kalerkantho

সোমবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১০ সফর ১৪৪২

বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে তাঁর নিরলস পরিশ্রম দেখেছি

তোফায়েল আহমেদ

৬ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে তাঁর নিরলস পরিশ্রম দেখেছি

প্রতিবছর যখন আগস্ট ফিরে আসে, স্মৃতির পাতায় তখন অনেক কথা ভেসে ওঠে। আমার দুর্লভ সৌভাগ্য, মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে থেকে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। বারবার মনের কোণে ভেসে ওঠে সেই দিনগুলোর কথা, যখন বঙ্গবন্ধুকে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ মামলায় ফাঁসি দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। আমরা জাগ্রত ছাত্রসমাজ শত শহীদের রক্তের বিনিময়ে প্রবল গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি করে সেই মামলার আসামিদের নিঃশর্ত মুক্তিদানে স্বৈরশাসককে বাধ্য করেছিলাম। সংগ্রামী ছাত্র-জনতার গণবিস্ফোরণেই তিনি ‘মুক্তমানব’ হিসেবে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। আমরা সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ১৯৬৯-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ১০ লক্ষাধিক মানুষের সমুদ্রে গণনায়ক শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলাম। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে আমার মতো পাড়া-গাঁয়ের এক অখ্যাত ছেলে, সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করেছি, আমাকে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেন এবং মাত্র ২৭ বছর বয়সে আমি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হই।

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ১০ লক্ষাধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করে। আমার আসনসহ ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুত উপকূলীয় এলাকার জাতীয় পরিষদের ১৭টি আসনে পূর্বঘোষিত ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচন স্থগিত করা হয়। পরবর্তীকালে আমার নির্বাচন হয়েছিল ১৭ জানুয়ারি। তার আগে বঙ্গবন্ধু আমাকে ডেকে নিয়ে আসেন। তিনি সারা দেশ সফর করেন। আমি বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী ছিলাম। একই ট্রেনে গিয়েছি। তার পাশে থেকেছি। একই জনসভায় বঙ্গবন্ধুর আগে বক্তৃতা করেছি। মনে পড়ে, কুড়িগ্রামে মিটিং শেষ করে আমরা রংপুর দিয়ে যাচ্ছি। তখন গভীর রাত। দেখি, পথের ধারে লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে এক বয়স্ক লোক। বঙ্গবন্ধু গাড়ি থামালেন, লোকটিকে কাছে ডেকে নিলেন। আদর করলেন। লোকটি বললেন, ‘আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছি শুধু আপনাকে একটু দেখার জন্য। আজ আমার জীবন ধন্য হয়েছে।’ পরের জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘একজন মানুষের জীবনে আর কী চাওয়ার থাকে, যখন আমাকে একনজর দেখার জন্য গভীর রাত পর্যন্ত মানুষ লণ্ঠন হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে।’

ছয় দফার ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অঙ্গীকারে সন্ত্রস্ত হয়ে পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী ছল-চাতুরি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিল। বিশ্বাসঘাতকতা করে পূর্বঘোষিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ১ মার্চ একতরফাভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করে, যার ফলে পুরো দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে এবং বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চ তাঁর ভুবনবিখ্যাত ঐতিহাসিক ভাষণটি প্রদান করেন। এই ভাষণ প্রদানের আগের রাতেও বঙ্গবন্ধু বিচলিত ও চিন্তিত ছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে জিরো আওয়ারে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকার চারটি স্থান—বঙ্গবন্ধুর বাসভবন, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স, তৎকালীন ইপিআর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস টার্গেট করে গোলাবর্ষণ শুরু করার পরপরই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন...।’ পাকিস্তানি বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে। শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ।

দীর্ঘ ৯ মাস ১৪ দিন বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারে বন্দি ছিলেন। বন্দি অবস্থায়ও বঙ্গবন্ধু ছিলেন দৃঢ়। যেদিন ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়, সেদিন আমরা বিজয়ের পরিপূর্ণ স্বাদ পাইনি। কেননা জাতির পিতা তখনো পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি, যেদিন তিনি মুক্তিলাভ করেন এবং ১০ জানুয়ারি, যেদিন তিনি ফিরে এলেন, সেদিন আমরা স্বাধীনতার পূর্ণতা লাভ করেছি। কত কথা মনে পড়ে। ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হলেন। ১৪ জানুয়ারি আমার মতো একজন, সবেমাত্র ২৮ পেরিয়ে ২৯ বছরে পদার্পণ করেছি, নবীন কর্মীকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় রাজনৈতিক সচিব করে তাঁর পাশে রেখেছেন। পাশে থেকে দেখেছি, বিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে তাঁর নিরলস পরিশ্রম। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল, এই বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে একদিন তিনি ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, শস্য শ্যামল সোনার বাংলায় রূপান্তর করবেন। সেই লক্ষ্য নিয়েই তিনি কাজ করেছেন।

দেশ স্বাধীন করেই বঙ্গবন্ধু দায়িত্ব শেষ করেননি। দেশ স্বাধীনের পর শূন্য হাতে যাত্রা শুরু করেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভের পর লন্ডনে বিদেশি সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি যে বাংলাদেশে যাবেন, আপনার বাংলাদেশ তো যুদ্ধবিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপ। কিছুই নেই।’ তখন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার বাংলার মাটি ও মানুষ যদি থাকে, তবে এই ধ্বংসস্তূপ থেকেই একদিন আমি আমার বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, সুজলা সুফলা, শস্য শ্যামল সোনার বাংলায় পরিণত করব।’ আজ বাংলাদেশের যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, তার ভিত্তি বঙ্গবন্ধুর হাতেই হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে শক্তিশালী পরিকল্পনা কমিশন গঠন এবং তাঁর নির্দেশেই প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল। আজ যে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষপণ করা হয়েছে, তারও ভিত্তি স্থাপন করেছেন বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালে বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে। সেদিন আমি বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী ছিলাম। বাংলাদেশ গড়ার জন্য বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছেন। এ সময়ে ১১৬টি দেশের স্বীকৃতি আদায় করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ তথা অর্থনৈতিক মুক্তি, যা তিনি সমাপ্ত করতে পারেননি। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় স্বপ্ন ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, সমৃদ্ধিশালী সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা