kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

অতিমুনাফার লোভে ফাঁসলেন ব্যবসায়ীরা

♦ দুই দিনে কেজিতে কমেছে ২০ টাকা
♦ ভারতে আটকে পড়া পেঁয়াজ আসছে

রোকন মাহমুদ   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অতিমুনাফার লোভে ফাঁসলেন ব্যবসায়ীরা

ক্রেতাদের পোড়াতে পেঁয়াজ বাজারের ব্যবসায়ীরা যে আগুন লাগিয়েছিলেন এখন সেই আগুনে নিজেরাই পুড়ছেন। পেঁয়াজের বাজারে এখন ক্রেতা নেই। ক্রেতাশূন্য বাজারে অতিমুনাফার লোভে কেনা অতিরিক্ত পেঁয়াজ নিয়ে এখন আক্ষেপ ছাড়া কিছু করার নেই। কারণ সীমান্ত দিয়ে অবাধে ঢুকছে ভারতীয় পেঁয়াজ। আসছে মিয়ানমার থেকেও। চলতি মাসের শেষ দিকে আসবে তুরস্ক থেকেও। ৩০ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি বাড়িয়েছে টিসিবিও। এতে দামও কমে আসছে পাইকারি বাজারে। গত দুই দিনে কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা কমেছে দেশি পেঁয়াজের দাম। আমদানি করা পেঁয়াজের দামও কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা কমেছে।

এ ছাড়া বন্দরগুলোতে গতকাল শনিবার পেঁয়াজের ট্রাক ঢুকতে শুরু করলে কেজিতে ২০ টাকা দাম কমে যায়। বন্দর থেকে এসব পেঁয়াজ বাজারে এলে আজ-কালের মধ্যে দাম আরো কমবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ক্রেতা ও দাম কমতে থাকায় পেঁয়াজের বাজারে হঠাৎ দাম বাড়িয়ে ব্যবসায়ীরা যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিলেন তাঁদের জন্য এটা একটা কঠিন জবাব। এই বিষয়কে অনেকে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের গালে ক্রেতার চপেটাঘাত হিসেবেও দেখছে।

গতকাল কারওয়ান বাজারে পেঁয়াজের আড়তে গিয়ে দেখা যায়, মঙ্গলবার ও বুধবার বাজারের যে চরম গরম অবস্থা ছিল তার ছিটেফোঁটাও নেই। বিক্রেতা আর শ্রমিক ছাড়া ক্রেতার সংখ্যা হাতে গোনা। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, স্বাভাবিক সময়ে যে বেচাবিক্রি হয় গতকাল ছিল তার চেয়ে অনেক কম।

বাজারের লাকসাম বাণিজ্যালয়ের ব্যবসায়ী মো. হাবিবুর রহমান অনেকটা আক্ষেপ করেই জানালেন, মঙ্গলবারের বাজার আর আজকের বাজারের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। ক্রেতা নেই বললেই চলে। তিনি জানান, তিন দিন আগেও সাত-আট মেট্রিক টন পেঁয়াজ বিক্রি করতে পেরেছেন তাঁরা। গতকাল তা এক টনের নিচে নেমেছে। কয়েক দিন ক্রেতারা চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি কিনেছে। ফলে এখন আর কেনার দরকার হচ্ছে না। এ ছাড়া সীমান্তে আটকে থাকা পেঁয়াজ বাজারে এলে দাম আরো কমবে। ফলে ক্রেতারা এখন খুবই সাবধানি হয়ে উঠেছে। খুব প্রয়োজন না হলে পেঁয়াজ তারা কিনছে না বলে মনে করছেন তিনি।

হাবিবুর রহমানের মতো এমন আক্ষেপ শ্যামবাজারের রাজ ট্রেডার্সের ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাকেরও। তিনি বলেন, ‘আমদানি প্রচুর, কিন্তু বেচাবিক্রি একেবারেই কম। আজ আমার কাছে থাকা ২০০ বস্তা পেঁয়াজ বিক্রি করেছি। অনেকের আরো কম। অথচ স্বাভাবিক সময়ে ৫০০ বস্তার ওপরে বিক্রি হয়।’

শ্যামবাজারে গতকাল দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে। আগের দিন ছিল ৭৫ থেকে ৭৬ টাকা। কারওয়ান বাজারে ছিল ৭৫ টাকা। আগের দিন ছিল ৮০ টাকা পর্যন্ত। আমদানি করা পেঁয়াজ শ্যামবাজারে বিক্রি হয়েছে ৪৫-৫০ টাকায়। আগের দিন কেজিতে পাঁচ টাকা বেশি ছিল। কারওয়ান বাজারে বিক্রি হয়েছে ৫৫ টাকায়, আগের দিন ছিল ৬০ টাকা।

দাম কমছে খুচরা বাজারেও। গতকাল রাজধানীর মালিবাগ, মতিঝিল, মুগদাসহ বিভিন্ন খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৮৫ থেকে ৯০ টাকায়। আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৬০-৬৫ টাকায়। আগের দিনের চেয়ে কেজিতে পাঁচ টাকা কম।

মালিবাগ বাজারে আসা ক্রেতা শেখ মো. আব্দুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দাম বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে অনেকে পেঁয়াজ কেনা বন্ধ করে দিয়েছে। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও অনেকে পেঁয়াজ না কেনার ঘোষণা দিয়েছে। এটা অতিমুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের গালে চরম একটা চপেটাঘাত হয়েছে। গত বছরও তারা এমন নৈরাজ্য তৈরি করেছিল, কিন্তু এবার আর সেই সুযোগ খুব পায়নি। এ জন্য অবশ্য সরকারি কিছু উদ্যোগ রয়েছে।’

গতকাল হিলি, সোনামসজিদ, ভোমরাসহ বিভিন্ন স্থলবন্দরে ঢোকার অপেক্ষায় থাকা পেঁয়াজ আসা শুরু করেছে। এ ছাড়া ভারত বাংলাদেশে ২৫ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে। প্রয়োজনে আরো ১০ হাজার টন পেঁয়াজ রপ্তানি করবে তারা। মিয়ানমার থেকেও রেকর্ড পরিমাণ আমদানি বেড়েছে। টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ এ মাসের মধ্যেই এসে পৌঁছানোর কথা। দেশের বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপও পেঁয়াজ আমদানি করছে।

আমাদের চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকালে সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে ২১৩ টন পেঁয়াজ নিয়ে আটটি ট্রাক ভারত থেকে দেশে এসেছে। পাঁচ দিন পর গতকাল সকাল ১০টায় শুরু হবে এসব ট্রাক আসা। ভারতের মোহদিপুর স্থলবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিনিধি অভিজিৎ সিং জানান, মোহদিপুর স্থলবন্দরে দুই শতাধিক ট্রাক পেঁয়াজ আছে। তবে তা বাংলাদেশে পাঠানো হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

হিলি (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে হিলি বন্দরে পেঁয়াজবোঝাই ১১টি ট্রাক ঢুকেছে। আমদানিকারক সাইফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানান, আটকে পড়ায় পেঁয়াজের গুণগত মান নষ্ট হয়েছে। পেয়াজ নষ্ট হওয়ায় ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বিপাকে। প্রতি গাড়িতে পাঁচ-সাত টন পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়েছে।

টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, দেশে পেঁয়াজের চলমান সংকট মোকাবেলায় প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে আবারও বেশি পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নিচ্ছেন টেকনাফ স্থলবন্দর ব্যবসায়ীরা। এরই অংশ হিসেবে গতকাল ওই বন্দর দিয়ে ৩০ টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে।

বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি জানান, বেনাপোল দিয়ে কোনো পেঁয়াজ আসেনি। ভারতের পেট্রাপোল বন্দর এলাকায় আটকে থাকা পেঁয়াজবোঝাই ট্রাকের লোড এক্সপোর্ট করা না থাকায় বেনাপোল বন্দরে কোনো ট্রাক আসতে পারেনি।

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, ভোমরার ওপারে ভারতীয় সীমান্তে আটকে পড়া পেঁয়াজ আসতে শুরু করেছে। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৩৮ ট্রাক পেঁয়াজ এসেছে। সারা দিনে মোট ৯৩০ টন পেঁয়াজ এসেছে।

ভোমরা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান নাসিম কালের কণ্ঠকে বলেন, সীমান্তের ওপারে আরো ১২৫টি ট্রাক পেঁয়াজ আটকে আছে।

মন্তব্য