kalerkantho

শুক্রবার । ৭ কার্তিক ১৪২৭। ২৩ অক্টোবর ২০২০। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

অ্যান্টিজেন টেস্টের নাগাল পেতে বহু সমীকরণ

তৌফিক মারুফ   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অ্যান্টিজেন টেস্টের নাগাল পেতে বহু সমীকরণ

জুন মাসের শেষ দিকে দেশে করোনাভাইরাসের র‌্যাপিড টেস্টের আওতায় অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি টেস্ট চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত চেয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আড়াই মাসেরও বেশি সময় পার করে গত ২১ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানে ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় অ্যান্টিজেন টেস্ট চালুর অনুমোদন দেয়। এরপর প্রায় ১০ দিন পার হতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের খবর অনুসারে, আরো কমপক্ষে ১০-১৫ দিনের আগে এই পরীক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না দেশের বেশির ভাগ সরকারি হাসপাতালগুলো।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য এত দিন র‌্যাপিড টেস্টের ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) অনুমোদন না থাকার অজুহাত ছিল। এরই মধ্যে গত সোমবার ডাব্লিউএইচও অনুমোদন দিয়েছে র‌্যাপিড টেস্টের। প্রতিবেশী ভারতসহ অনেক দেশ আরো আগেই র‌্যাপিড টেস্ট শুরু করেছে। দেশে দেরি হওয়ার কারণ হিসেবে ঘুরেফিরে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে কিটসংকটের বিষয়টি। এখন পর্যন্ত হাসপাতাল পর্যায়ে অ্যান্টিজেন টেস্ট শুরুর মতো কিট নেই সরকারের হাতে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্বের হাতে গোনা চার-পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের অ্যান্টিজেন কিট গ্রহণযোগ্য মানের রয়েছে। নির্দেশনা অনুসারে শুধু সরকার কিট সংগ্রহ ও বিতরণ করতে পারবে। এখন পর্যন্ত প্রাইভেটভাবে ওই কিট আমদানি বা কোনো প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করা যাবে না। কিট সংগ্রহ করবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তারা ক্রয়প্রক্রিয়া শুরুর পর নমুনা কিটের কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য আমাদের কাছে পাঠাবে। আমরা আমদানিসংক্রান্ত শর্তগুলো ঠিকঠাক থাকলে কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য পাঠাব। সেই রিপোর্ট সন্তোষজনক হলেই কেবল আমাদানি অনাপত্তিপত্র দেওয়া হবে। এরই মধ্যে কিছু আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান কিট আমদানিতে আগ্রহী হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। তবে মূল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এত দিন দেশে র‌্যাপিড টেস্ট চালুর বড় বাধা ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন না থাকা। এখন অনুমোদন দিয়েছে। তবে সরকারি সব ক্রয়প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কিট হাতে পেতে অনেকটা সময় লেগে যাবে। তবে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আগেই আমাদের কিছু র‌্যাপিড টেস্ট কিট অনুদান দেওয়ার কথা রয়েছে। এখন আমরা সেই কিট হাতে পাওয়ার জন্য উদ্যোগ নিচ্ছি। এর পরিমাণ এক লাখের কিছু বেশি হবে। আমরা আপাতত যেসব জায়গায় সংক্রমণ বেশি, সেসব এলাকার হাসপাতালে পরীক্ষার ব্যবস্থা করব। এরপর যেসব এলাকায় আরটিপিসিআর ল্যাব নেই, সেই এলাকাগুলোতে চালু করব। এরপর পর্যায়ক্রমে সব সরকারি হাসপাতালে চালু হবে।’

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও র‌্যাপিড টেস্টের সুযোগ মিলতে পারে বলে আভাস দিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন যেহেতু ডাব্লিউএইচওর অনুমোদন মিলেছে, সে ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্যোগী হলে তারাও যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে কিট এনে সেগুলোর মান পরীক্ষা করিয়ে নিয়ে এরপর সবার জন্য পরীক্ষার সুযোগ নিতে পারে। এ জন্য আমরা বর্তমান সিদ্ধান্ত বা অনুমোদনের বিষয়টি পরিবর্তনের জন্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করব। সেব্রিনা ফ্লোরা জানিয়েছেন, সরকারি ব্যবস্থাপনায় এখন দিনে ১০ হাজার র‌্যাপিড টেস্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু কিট সংগ্রহের পথ খুবই সংকুচিত এখন পর্যন্ত। বিনা মূল্যে এক লাখ কিট পেলে তা দিয়ে বড়জোর ১০-১২ দিন চলতে পারে।’

কিট আমদানির সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র কালের কণ্ঠকে জানায়, আগে থেকেই আরটিপিসিআর টেস্টের মতো র‌্যাপিড টেস্টের কিট নিয়েও সংকট ছিল সারা বিশ্বেই। এখন একদিকে বিভিন্ন দেশে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দেওয়ায় এবং ডাব্লিউএইচও র‌্যাপিড টেস্ট অনুমোদন করায় এক ধরনের হুড়াহুড়ি লেগে যাচ্ছে কার আগে কে কিট সংগ্রহ করবে। সেই দৌড়ে বাংলাদেশের আমদানিকারকরা কত বেশি কিট আনতে পারে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ওই সূত্র জানায়, অক্টোবরের ১৫-২০ তারিখ নাগাদ মাত্র ২০ হাজারের মতো কিট দেশে আসতে পারে।

ডা. মীরজাদী সেব্রিনা বলেন, ‘প্রয়োজনে আমদানিকারকরা মান পরীক্ষার জন্য যে নমুনা কিট আমাদের কাছে জমা দেবে, সেই কিট দিয়ে আমরা মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা চালাব; যাতে করে একই সঙ্গে দুই কাজ হয়ে যায়—মানুষের পরীক্ষাও হবে, আবার কিটের কার্যকারিতাও দেখা হবে।’

এই পরীক্ষা কি বিনা মূল্যে করা হবে, নাকি আরটিপিসিআর টেস্টের মতো ফি ধার্য হবে—এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, ‘এখনো বিষয়টি ঠিক হয়নি। তবে যেহেতু র‌্যাপিড টেস্টের কমপক্ষে ২০ শতাংশ ফলস নেগেটিভ থাকে, তাই যাদের রেজাল্ট নেগেটিভ আসবে তাদের আবারও আরটিপিসিআর টেস্ট করাতে হবে। ফলে একজনের কাছ থেকে যাতে দুই দফা ফি নেওয়া না লাগে তেমন কিছু করার চিন্তা-ভাবনা আছে।’

একাধিক আমদানিকারক জানান, ইউরোপ-আমেরিকার কিটের দাম প্রতিটি (পার টেস্ট) বাংলাদেশি অর্থে সব খরচ মিলে এক হাজার টাকার বেশি হবে। তবে কোরিয়া, চীন ও ভারতের কিছু কিটের দাম ৪০০-৬০০ টাকার মধ্যেই থাকছে।

ডাব্লিউএইচও গত সোমবার যে অনুমোদন দিয়েছে সেখানে বলা হয়েছে, ডাব্লিউএইচওর বিশেষ পার্টনারশিপ প্রগ্রামের মাধ্যমে ১২০ মিলিয়ন মানসম্পন্ন কিট নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য সরবরাহ করা হবে, যার মাত্র পাঁচ ইউএস ডলার দাম পড়বে। গ্লোবাল ফান্ড এ জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন কিট উদ্ভাবন ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাবোট ও এসডি বায়োসেন্সর কম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যদিও ডাব্লিউএইচও সোমবার পর্যন্ত শুধু এসডি বায়োসেন্সরের কিট চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে আর অ্যাবোটের কিট আরো কিছুটা পর্যবেক্ষণে রয়েছে, এরপর সেটিরও অনুদোন মিলতে পারে। অ্যাবোট আমেরিকান কম্পানি আর এসডি বায়োসেন্সর দক্ষিণ কোরিয়ার কম্পানি।

ডাব্লিউএইচওর তথ্য অনুসারে অ্যান্টিজেন টেস্টের নমুনা সংগ্রহের পর মাত্র ১৫ মিনিট সময় লাগবে ভাইরাসের উপস্থিতি নির্ণয় করতে। নাক থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হবে। এই পরীক্ষা যেসব এলাকায় বেশি সংক্রমণ রয়েছে সেসব এলাকায় রোগী শনাক্তকরণ, কন্টাক্ট ট্রেসিং কাজেও সহায়ক হবে।

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, অ্যান্টিজেন টেস্টে যাদের রেজাল্ট নেগেটিভ হবে তাদের সবাইকে আবার আরটিপিসিআর টেস্ট করে কনফার্ম হতে হবে তিনি আসলেই নেগেটিভ। তবে যাদের রেজাল্ট পজিটিভ হবে তাদের আর পরীক্ষার প্রয়োজন হবে না। কারণ ফলস নেগেটিভের সম্ভাবনা থাকলেও ফলস পজিটিভের সুযোগ নেই। তিনি জানান এখন পর্যন্ত দেশের কারো কাছেই অনুমোদিত কোনো র‌্যাপিড টেস্ট কিট নেই।

ডা. ফ্লোরা বলেন, ‘ডাব্লিউএইচওর নির্দেশনায় বলা আছে, সংক্রমণ নেই এমন জায়গায় র‌্যাপিড টেস্ট না করাই ভালো। যদি আমাদের দেশে সংক্রমণ কমে যায় তবে এই টেস্টের প্রয়োজনীয়তা কতটা থাকবে সেটাও হয়তো ভাবতে হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা