kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

করোনাজয়ী হয়েও মৃত্যুর কাছে হার

► করোনায় জটিল হয়ে পড়া অন্যান্য শারীরিক সমস্যা সামাল দিতে পারছেন না অনেকে
► ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদেরাগ, কিডনি বা ফুসফুসের জটিলতায় আক্রান্তদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঘটনা বেশি

তৌফিক মারুফ   

১২ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনাজয়ী হয়েও মৃত্যুর কাছে হার

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি করোনামুক্ত হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে আইসিইউ বিভাগের প্রধান ডা. মির্জা নাজিম উদ্দিন করোনায় আক্রান্ত হলে নিজের কর্মস্থল হাসপাতালেই ভর্তি হন। তিনিও বাঁচতে পারেননি। অথচ মৃত্যুর প্রায় দুই সপ্তাহ আগেই তিনি করোনামুক্ত হয়েছিলেন।

কেবল হাসপাতালে নয়, চিকিৎসায় করোনামুক্ত হয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পরও মারা যাচ্ছেন কেউ কেউ। দেশে করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার এখন ১.৩২ শতাংশ। এতে উদ্বেগ বেড়েছে বিশেষজ্ঞদের। যদিও এ ধরনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে আগে থেকেই বিভিন্ন রোগের জটিলতা ও বয়সজনিত সমস্যার কথা জানানো হয়েছে। বিশেষ করে করোনামুক্তির পর মারা যাওয়াদের বেশির ভাগই পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের বলে জানিয়েছে আইইডিসিআর সূত্র। যদিও করোনামুক্তির পর এই পর্যন্ত কতজন মারা গেছেন সেই সংখ্যা নির্দিষ্ট করে জানাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। 

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনা নেগেটিভ হওয়ার পরও নানা ধরনের জটিলতা থাকে—এমন ব্যক্তিদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

এ ক্ষেত্রে করোনার প্রভাবেই তাঁদের জটিলতাগুলো বেড়েছে, তা বলাই যায়।

আরেক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘করোনা-পরবর্তী রোগীদের পর্যবেক্ষণে নতুন কিছু বিষয় সামনে এসেছে। করোনামুক্তির পরও অনেকের মৃত্যু ঘটছে বা হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলেও পরে কিছু জটিলতা দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে অস্বাভাবিক হার্ট অ্যাটাক ও ফুসফুসের কিছু নতুন উপসর্গ। এগুলো ঠিক কী কারণে ঘটছে তা নিয়ে বিভিন্ন দেশে গবেষণা চলছে। আমরাও সেদিকে গভীরভাবে নজর রাখছি।’

জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির এই সদস্য আরো বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে সব হাসপাতালে বলে দিয়েছি, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা রোগীদের কমপক্ষে দুই সপ্তাহ ফলোআপে রাখতে। পাশাপাশি রোগী ও স্বজনদের যেন সতর্ক করে দেওয়া হয় বাসায় গিয়ে নির্দেশনা মেনে ওষুধ সেবন এবং অন্যান্য জটিলতার চেকআপ করার জন্য। এমনকি সমস্যা মনে করলে যেন দ্রুত হাসপাতালে ফিরে আসেন।’

কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রিলিজ নিয়ে যাওয়া রোগীদের পরবর্তী দুই সপ্তাহ পর্যন্ত এক ধরনের ফলোআপ করা হয় বা খোঁজখবর নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে করোনামুক্ত হয়ে বাড়ি ফেরা রোগীদের মধ্যে কারো কারো মৃত্যুর ঘটনার খবর পাচ্ছে হাসপাতালগুলো। তবে যাঁদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস, হৃদেরাগ, কিডনির সমস্যা বা ফুসফুসের জটিলতা ছিল তাঁদের ক্ষেত্রেই এমন মৃত্যুর ঘটনা বেশি।

রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে সার্ভিলেন্স সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত একজন চিকিৎসক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখান থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার দুই সপ্তাহ পর মারা গেছেন—এমন তথ্য আমরা পেয়েছি। এ ছাড়া অনেকেই হাসপাতাল থেকে তুলনামূলক সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও নিয়মিত ওষুধ সেবন না করা বা ফলোআপে না থাকায় নানা জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছেন বলেও আমরা জানতে পারছি।’

কেবল হাসপাতালভিত্তিক তথ্যই নয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিদিনের ফলোআপেও করোনামুক্ত রোগীদের মৃত্যুর খবর আসছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট-আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, হাসপাতালে যাঁদের মৃত্যু হয়েছে তাঁদের বেশির ভাগই ১০ থেকে ১৪ সপ্তাহ ধরে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অর্থাৎ তাঁদের বেশির ভাগই করোনামুক্ত হয়েছিলেন। তবে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর ভাইরাসটি শরীরের বিভিন্ন অর্গানে বিপজ্জনক প্রভাব ফেলে বা আগের জটিলতাগুলো আরো খারাপ করে দেয়। এ জন্য মৃত্যু ঠেকানো যায়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ঘটেছে মোট তিন হাজার ৪৭১ জন। এর মধ্যে ৬৮.৬১ শতাংশই ৫০ বছরের বেশি বয়সের মানুষ। এর বাইরে প্রতিদিনই উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া মানুষের বিভিন্ন সংখ্যা উঠে আসছে গণমাধ্যমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব জেনোসাইড স্টাডিজের তথ্য অনুসারে, এ পর্যন্ত করোনার মতো উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ঘটেছে এক হাজার ৯৮৫ জনের।

তবে ড. আলমগীর বলেন, উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর এমন তথ্য মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। কারণ উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে গড়ে ২৫ শতাংশের মতো পজিটিভ রেজাল্ট পাওয়া যায়। ফলে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর মোট সংখ্যাটি অতিরঞ্জিত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা