kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০। ৬ সফর ১৪৪২

করোনার থাবায় এলোমেলো ফুটবল

সনৎ বাবলা   

৮ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনার থাবায় এলোমেলো ফুটবল

ফুটবলে এত দিন কত স্বপ্নের ওড়াউড়ি ছিল। ঘরের মাঠে তিন ম্যাচে অন্তত এক জয়, কিছু পয়েন্ট পাওয়া ইত্যাদি হিসাব-নিকাশ ঘুরছিল কোচ-খেলোয়াড় এমনকি কর্মকর্তাদের মাথায়ও। তাঁদের সেই স্বপ্নের বুকে ছুরি চালিয়ে করোনাভাইরাস এলোমেলো করে দিয়েছে দেশের ফুটবলকে। দুই দিনে ২৪ জন ফুটবলারের করোনা পরীক্ষায় পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন ১৮ জন। সংক্রমণের হার অবিশ্বাস্যভাবে ৭৫ শতাংশ! তবে বারবার রিপোর্ট পরিবর্তনে সংশয় তৈরি হয়েছে পরীক্ষা নিয়ে।

সারাহ রিসোর্টে ক্যাম্প শুরুর আগ পর্যন্ত খেলাই ছিল আলোচনায়। শুরুর দিন থেকে তার দখল নিয়েছে পরীক্ষা ও পজিটিভের খবর। গত ৫ আগস্ট প্রথম দফায় চার ফুটবলারের শরীরে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে। পরদিন যোগ হয় সাতজন। গতকাল পরশু দিনের রিপোর্ট আবার সংশোধন করে জানানো হলো সেদিনই পজিটিভ হয়েছেন ১১ জন। তাতে ২৪ ফুটবলারের ১৮ জনই সংক্রমিত। অর্থাৎ আক্রান্ত সাতজন নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়েই ক্যাম্পে যোগ দিয়েছেন! সেখানে থাকা সহকারী কোচ মাসুদ কায়সারও পজিটিভ বলে জানানো হয়েছে কাল। তাতে ওই ক্যাম্পের আক্রান্ত নন যাঁরা তাঁরাও এখন ঝুঁকিতে। আজ পরীক্ষা হবে প্রাথমিক দলে ডাক পাওয়া শেষ সাতজনের। সংক্রমণের তীব্রতা দেখে তাঁদের মনেও বাসা বেঁধেছে ভয়। দলের এক নম্বর গোলরক্ষক আশরাফুল ইসলাম রানা বেসরকারি হাসপাতালের দেওয়া ‘নেগেটিভ’ রিপোর্ট হাতে পেয়েও দুশ্চিন্তামুক্ত হতে পারছেন না, ‘এভারকেয়ারের করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট গতকাল পেয়েছি। সেটা নেগেটিভ এলেও চিন্তামুক্ত থাকতে পারছি না। ফুটবলারদের যেভাবে করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসছে, আগামীকাল (আজ) আমারটা কী আসে কে জানে।’ প্রকৃতই এই অবস্থা থাকলে জাতীয় দলই তাতে আর দাঁড়াবে না। করোনা পরীক্ষা পুরোপুরিই এক ধাঁধা। নির্দেশনা মেনে ফুটবলাররা বাইরে পরীক্ষা করিয়ে ‘করোনা নেগেটিভ’ রিপোর্ট নিয়ে গিয়েও হোঁচট খেয়েছেন। বাফুফের তরফে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে করানো পরীক্ষায় যেমন বাবলু ও নাজমুল ইসলাম রাসেলের সংক্রমণ ধরা পড়ে।     

শুধু ফুটবল নয়, দেশের সামগ্রিক ক্রীড়াঙ্গনের জন্যও এটা অনেক বড় ধাক্কা। ফুটবলের এই অবস্থা দেখার পর অন্য কোনো খেলাও আর সাহস করবে না। ফুটবলারদের মধ্যে সংক্রমণের মাত্রা দেখে জাতীয় দল কমিটির চেয়ারম্যান কাজী নাবিল আহমেদ খুব হতাশ, ‘একসঙ্গে এত ফুটবলারের করোনা পজিটিভ হওয়াটা খুবই হতাশার। সব কিছু গুছিয়ে আনার পর ক্যাম্প শুরুর সময় এ রকম একটা ধাক্কার জন্য কেউ তৈরি ছিলাম না আমরা। অথচ ক্যাম্পে আসার প্রস্তুতি হিসেবে ফুটবলারদেরও আমরা সতর্ক থাকতে বলেছিলাম। এখন জাতীয় দল মাঠে নামানো কঠিন হয়ে গেছে।’ ক্যাম্পে কথিত সুস্থ হিসেবে আছে মাত্র ছয়জন! গতরাতের মতো সামনে যেকোনো দিন তাঁদের নামও পজিটিভের তালিকায় তুলে দিয়ে বিজ্ঞপ্তি পাঠাতে পারে বাফুফে। গত ১৬ জুলাই জুমে সংবাদ সম্মেলন করে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ফুটবল ক্যাম্পের ঘোষণা দিয়েছিল জাতীয় দল কমিটি। সেদিনই ফুটবলারদের উদ্দেশে সামাজিক দূরত্ব মেনে সতর্কতার সঙ্গে জীবনযাপনের কথা বলা হয়েছিল। করোনাকালে তাঁরা যেন সুস্থ অবস্থায় ক্যাম্পে যোগ দিতে পারেন, সে জন্য ওই নির্দেশনা দেওয়া। সেটা কেউ মেনেছেন, কেউ মানেননি। মামুনুল ইসলাম যেমন লোকে-লোকারণ্য মাঠে ‘প্রীতি ফুটবল ম্যাচ’ খেলেছেন, তেমনি দুই তরুণ আনিসুর রহমান ও ইব্রাহিমের ক্রিকেট খেলার ছবি ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সুতরাং দায় আছে ফুটবলারদেরও।

এদিকে ১১ ফুটবলারের করোনার সংক্রমণ শুনেই বিস্মিত ছিলেন জেমি ডে। এ মাসের মাঝামাঝি তাঁর ঢাকায় আসার কথা। কিন্তু এখানে সংক্রমণের উচ্চমাত্রা দেখে তিনিও ঢাকায় আসা নিয়ে দোলাচলে আছেন। নতুন রিপোর্টের পর তাঁর রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে উঠার কথা। সূচি অনুযায়ী, আগামী ৮ অক্টোবর সিলেটে বাংলাদেশ খেলবে আফগানিস্তানের বিপক্ষে। এরপর কাতারে অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলে তারা দেশের মাঠে ভারত ও ওমানের বিপক্ষে খেলবে বাকি দুটি ‘হোম’ ম্যাচ। কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলারদের এমন খবর শুনে প্রতিপক্ষ খেলতে চাইবে কি না এবং এ দেশে শেষ পর্যন্ত খেলা হবে কি না—এসব প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে। বাফুফের ভেতরও এই শঙ্কা আছে, তবে ফিফা-এএফসি থেকে এখনো সে রকম কোনো বার্তা আসেনি।

বাফুফেও বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালের রিপোর্ট ধরে বসে নেই। করোনা সংক্রমিত খেলোয়াড়দের নতুন জায়গায় পরীক্ষা করানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। সহসভাপতি কাজী নাবিল আহমেদ খেলোয়াড়দের আরেকবার পরীক্ষা করিয়ে ভালো খবর শুনতে চাইছেন, ‘বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে করোনা পরীক্ষার রিপোর্টে যাঁদের সংক্রমণ ধরা পড়েছে, তাঁদের কিন্তু কোনো ধরনের উপসর্গ নেই। এটা উপসর্গহীন করোনাও হতে পারে, আবার নেগেটিভও হতে পারে। তাই কোনো বেসরকারি হাসপাতালে তাঁদের আরেকবার করোনা পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা।’ বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী, ৩০ শতাংশ রিপোর্ট ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফুটবলের বেলায় তেমনই যেন হয়, এ আশায় বুক বেঁধে বাফুফে দু-তিন দিন বাদে আবার করোনা পরীক্ষায় নিয়ে যাবে আক্রান্ত ফুটবলারদের। করোনায় লণ্ডভণ্ড ফুটবল দৌড়াচ্ছে হাসপাতালে!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা