kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

হতাশার পথেই লেবানন

বিক্ষোভ অব্যাহত, স্বস্তি ছিল না অতীতেও

তামান্না মিনহাজ   

১২ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



হতাশার পথেই লেবানন

‘এই জাতি অভিশপ্ত’—লেবাননের মানুষ অনেকটা ঐশী বাণীর মতোই বিশ্বাস করে কথাটি। গৃহযুদ্ধ, চরম দুর্নীতি, অকার্যকর সরকারব্যবস্থার কারণে সীমাহীন দারিদ্র্য বা গত সপ্তাহের মতো দেশের ইতিহাসে ভয়াবহতম বিস্ফোরণ—কোনো কিছুই যেন ওই অভিশাপের সমাপ্তি ঘটাতে পারছে না। গত সোমবার মন্ত্রিসভাসহ পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াব। ৪ আগস্ট প্রাণঘাতী বিস্ফোরণের পর যে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়, তারই প্রেক্ষাপটে সরে দাঁড়ান তিনি। তবে তাঁর প্রস্থান আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত লেবাননকে কতটা ভাসাতে পারবে, তা নিয়ে সন্দিহান দেশটির সাধারণ মানুষ।

ফলে বিক্ষোভ থামেনি। গতকাল মঙ্গলবারও ‘কর্তৃপক্ষকে কবরে চাই’ দাবি তুলে বন্দর প্রকম্পিত করে বৈরুতবাসী।

লেবাননের হালুয়া-রুটি ভাগাভাগির রাজনীতিতে সংকট চিরকালীন। চেয়ারে বসার জন্য স্যুট-কোট নিয়ে কাড়াকাড়ি এবং নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়াই দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বিস্ফোরণের অনেক আগে থেকেই এই সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তনের দাবিতে বিক্ষোভ করছিল মানুষ। বিস্ফোরণ সেই বিক্ষোভকে কয়েক শ গুণ বেগবান করেছে। যার জেরে পদত্যাগ করেন হাসান দিয়াব। এই সময় জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি অবশ্য নিজেকে এই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার অংশ বলেননি, এমনকি এর দায়ও নেননি। তিনি বলেন, ‘তাদের (কাদের উদ্দেশে বলা নিশ্চিত নয়) দুর্নীতির কারণেই এই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দেশের প্রতিটি স্তরেই দুর্নীতি স্থায়ী হয়ে গেছে, যা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ছাপিয়ে গেছে।’ তিনি রাজনৈতিক সংস্কৃতি সংস্কারে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ আনেন রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে। দেশটির ৮৫ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট মিশেল আউনও রাজনৈতিক ক্ষমতাশালীদের থেকে সতর্কভাবে নিজেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে গেছেন। তবে স্বীকার করেছেন দেশের রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজন।

দুই ব্যক্তির এই সতর্ক অবস্থান অবশ্য দেশের সাধারণ মানুষকে ভজাতে পারেনি। সরকারের পদত্যাগের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর গতকালও তারা রাস্তায় নেমে আসে সেই পুরনো দাবি নিয়েই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও একই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে লেবানিজরা। একজন লিখেছেন, ‘সরকারের পদত্যাগ মানেই অব্যবস্থার সমাপ্তি নয়। এখনো (প্রেসিডেন্ট) আউন আছেন, বেরি (পার্লামেন্টে স্পিকার) আছেন এবং ব্যবস্থার নামে যে অব্যবস্থা চলছে তাও পূর্ণ রূপে বর্তমান।’

গত সপ্তাহের বিস্ফোরণে বন্দরসংলগ্ন দোকান ধসে গেছে অ্যাভেডিস অ্যানসারলিয়ানের। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘সরকার গেছে ভালো হয়েছে। তবে আমাদের নতুন রক্তের প্রয়োজন। নয়তো সরকারের আসা-যাওয়ায় কার্যকর কোনো পরিবর্তন আসবে না।’ ঠিক এক সপ্তাহ আগে বন্দরের গুদামে রাখা দুই হাজার ৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বিস্ফোরিত হলে ১৬২ জন নিহত এবং ছয় হাজার মানুষ আহত হয়। গৃহহীন হয়ে পড়ে প্রায় তিন লাখ মানুষ। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই বিস্ফোরণে নিদেনপক্ষে এক হাজার ৫০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা কাটিয়ে ওঠার সাধ্য লেবাননের নেই। দীর্ঘদিন থেকেই অর্থনৈতিকভাবে প্রায় পঙ্গু দেশটি বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সাহায্যও চরম দুর্নীতির কারণে শুকিয়ে আসছিল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে ঋণের শর্ত নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় সেই আলোচনাও কয়েক মাস ধরে স্থবির। বিস্ফোরণের পর বিদেশি সাহায্য আসতে শুরু করলেও সেই পুরনো প্রশ্নই আবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, যাদের প্রয়োজন তাদের কাছে কি সাহায্য পৌঁছাবে? নাকি সেই হরিলুটের ব্যবস্থাই অব্যাহত থাকবে?

আধুনিক লেবানন জন্ম থেকেই জ্বলছে। দুর্নীতির ব্যাপ্তি শুরু থেকেই এতটা সর্বব্যাপী না থাকলেও শান্ত, স্থিতিশীল রাষ্ট্র তারা কখনোই ছিল না। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের পতন হলে ফরাসি উপনিবেশের অধীনে আসে লেবানন। ১৯৪৩ সালে অলিখিত এক চুক্তির ভিত্তিতে যাত্রা শুরু করে আজকের লেবানন প্রজাতন্ত্র।

সরকারব্যবস্থাকে ভাগ করা হয় ধর্মের ভিত্তিতে। এই বিভাজন অনুসারে দেশের প্রেসিডেন্ট হবেন একজন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি। এই পদের মেয়াদ ছয় বছর, কোনো ব্যক্তি একবারই এ পদে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। পার্লামেন্টের স্পিকার হবেন শিয়া মুসলিম। এবং চার বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী হবেন একজন সুন্নি।

লেবাননের জন্মের সময় খ্রিস্টান জনসংখ্যা মুসলমানের তুলনায় বেশি ছিল। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৬৭ সালের মধ্যে লাখে লাখে ফিলিস্তিন মুসলমান শরণার্থী হিসেবে লেবাননে প্রবেশ করতে শুরু করে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিবর্তন আসতে শুরু করে দেশটির জনমিতিক হিসাবে। স্নায়ুযুদ্ধও লেবাননের রাজনীতিতে তীব্র প্রভাব ফেলে। এই সংকটে খ্রিস্টানরা পশ্চিমাদের দিকে এবং ফিলিস্তিনিসহ মুসলমানরা সোভিয়েতের দিকে হেলে পড়ে।

দুই পক্ষের মধ্যে শুরু থেকেই সম্পর্কে তিক্ততা দেখা দেয়। বিষয়টি চরমে উঠলে ১৯৭৫ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এই লড়াইয়ে নিহত হয় এক লাখ ২০ হাজার মানুষ। লেবাননের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হয় ৭৫ হাজার। যুদ্ধে ইসরায়েল ও সিরিয়ার মতো বিদেশি শক্তিও জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে লেবাননে বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

এরই একপর্যায়ে ১৯৮২ সালে ইসরায়েল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল দিয়ে হামলা শুরু করে। এই হামলার কিছু আগে সত্তরের দশকের একেবারে শেষভাগে শিয়ারা ইরানের সহায়তা নিয়ে গড়ে তোলে হিজবুল্লাহ সংগঠন। মূলত নাজাফে পড়ালেখা করা ধর্মীয় নেতারা মিলে এই সংগঠন গড়ে তোলেন। তাঁদের একটি শক্তিশালী সামরিক শাখাও তৈরি হয়। এদের অস্ত্র, অর্থ, গোলাবারুদ আসে ইরান থেকে। ইসরায়েল আক্রমণ করার পর লেবাননের ভেতর সবচেয়ে দ্রুত সাড়া দেয় এই গোষ্ঠী। পরে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলি বাহিনী সরে যায়। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী সেখানে মোতায়েন করা হয়।

তায়েফ চুক্তির মধ্য দিয়ে ১৯৮৯ সালে লেবাননের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে। আরব লীগের মধ্যস্থতায় সব মিলিশিয়া গোষ্ঠী ভেঙে দেওয়া হয়। তবে থেকে যায় হিজবুল্লাহর সামরিক শাখা। দুই বছর পর নির্বাচিত পার্লামেন্ট যুদ্ধের জন্য দায়মুক্তি আইন পাস করে। হিজবুল্লাহ এখনো একই অবস্থায় লেবাননে বিদ্যমান। এই গোষ্ঠী ১৮টি দেশের কালো তালিকাভুক্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আরব লীগের কালো তালিকাতেও তাদের নাম আছে। যদিও লেবাননে আজও তারা অত্যন্ত শক্তিশালী।

গৃহযুদ্ধের ইতি ঘটলেও গৃহদাহের ইতি ঘটেনি লেবাননে। রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাগাভাগির জের ধরে দেশটি কখনোই স্থিতিশীল হয়নি। এই টানাপড়েনেই ২০০৫ সালে এক গাড়িবোমা হামলায় নিহত হন তখনকার প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি। গত ১৫ বছরে তাঁর বিচার সম্পন্ন হয়নি। তাঁর ছেলে বাহা হারিরি গত সপ্তাহের বিস্ফোরণের পর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বন্দরের দায়িত্বে ছিল হিজবুল্লাহ। আর সেখানকার গুদামেই অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ছিল। তাদের অজ্ঞাতে ওই বন্দরে কিছু ঢোকানো বা বের করা সম্ভব নয়। তাদের অনুমোদনেই ২০ লাখ মানুষের এই শহরের প্রাণকেন্দ্রে ওই বিস্ফোরক স্থান পায়। এর দায় তারা এড়াতে পারে না।’

তবে দোষারোপের খেলা চলতে থাকলেও লেবাননে হিজবুল্লাহ ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ২০১৮ সালে ৯ বছর পর দেশটিতে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই গোষ্ঠী নির্বাচনে ৫৩ শতাংশ আসনে জয়ী হয়। এ দফায় সরকারে তাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ না থাকলেও প্রভাবিত করার শক্তি রয়েছে। এর আগের দফায় মন্ত্রিসভাতেও তাদের ৯ সদস্য ছিলেন। রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল লেবানন বহু বছর ধরেই হিজবুল্লার মাধ্যমে ইরান এবং হারিরি পরিবারের মাধ্যমে সৌদি আরবের ছায়া যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এর সর্বোচ্চ প্রকাশ দেখা যায় ২০১৭ সালে। সেবার প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে সৌদিতে ডেকে নিয়ে রীতিমতো গৃহবন্দি করে ফেলে তারা। অভিযোগ ছিল, তিনি হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারছেন না। পরে ফ্রান্সের মধ্যস্থতায় দেশে ফেরেন নিহত রফিক হারিরির ছেলে সাদ। এর পরপরই পদত্যাগ করেন তিনি।

রাজনৈতিক টানাপড়েন এবং দুর্নীতির কবলে পড়ে অর্থনৈতিকভাবেও খুব একটা এগোতে পারেনি লেবানন। ৭০ লাখ জনসংখ্যার এই দেশে উৎপাদন প্রায় নেই বললেই চলে। মুদ্রার দরপতনের কারণে বহু লেবানিজের পক্ষে মৌলিক খাদ্যের ব্যবস্থা করাও এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেবাননের মৌলিক খাদ্য চাহিদার বেশির ভাগই অন্য দেশ থেকে কিনে আনতে হয়। এর বেশির ভাগই হয় বৈরুত বন্দরের মাধ্যমে। যে বন্দর গত সপ্তাহের পরমাণু বোমার মতো বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে গেছে। বহু খাদ্যগুদাম ছিল বন্দরের আশপাশের এলাকাগুলোতে। সেগুলোও ধসে পড়ে লেবানিজদের দুর্ভিক্ষের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। হাজারো বাড়িঘর ধুলার সঙ্গে মিশে গেছে। 

পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদী মানুষ লেবাননে প্রায় নেই বললেই চলে। তাদের সঙ্গে অমত নেই লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানবিষয়ক সহকারী অধ্যাপক জেফ্রি জি কারামেরও। তিনি বলেন, ‘বিস্ফোরণের কারণে ক্ষমতাসীন শ্রেণি দৃশ্যপট থেকে উধাও হয়ে যাবে—এমন কিছু আশা করা অর্থহীন। ক্ষমতাসীনরা এই শোক, ক্ষোভ, হতাশা গিলে খেয়ে আবার স্বমূর্তিতে বিরাজমান হবেন। রাজপথে রক্তের দাগকে আবার নিজের স্বার্থে কাজে লাগাবেন তাঁরা। স্বাভাবিকতার একটি বোধ তৈরি করবেন। স্বল্প সময়ের জন্য হয়তো কিছু পরিবর্তনও আসবে। তবে ক্ষমতাসীনদের চেহারা বা স্বভাব পাল্টাবে না। তাঁরা মানবিক বিপর্যয় নিয়ে ভীত নন। কারণ এঁদের প্রায় সবাই নৃশংস যুদ্ধবাজ।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা