kalerkantho

শনিবার । ৮ কার্তিক ১৪২৭। ২৪ অক্টোবর ২০২০। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

ইয়াহইয়া ফজল, সিলেট   

১ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে পারত। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছার পরও তাঁরা ছাত্রাবাসেই অবস্থান করছিলেন। পুলিশ ছাত্রাবাসের ভেতর না ঢুকে প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে কালক্ষেপণ করলে একপর্যায়ে তাঁরা পালিয়ে যান। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে এ সময় সমঝোতার চেষ্টাও করেন ছাত্রলীগের সাবেক কয়েকজন নেতা।

ঘটনার পর নির্যাতিতা ওই তরুণী তাঁর স্বামীকে নিয়ে ছাত্রাবাস থেকে বেরিয়ে টিলাগড়ে যান। সেখানে ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতার সঙ্গে তাঁদের দেখা হয়। তিনি স্বামী-স্ত্রী দুজনকে নিয়ে স্থানীয় কয়েকজনের সহযোগিতায় ধর্ষকদের চিহ্নিত করতে সক্ষম হন। ওই নেতা এবং স্থানীয় একাধিক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

গত শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় এমসি কলেজে বেড়াতে গিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন এক তরুণী। নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে করে স্বামীর সঙ্গেই বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এক দল যুবক তাঁদের প্রায় জিম্মি করে কলেজের ছাত্রাবাসে নিয়ে যান। তাঁরা সবাই ছাত্রলীগের কর্মী। তরুণীর স্বামীকে ছাত্রাবাসের ভেতর নিয়ে যান কয়েকজন। এরপর গাড়িতেই সংঘবদ্ধভাবে ওই তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়। পরে গাড়ি রেখে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। গাড়ি ছাড়িয়ে নিতে অভিযুক্তরা তাঁদের কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন।

মামলার এজাহার, তরুণীর দেওয়া জবানবন্দি এবং ঘটনার ব্যাপারে অনুসন্ধানে জানা যায়, এ ঘটনার সঙ্গে ৯ জন জড়িত ছিল। তাদের মধ্যে ছয়জনকে শনাক্ত করা হয় প্রথম। অজ্ঞাতপরিচয় তিন আসামির মধ্যে দুজনকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এজাহারভুক্ত ছয় আসামির মধ্যে চারজন ওই তরুণীকে ধর্ষণ করেন। বাকি দুজনসহ অন্যরা তরুণীর স্বামীকে আটকে রেখেছিলেন।

জানা যায়, ওই দম্পতিকে ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকের ৫ তলা নতুন ভবনের কাছে নিয়ে যান অভিযুক্তরা। এ সময় তারেকুল ইসলাম তারেক নামের একজন তরুণীর স্বামীর ম্যানিব্যাগ থেকে দুই হাজার টাকা ও শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি তরুণীর সোনার দুল এবং অর্জুন লস্কর গলার সোনার চেন ছিনিয়ে নেন। এরপর কয়েকজন তরুণীর স্বামীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ছাত্রাবাসের ভেতর নিয়ে যান। সাইফুর রহমান, তারেক, মাহবুবুর রহমান ও অর্জুন লস্কর প্রাইভেট কারের ভেতর পর্যায়ক্রমে ওই তরুণীকে ধর্ষণ করেন। রাত ৯টার দিকে ধর্ষকরা তাঁদের গাড়ি রেখে ছেড়ে দেন। তাঁরা ছাত্রাবাস থেকে বের হয়ে এক অটোরিকশাচালকের সহযোগিতায় টিলাগড় এলাকায় যান এবং সেখানে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মিহিৎ গুহ চৌধুরী বাবলার সঙ্গে দেখা হয়। এরপর বাবলা বিষয়টি পুলিশকে জানান এবং তাঁদের নিয়ে ছাত্রাবাস এলাকায় যান।

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বাবলা চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, “আমি বিষয়টি তাত্ক্ষণিক শাহপরান থানার ওসিকে জানাই। এরপর আমার সঙ্গে স্থানীয় আরো দুজনসহ ওই তরুণী ও তাঁর স্বামীকে নিয়ে ঘটনাস্থলের সন্ধানে বের হই। প্রথমে গেলাম এমসি কলেজের মূল ফটকে। বাংলোর গেট চেক করলাম, পোস্ট অফিসের গেট চেক করলাম, নেই। এরপর আলুর তলের রাস্তা, ইকো পার্ক এলাকা চেক করলাম, ওইখানেও নেই। তারপর তাঁরা বললেন আরেকটু সামনে। তখন আমি ধরে নিলাম, বালুচর হবে, না হলে হোস্টেলের ওদিকে হবে। হোস্টেলই যে হবে সেটা আমি প্রথমে চিন্তা করিনি। কারণ কলেজ যেহেতু বন্ধ, হোস্টেলও বন্ধ। ওখানে কেউ থাকার কথা না। তবু হোস্টেলের সামনে যাওয়ার পর দেখলাম ভেতরে কিছু ছেলে হাঁটাহাঁটি করছে। তখন ওই নারী আমাকে বললেন, ‘ভাই আমাকে ভেতরে নিয়ে নির্যাতন করেছে।’ খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ দেখি একটি কক্ষে আলো জ্বলছে, যে ঘরটায় পরে রাতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ অস্ত্র উদ্ধার করে। তখন আবার ওসিকে কল দিই। কারণ ঘটনা কোথায় ঘটেছে সেটি তো নিশ্চিত হওয়া গেছে, উনাকে সেটা জানাই।”

এ ঘটনায় ওসিকে তিন দফায় কল দিয়েছেন জানিয়ে বাবলা অভিযোগ করে বলেন, ‘এত বড় ঘটনা। কিন্তু ওসির রেসপন্স হতাশাজনক ছিল। তবে থানার সেকেন্ড অফিসার সোহেলকেও জানাই। তিনি খুব ভালো রেসপন্স করেছেন। ওসির ভূমিকা সুবিধার ছিল না।’

মিহিৎ গুহ চৌধুরী বাবলা অভিযুক্তদের শনাক্ত ও এসআই সোহেলকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, একপর্যায়ে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মেজর টিলার জাহাঙ্গীর আলম ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক দেবাংশু দাস মিঠুকে তিনি দেখতে পান ওসির সঙ্গে কানে কানে কথা বলছেন। তিনি বলেন, ওসিকে তিনি আসামি ধরার জন্য বলেন। কিন্তু ওসির গড়িমসির কারণে আসামিদের ধরা যায়নি।

বাবলা চৌধুরী বলেন, তাঁকে নানাভাবে চাপ দেওয়ার পাশাপাশি অর্থও সাধা হয়েছিল।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাহপরান থানার ওসি কাইয়ুম চৌধুরী। তাঁর দাবি, ‘পুলিশ কোনো রকম সময় নষ্ট করেনি। আমাদের তখন যা যা করণীয় আমরা করেছি।’ ধর্ষকদের মদদদাতা নেতাদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালানোর অভিযোগ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কারা ধর্ষকদের পক্ষের নেতা আমি কাউকে চিনি না। এ অভিযোগ ঠিক নয়।’

আরো দুই আসামি ৫ দিনের রিমান্ডে : মামলার আসামি মাহফুজুর রহমান ও তারেকুল ইসলাম তারেককে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল বুধবার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত-২-এর বিচারক মো. আবুল কাশেম তাঁদের এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা