kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

২৫ কোটির ইউনিট হাওয়া

তৌফিক মারুফ   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



২৫ কোটির ইউনিট হাওয়া

ঢাকা শিশু হাসপাতালে অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতিসম্পন্ন একটি স্টেম সেল থেরাপি ইউনিট আছে, যার পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর ও ঢাকা শিশু হাসপাতালের যৌথ উদ্যোগে। তবে ওই ‘আছে’ বলতে প্রকল্পটি রয়েছে কাগজ-কলমে, বাস্তবে নেই। অথচ টাকা ঠিকই খরচ হয়ে গেছে। হাসপাতালের দু-তিনজন ছাড়া আর কেউ জানেন না এই স্টেম সেল থেরাপি ইউনিটের কথা। কোথায় এর অবস্থান তার হদিস নেই বললেই চলে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, মূলত সমাজসেবা অধিদপ্তরে থাকা এই প্রকল্পের পরিচালক, ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক ও তাঁর ঘনিষ্ঠ একাধিক চিকিৎসক মিলেমিশে প্রকল্পটি দৃশ্যমান না করেই টাকা ‘অদৃশ্য’ করে দিয়েছেন। যদিও হাসপাতাল পরিচালক কালের কণ্ঠ’র কাছে দাবি করেছেন, তিনি প্রকল্পটি সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানেন না কিংবা তাঁকে এই প্রকল্প এখন পর্যন্ত বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।

গত বৃহস্পতিবার ঢাকা শিশু হাসপাতালে গিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারীদের কাছে জিজ্ঞেস করে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পাওয়া যায়নি স্টেম সেল থেরাপি ইউনিট। একপর্যায়ে হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘আমি শুনেছি, সার্জারি বিভাগের ভেতরে এ ধরনের একটি ইউনিট করার কথা ছিল। চারটি যন্ত্রের মধ্যে নাকি একটি যন্ত্র এসেছে। আর শুনেছি তিনজন চিকিৎসক বিদেশে গিয়েছিলেন প্রশিক্ষণের জন্য। এ ছাড়া যে যন্ত্রটি আনা হয়েছে তাও প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি।’

ওই চিকিৎসক বলেন, ‘স্টেম সেল থেরাপি নামের একটি প্রকল্প নিয়ে এখানকার ডাক্তার খালেদ মাহমুদ শাকিল, সমাজসেবা প্রকল্প পরিচালক ও হাসপাতাল পরিচালককে মাঝেমধ্যে আড়ালে আবডালে তৎপর থাকতে দেখেছি। যা কিছু করার তাঁরাই করেছেন। এ ক্ষেত্রে এই হাসপাতালের সাবেক একজন পরিচালকও জড়িত ছিলেন বলে আমরা শুনেছি। তবে যেহেতু প্রকল্পটির কোনো বাস্তব রূপ ধারণ করেনি, তাই এটির কোনো অস্তিত্ব কেউ পাচ্ছে না।’

সরকারি কাগজপত্রের তথ্য অনুসারে, সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতায় ‘ঢাকা শিশু হাসপাতালের অ্যাডভান্সড শিশু সার্জারি অ্যান্ড স্টেম সেল থেরাপি ইউনিট স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১৮ সালের জুলাই মাসে। আর শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের ডিসেম্বরে। তবে প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, ‘প্রকল্পের কাজ গত বছরই শেষ হয়ে গেছে। কেনাকাটার বিলও পরিশোধ করা হয়েছে।’

প্রকল্পের মোট ব্যয় ২৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উন্নয়ন খাত থেকে ১৪ কোটি ৭০ লাখ ও ঢাকা শিশু হাসপাতালের খাত থেকে ৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ধরা আছে। প্রকল্পের সারসংক্ষেপে দেখা যায়, ব্যয়ের খাতে মুদ্রণ ও প্রকাশনা বাবদ ২০ লাখ, প্রচার ও বিজ্ঞাপন বাবদ ২৫ লাখ, বিদেশে প্রশিক্ষণ বাবদ দুই কোটি ২০ লাখ, এম এস আর বাবদ এক কোটি ৪০ লাখ, গবেষণা বাবদ ৫০ লাখ, বুকস অ্যান্ড পিরিয়ডিক্যালস বাবদ ৫০ লাখ, সম্মানী ভাতা আট লাখ, আসবাবপত্র মেরামত বাবদ দুই লাখ, কম্পিউটার মেরামত বাবদ এক লাখ, অফিস ইক্যুইপমেন্ট ও যন্ত্রপাতি মেরামত বাবদ পাঁচ লাখ, চার সেট যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনা বাবদ ১৭ কোটি ৮০ লাখ, ২৭ সেট আসবাবপত্র বাবদ তিন লাখ, অন্যান্য ভবন ও অবকাঠামো (দুটি রিফার্বিশমেন্ট) ৪০ লাখ, সিডি ভ্যাট বাবদ ৬০ লাখ, প্রাইস কন্টিজেন্সি বাবদ ৪০ লাখ ও অন্যান্য বাবদ পাঁচ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে সব কিছু কেনাকাটার বা ক্রয় অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ ছিলেন প্রকল্প পরিচালক ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপরিচালক হেলালউদ্দিন ভূঁইয়া। যিনি কেনাকাটা থেকে শুরু করে সব কাজ বাস্তবায়ন করেছেন ডা. খালেদ মাহমুদকে নিয়ে। প্রকল্প অনুসারে চার সেট যন্ত্রপাতি হস্তান্তরের মেয়াদ ছিল গত বছরের ২৫ জুলাই পর্যন্ত, এম এস আর কেনাকাটার মেয়াদ ছিল গত বছরের ২০ জুলাই পর্যন্ত, বই ও সাময়িকী কেনার মেয়াদ ছিল গত বছরের ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত এবং ২৭ সেট আসবাবপত্র কেনার মেয়াদ ছিল গত বছরের ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

অন্যদিকে এই প্রকল্পের আওতায় স্টেম সেল থেরাপি ও অ্যাডভান্স শিশু সার্জারি বিষয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতালে পৃথক সাতটি বিভাগের ৮০ জন চিকিৎসকের ভারত এবং প্রয়োজনে অধিকতর ও উচ্চ বিশেষায়িত কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য নিকটতম অন্য কোনো দেশে যাওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে সার্জারি বিভাগের ২০ জন দুই সপ্তাহের জন্য জনপ্রতি চার লাখ টাকা করে, হেমোটোঅনকোলজি বিভাগের ১০ জন চিকিৎসক এক সপ্তাহের জন্য জনপ্রতি তিন লাখ টাকা করে, নিউরোলজি বিভাগের ১০ জন এক সপ্তাহ করে জনপ্রতি দুই লাখ টাকা করে, পালমনোলজি বিভাগের ১০ জন এক সপ্তাহের জন্য জনপ্রতি দুই লাখ টাকা করে, নেফ্রোলজি বিভাগের ১০ জন এক সপ্তাহের জন্য দুই লাখ টাকা করে, কার্ডিওলজি বিভাগের ১০ জন এক সপ্তাহের জন্য তিন লাখ টাকা করে, অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের ১০ জন এক সপ্তাহের জন্য দুই লাখ টাকা করে মোট দুই কোটি ২০ লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল।

এ ছাড়া যন্ত্রপাতির তালিকা অনুযায়ী এক সেট মডিউল অপারেশন থিয়েটার উইথ সেলুলার থেরাপি সাত কোটি ৩০ লাখ টাকা, এক সেট অ্যাডভান্স ল্যাপারোস্কোপিক অ্যান্ড এন্ডোস্কোপিক সিস্টেম ৫৭ লাখ টাকা, এক সেট ইন্ট্রাঅপারেটিভ ইমেজিং সিস্টেম ছয় কোটি ৪৩ লাখ টাকা এবং এক সেট হাইপারব্যারিক চেম্বার উইথ স্টেম সেল থেরাপি আট কোটি ৯০ লাখ টাকায় কেনার কথা ছিল। সেই সঙ্গে হাসপাতালে অবকাঠামো মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় একটি মডুলার অপারেশন থিয়েটার স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো সংস্কারকাজ বাবদ ২৫ লাখ টাকা এবং পোস্ট অপারেটিভ ও পোস্ট আইসিইউ রিফারবিশড কাজের জন্য ১৫ লাখ টাকা রাখা হয়।

জানতে চাইলে ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডাক্তার শফি আহমেদ মুয়াজ কালের কণ্ঠকে প্রথমে বলেন, ‘সব কাজ হয়েছে, কিন্তু করোনার কারণে উদ্বোধন করা সম্ভব হয়নি।’ কিন্তু প্রকল্পটির সঠিক অবস্থান কোথায় এবং সব যন্ত্রপাতি কোথায় বসানো হয়েছে, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মডিউল অপারেশন থিয়েটার স্থাপন করা হয়েছে। বাকিগুলো কি হয়েছে, না হয়েছে সেটা আমার জানা নেই। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। তারা আমাকে কিছু বুঝিয়ে দেয়নি। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ আমাকে বুঝিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত আমি নিজেও ঠিক বুঝতে পারছি না কি হয়েছে না হয়েছে। এ ছাড়া আমি এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত না। টাকা-পয়সা খরচের মধ্যেও আমি ছিলাম না। আর হাসপাতালের পক্ষ থেকে যে প্রায় ১০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা ছিল আমাদের, সেই টাকা দেওয়ার মতো সক্ষমতা নেই বলে ওই টাকাও দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া হাসপাতালে যে ৮০ জন চিকিৎসক বিদেশে যাওয়ার কথা ছিল তাদের মধ্যে তিন-চারজন গেছেন, বাকিদের টাকা জমা আছে বলে আমি জানি।’

প্রকল্প পরিচালক হেলালউদ্দিন ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকলেও কাজ গত বছরই শেষ হয়ে গেছে। কেনাকাটার বিলও পরিশোধ হয়েছে। কাজ কোনো কিছুই বাদ নেই। সব কিছুই সম্পন্ন করা হয়েছে।’ যন্ত্রপাতিগুলো কোথায় এবং ইউনিটটির অবস্থান কোথায় জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রকল্পটি ৬০ থেকে ৪০ শতাংশ চুক্তিতে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের অংশের সব কিছু সম্পন্ন হয়েছে, কিন্তু হাসপাতালের অংশের উদ্যোগে কাজের ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। এর মধ্যে তিনটি যন্ত্রই হাসপাতালের একটি কক্ষে মজুদ আছে। হাসপাতালের গ্যাসলাইনে ঝামেলা থাকায় ওই যন্ত্রগুলোতে গ্যাস সংযোগ দেওয়া যায়নি। তবে বাকি যন্ত্রটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়ার কথা ছিল। এমনকি আমরা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই তাদের নানা সমস্যার কথা বলে বুঝে নিচ্ছে না। আর তারা তাদের অংশের টাকা কিংবা কেনাকাটার কি করেছে না করেছে সেটা তাদের ব্যাপার।’

প্রকল্প পরিচালক দাবি করেন, ‘৮০ জন ডাক্তারকে বিদেশ পাঠানোর কথা থাকলেও কাউকেই এই প্রকল্পের টাকায় বিদেশে পাঠানো যায়নি। কারণ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই এ জন্য প্রয়োজনীয় তালিকা বা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেনি। ফলে ওই টাকা ফেরত গেছে।’ তবে হাসপাতাল পরিচালক বলেছেন, ওই টাকা জমা আছে। অন্যদিকে শিশু হাসপাতালের মূল ভবনের সার্জারি বিভাগের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে স্টেম সেল থেরাপির ইউনিটের জন্য বেড বসিয়ে ও টাইলস লাগিয়ে সংস্কারসহ আরো কিছু কাজের কথা প্রকল্প পরিচালক জানালেও ওই বিভাগের একাধিক চিকিৎসক জানান, ‘ওই কাজ হয়েছে অন্য একটি খাত থেকে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা