন্যদিকে মানুষ ফেরত আসছে। দেশের এক কোটির বেশি মানুষ বিদেশে আছে। তাদের বেতন কমে যাচ্ছে বা চাকরি চলে যাচ্ছে। এই সব কিছুর ফলে দেশের অর্থনীতির অগ্রগতি ব্যাহত হবে। এখন হয়তো রেমিট্যান্স কমছে না, কারণ যে দুই লাখ মানুষ ফেরত এসেছে, তাদের অনেকেই তাদের টাকাটা দেশে পাঠিয়ে দিয়েছিল। আরো এক বছর এই অবস্থা চলতে থাকলে সামাজিক-অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।

সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে শরিফুল হাসান বলেন, ‘অনেক কিছু হয়তো আমাদের হাতে নেই; কিন্তু সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এ ক্ষেত্রে আরো নজর প্রয়োজন। আমরা বিগত কয়েক বছর থেকে দেখছি আমাদের শ্রমবাজার ৮-৯টি বাজারের মধ্যে আটকে আছে, এর বহুমুখীকরণ নেই। নতুন শ্রমবাজার কিংবা দক্ষ লোক পাঠানো—সব কিছুই আলোচনায় সীমাবদ্ধ।’ তিনি বলেন, কিভাবে দক্ষ লোক নতুন নতুন শ্রমবাজারে পাঠানো যায়, সেটাই এখন মূল চেষ্টা হওয়া উচিত। আগের মতো আট লাখ লোক না পাঠাতে পারলেও অন্তত এক লাখ মানুষ যাতে আরো বেশি আয় করতে পারে তার জন্য দক্ষতা উন্নয়নে জোর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তগুলো ডাটানির্ভর হতে হবে।

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির এই কর্মকর্তা বলেন, এখনো দালালচক্রের হাত থেকে শ্রমবাজার মুক্ত হচ্ছে না। বাংলাদেশে এখনো অভিবাসন ব্যয় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি। আর আয় সবচেয়ে কম। শ্রম খাতের অভিবাসন ব্যবস্থাপনা এখনো বিশৃঙ্খল। এখনো দালালনির্ভরতা, প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হয়নি। অভিবাসন ব্যবস্থাপনা উন্নত করার পাশাপাশি নতুন বাজারের জন্য বছরভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় সম্প্রতি ঢাকায় সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর মিশনপ্রধানদের সহযোগিতা চেয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত মার্চ মাসে ভিসা পেয়ে যেতে পারেননি এমন কর্মীদের জন্য এখন নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। বিদেশে যেতে না পারলে সরকার তাঁদের জন্য দেশেই প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানে উৎসাহিত করবে। এ জন্য এরই মধ্যে ৫০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। প্রয়োজনে এই তহবিলের পরিমাণ আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার।

বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ বর্তমান পরিস্থিতির জন্য করোনা মহামারিকে দায়ী করেছেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, অন্যদের মতো প্রবাসীরাও এর শিকার হয়েছেন। অনেকেই করোনাকালে বা এরও আগে বাংলাদেশে এসে আটকে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘এখন ধীরে ধীরে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে কর্মীরা যেতে শুরু করেছেন। ভিসার মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে অনেকের সমস্যা আছে। কিছু সমস্যা, যেগুলো আমাদের আয়ত্তের মধ্যে আছে, সেগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে।’

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ (রামরু) ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. তাসনীম সিদ্দিকী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রবাসী কর্মীরা দেশে এসে আর্থিক সংকটে পড়েছেন। সরকার শুধু ঋণ প্রকল্প দিয়ে এই সংকট দূর করতে পারবে না। ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে এককালীন নগদ অর্থ সহায়তার ব্যবস্থা করা দরকার। আমরা যে রেমিট্যান্স নিয়ে গর্ব করছি, সেই রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের প্রতি মানবিক হওয়া অত্যন্ত জরুরি। যাঁরা ফিরে আসছেন, তাঁদের জেলে দেওয়ার ঘটনা প্রবাসী কর্মীদের মনে খারাপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। যাঁরা জেলে আছেন, তাঁদের দ্রুত ছেড়ে দেওয়া এবং নতুনদের জেলে না নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি বৈশ্বিকভাবে আমরা প্রবাসীদের নিয়ে লড়াই করতে চাই, তাহলে নিজেদের দেশে তাঁদের প্রতি আরো মানবিক হতে হবে।’

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, করোনা শুরু হওয়ার পর (১ এপ্রিল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর) সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন ৩৯ হাজার ১৮৮ জন বাংলাদেশি, যাঁদের বেশির ভাগই শ্রমজীবী। এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই করোনার কারণে কর্মস্থল ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। অন্যদিকে গত এক সপ্তাহে সৌদি আরব ফিরে যেতে পেরেছেন তিন হাজার ৩১৮ জন। সৌদি আরব আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করলে ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে প্রবাসীরা সে দেশে ফিরতে শুরু করেন।

জনশক্তি কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছর চাকরি নিয়ে বিভিন্ন দেশে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা ছিল সাত লাখ। চলতি বছর সেই লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে সাত লাখ। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বিদেশে মোট কর্মসংস্থানের ৮৮ শতাংশই হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ১০ দেশে। ৭৪ শতাংশই গেছে সৌদি আরবে। দেশটিতে প্রায় ২১ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক বিভিন্ন পেশায় কর্মরত।

জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রার) সাবেক সভাপতি গোলাম মুস্তাফা গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের প্রবাসী কর্মীরা কৃষিসহ নানা কাজে যুক্ত হয়ে সৌদি অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখছে। তারা ছুটিতে দেশে এসে করোনার কারণে ফিরে যেতে পারছে না। যাদের নতুন ভিসা এসেছে, তাদের এবং যারা সৌদি আরবে কর্মরত ছিল, তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা সৌদি সরকারের কাছে মানবিক বিবেচনার দাবি জানাই।’

মন্তব্য