kalerkantho

রবিবার । ১২ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৯ সফর ১৪৪২

ই-জিপি নিয়ে টিআইবির গবেষণা

সরকারি ক্রয়ে দুর্নীতি রাজনৈতিক প্রভাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সরকারি ক্রয়ে দুর্নীতি রাজনৈতিক প্রভাবে

সরকারি কেনাকাটায় কাগুজে দরপত্রে অংশগ্রহণ নিয়ে মারামারি, গোলাগুলি, অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে এখন থেকে ৯ বছর আগে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট বা ই-জিপি চালু করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। উদ্দেশ্য ছিল, সবাই যাতে দরপত্রে অংশগ্রহণ করতে পারে; একই সঙ্গে দুর্নীতির পথ যাতে বন্ধ হয়। কিন্তু ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় উঠে এসেছে, ই-জিপিতে সরকারি কেনাকাটার প্রক্রিয়া সহজ হলেও কার্যাদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনো রাজনৈতিক প্রভাব প্রকট।

৯ বছরে ই-জিপি কতটা কার্যকর সেই গবেষণা করতে গিয়ে টিআইবি দেখেছে, রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ঠিকাদারের যোগসাজশ, জনপ্রতিনিধি হয়েও দরপত্রে অংশগ্রহণ এবং সিন্ডিকেট এখনো সরকারি কেনাকাটায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে। যার ফলে ই-জিপি চালু হলেও সরকারি কেনাকাটায় দুর্নীতি রয়েই গেছে।

‘সরকারি ক্রয়ে সুশাসন : বাংলাদেশে ই-জিপির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি গতকাল বুধবার প্রকাশ করে টিআইবি। ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম আকরাম। বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা থেকে উত্তরণ এবং ই-জিপির কার্যকর সুফল পেতে ১৩ দফা সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

মূল প্রবন্ধে শাহজাদা এম আকরাম জানান, ৯ বছরে ই-জিপিতে কতটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেছে, তা দেখতে ২০১৯ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। তথ্য সংগ্রহের জন্য ই-জিপি বাস্তবায়নকারী প্রথম দিকের চারটি সরকারি প্রতিষ্ঠান—স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ), বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডকে (আরইবি) বাছাই করা হয়। সারা দেশে চারটি প্রশাসনিক বিভাগের একটি করে জেলা এবং সেই জেলার একটি উপজেলা পর্যায়ে অবস্থিত কার্যালয় ও ঢাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। গুণগত ও সংখ্যাগত উভয় পদ্ধতি অনুসরণ করে চারটি প্রতিষ্ঠানের ৫২টি কার্যালয় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ট্রাফিক সিগন্যাল পদ্ধতি’ ব্যবহার করা হয়েছে।

শাহজাদা এম আকরাম আরো জানান, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, ই-জিপি প্রক্রিয়া, ই-জিপি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং কার্যকারিতা—এই পাঁচটি ক্ষেত্রের অধীনে ২০টি নির্দেশকের ভিত্তিতে সরকারি ক্রয় আইন কতটুকু কার্যকর তা পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রত্যেক নির্দেশককে উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন স্কোর দিয়ে তাদের অবস্থান বোঝানো হয়েছে। স্কোরের গ্রেডগুলো হচ্ছে ‘ভালো’ (৮১ শতাংশ বা তার বেশি); ‘সন্তোষজনক’ (৬১ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ); ‘ভালো নয়’ (৪১ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ); ‘উদ্বেগজনক’ (৪০ শতাংশ বা তার নিচে)।

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, চারটি সংস্থার স্কোরই ৫০-এর নিচে। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ স্কোর পেয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ)। ৪৪ শতাংশ স্কোর পেয়েছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি), ৪৩ শতাংশ স্কোর পেয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) পেয়েছে ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের অবস্থানই ‘ভালো নয়’ গ্রেডে অবস্থান করছে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে চারটি প্রতিষ্ঠানের স্কোর মাত্র ১৯ থেকে ৩০ শতাংশ, যা খুবই হতাশাব্যঞ্জক। গ্রেড অনুযায়ী সব প্রতিষ্ঠানের অবস্থান সার্বিকভাবে ঘাটতিপূর্ণ। ই-জিপি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং কার্যকারিতায় অবস্থান উদ্বেগজনক। অন্যদিকে চারটি প্রতিষ্ঠানই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে ৬০ থেকে ৭৫ শতাংশ স্কোর পেয়ে মোটামুটি ভালো অবস্থানে আছে। ই-জিপি প্রক্রিয়া মেনে চলার ক্ষেত্রে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই ৫৮ থেকে ৬৪ শতাংশ স্কোর পেয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ই-জিপি ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর করায় কোনো প্রতিষ্ঠানই ন্যূনতম স্কোর পায়নি।

গবেষণায় দেখা গেছে, দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহেলা, নিজেরা কাজ না করে কম্পিউটার অপারেটরদের মাধ্যমে মূল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি করানোর ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া নম্বর বাড়িয়ে-কমিয়ে আনুকূল্য দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অফিস কর্মকর্তার মাধ্যমে ঠিকাদারদের রেট শিডিউল জানিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। লিমিটেড টেন্ডার মেথডে (এলটিএম) কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ঘুষ আদায় করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গাইডলাইন অনুযায়ী ই-জিপি পরিচালনা করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রতিষ্ঠানভেদে সর্বনিম্ন ২০ থেকে ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্রয় ই-জিপিতে হয় না। উপজেলা পরিষদের ক্রয়ে অনেক জায়গায়ই ই-জিপি পুরোপুরি চালু হয়নি। এ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা দেওয়া হয় না।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম ই-জিপি চালুর ফলে সরকারি ক্রয় খাতে সুশাসন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। কিন্তু হতাশার বিষয় হলো ই-জিপির ফলে ক্ষেত্রবিশেষে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়লেও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও কাজের মানোন্নয়নে কোনো প্রভাবই পড়েনি। ই-জিপি ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং কার্যকারিতার মতো তিনটি মৌলিক ক্ষেত্রেই অবস্থান উদ্বেগজনক। এর পেছনে মূলত রাজনৈতিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তিনি বলেন, ই-জিপিকে রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ ও সিন্ডিকেটের দুষ্টচক্র থেকে মুক্ত করতে হলে সব পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও জনগুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যাবসায়িক সম্পর্কের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে নিয়ম মেনে অবশ্যই সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করতে হবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা