kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

বাইডেনের রানিং মেট কমলা হ্যারিস

ডেমোক্র্যাটদের সমীকরণে কৃষ্ণাঙ্গ ভারতীয় ভোট

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৩ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ডেমোক্র্যাটদের সমীকরণে কৃষ্ণাঙ্গ ভারতীয় ভোট

যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টিতে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের বিবেচনা করা হয় ‘মেরুদণ্ড’ হিসেবে। এবার সেই অংশ থেকেই নিজের রানিং মেট বেছে নিলেন দলের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জো বাইডেন। সামনের সপ্তাহেই দল থেকে বাইডেনের প্রার্থিতা নিশ্চিত করা হবে। আর একই সঙ্গে তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিশ্চিত হবেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত কমলা হ্যারিস; ভারতে যিনি ‘নারী ওবামা’ হিসেবেই বেশি পরিচিত।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে কমলা বহু কিছুতেই প্রথম। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী হিসেবে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্টের পদে মনোনয়ন পেতে যাচ্ছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী সিনেটর (যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয়)।

ক্যালিফোর্নিয়ার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী অ্যাটর্নি জেনারেল। তবে কমলা নিজে এত সব ‘প্রথম’ নিয়ে মোটেই কথা বলতে আগ্রহী নন। বরং মানুষ হিসেবে নিজের অবস্থানে তিনি স্বচ্ছন্দ এবং নিজের প্রথম পরিচয় দেন ‘আমেরিকান’ হিসেবে। এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গোড়ার দিকে তিনি ছিলেন। পরে বাইডেনের সমর্থনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন।

৭৭ বছর বয়সী বাইডেন তাঁর নির্বাচনী সহযোগী হিসেবে কমলার নাম ঘোষণা করেন গত মঙ্গলবার। নারী রানিং মেট বেছে নেবেন—এ ঘোষণা অবশ্য তিনি গত মার্চেই দিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর ঘোষণার দুই মিনিটের মাথায়ই প্রতিক্রিয়া দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট মনে করেন, কমলা ‘অসম্ভব নোংরা’ একজন নারী। নারী প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্টের এই শব্দ চয়ন অবশ্য নতুন কিছু নয়। এর আগে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারি ক্লিনটন প্রসঙ্গেও একই কথা বলেছিলেন তিনি। বাইডেনের পছন্দ সম্পর্কেও সন্দেহ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তবে প্রেসিডেন্ট যা-ই বলুন না কেন ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যে এই মনোনয়ন নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। কমলার নাম ঘোষণার পর দেওয়া এক টুইটে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, ‘আমি কমলাকে দীর্ঘদিন থেকে চিনি। এই কাজের জন্য তিনি যোগ্যদের মধ্যে যোগ্যতম। তিনি আজীবন আমাদের সংবিধান রক্ষার জন্য লড়াই করেছেন। লড়েছেন সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য। আমাদের দেশের জন্য আজ অসাধারণ একটি দিন। আসুন সবাই মিলে ওঁদের বিজয়ী করি।’ হিলারি বলেছেন, ‘আমি রোমাঞ্চিত।’

ডেমোক্র্যাট নেতাদের এতটা উচ্ছ্বসিত হওয়ার কারণ খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন নয়। প্রায় আশিতে পৌঁছানো বাইডেনের চেহারা দেখে কেউ যদি আজকের ডেমোক্রেটিক পার্টিকে বিবেচনা করতে চান, তাহলে ভুল করবেন। দলটি মূলত তরুণ সমর্থকদের নিয়ে গঠিত। এরা জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যময়। দলে সাদারা আছেন, আছেন কৃষ্ণাঙ্গরা—আফ্রিকা, আমেরিকা বা ভারত থেকে যাওয়া মানুষের বেশির ভাগই ডেমোক্রেটিক পার্টির নিবন্ধিত ভোটার। কমলা এঁদের প্রভাবিত করবেন।

প্রথম কারণ কমলা হ্যারিসের জাতিগত সত্তা। তাঁর মা ভারতের আজকের চেন্নাই থেকে মাত্র ১৯ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যান। ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নাগরিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। পরিচয় হয় অর্থনীতির ছাত্র জ্যামাইকায় জন্ম নেওয়া কৃষ্ণাঙ্গ ডোনাল্ড হ্যারিসের সঙ্গে। তাঁরা বিয়ে করেন। দুই মেয়ে হওয়ার পর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। সিঙ্গেল মাদার হিসেবে দুই মেয়েকে বড় করেন তিনি। তবে হিন্দু ভারতীয় হিসেবে নয়, আমেরিকান হিসেবে, আত্মনির্ভরশীল করে। কমলার এই জীবনই তাঁকে পরবর্তী সময়ে লড়াকু নারীতে পরিণত করে। মার্কিন সমাজে কৃষ্ণাঙ্গদের জীবন কেমন, সংকট কী—কমলার সে অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই বিষয়টিই তাঁকে এগিয়ে রেখেছে অনেকখানি। নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায়, যুক্তরাষ্ট্রে যে বিপুল ভারতীয় জনগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের সমর্থন তিনি পাবেন। পাবেন আফ্রিকান আমেরিকানদের সমর্থনও।

যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে বর্ণবাদবিরোধী যে আন্দোলন চলছে, তাতেও কমলার জোরালো অংশগ্রহণ রয়েছে। তিনি পুলিশের ক্ষমতা কমানোর কথাই বলে এসেছেন বরাবর। যদিও বাইডেন এখন পর্যন্ত ঠিক এর পক্ষে নন।

দ্বিতীয়ত, একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে যে খুব বড় ভূমিকা রাখেন তা নয়। তবে সুনির্দিষ্ট কিছু কাজ তাঁরও থাকে। প্রেসিডেন্ট প্রার্থী নীতিগত মূল বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেন। আর বিরোধীপক্ষের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়ির কাজটি সারেন ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। ইতিহাস সাক্ষী, এই কাজে কমলার চেয়ে ভালো সহযোদ্ধা বাইডেন আর পাবেন না। এ কথার সত্যতা বিচারে কমলার ক্যারিয়ারের দিকে আলো ফেলা যেতে পারে। মায়ের চাকরির সুবাদে কানাডায় স্কুলজীবন শেষ করার পর কমলা যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরে আইন পড়তে যান হেস্টিংসের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটিতে। তাঁর ক্যারিয়ার শুরু হয় আলামেদা কাউন্টি ডিস্ট্রিক্টের অ্যাটর্নি কার্যালয়ে। ২০০৩ সালে সান ফ্রান্সিসকোর ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি হন কমলা। পরে তিনি প্রথম নারী ও প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল নির্বাচিত হন। ওই সময় থেকেই কমলা ডেমোক্র্যাট পার্টির উদীয়মান তারকা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিলেন; যার ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া থেকে মার্কিন সিনেটের সদস্য নির্বাচিত হন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক পদে রক্ষণশীল ব্রেট কাভানাহ এবং মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পদে উইলিয়াম বারের মনোনয়ন নিয়ে সিনেট শুনানিতে ধারালো বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্ন করে ডেমোক্র্যাটদের প্রগতিশীল অংশের কাছেও তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ট্রাম্পের তীব্র বিরোধী কমলা তাঁর আইনি বুদ্ধিকে নির্বাচনী প্রচারে কাজে লাগাতে পারবেন বলেই মনে করা হচ্ছে।

তবে কমলাকে বেছে নেওয়ার ব্যাপারে বাইডেনের ব্যক্তিগত আগ্রহও হয়তো ছিল। তাঁর এক ছেলে বিউ বাইডেন ২০১৫ সালে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে ব্রেন ক্যান্সারে মারা যান। তিনি ডেলাওয়ারের অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। বিউ ও কমলা সমসাময়িক। তাঁদের কাজের ধরন একই রকম হওয়ায় যোগাযোগও ভালো ছিল। কমলা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘বিউয়ের সঙ্গে আমার ফোনে রোজ কথা হতো। দিনে দুবার কথা বলেছি আমরা।’ বাইডেন কমলার নাম প্রকাশ করার টুইটে বিষয়টি উল্লেখ করেন, ‘কমলা যখন অ্যাটর্নি জেনারেল ছিল তখন বিউয়ের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আমি দেখতাম ওরা কর্মজীবী মানুষকে নিয়ে কিভাবে কাজ করে, নারী-শিশুর সুরক্ষায় ওদের ভাবনা। তখনো আমার গর্ব হতো। কমলাকে নির্বাচনী প্রচারে সহযোগী হিসেবে পেয়ে এখনো আমি গর্বিত।’ সূত্র : বিবিসি, সিএনএন, এএফপি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা