kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১১ সফর ১৪৪২

প্রতিদিন ফ্লাইট মিস হচ্ছে অনেক বিদেশযাত্রীর

বিদেশযাত্রায় ‘গলার কাঁটা’ করোনা সনদ

► দায় নিচ্ছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
►লোকবল সংকটে বাসা থেকে নেওয়া হচ্ছে না নমুনা

মাসুদ রুমী   

২৮ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিদেশযাত্রায় ‘গলার কাঁটা’ করোনা সনদ

দুবাই যাবেন আব্দুল মতিন। ১৩ জুলাই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে ফ্লাইট তাঁর। কিন্তু সময়মতো করোনা নেগেটিভ সনদ না পাওয়ায় যাত্রা বাতিল হয় এই প্রবাসী শ্রমিকের। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় বাড়তি ভীতি তাঁর মধ্যে। দুবাইতে যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, সেখানে শিগগিরই যোগ দিতে হবে। এখন তাঁর কাছে ‘মহামূল্যবান’ করোনা সনদ। এই সনদ পেতেই আবার এসেছিলেন মহাখালীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আইসোলেশন সেন্টারে। গতকাল সোমবার নিজের ক্ষোভের কথা বললেন কালের কণ্ঠ’র কাছে। তিনি বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে এসেছি। লকডাউনের কারণে যেতে পারিনি। করোনার ঝুঁকি নিয়ে ফেনী থেকে বাসে করে এসেছি। সকাল ১১টার দিকে ভেতরে ঢুকে কাজ সারতে লাগল তিন ঘণ্টা। ফ্লাইট বাতিলের কারণে টিকিটের টাকাও মার গেল, করোনা টেস্টেও দুইবার গুনতে হলো সাত হাজার টাকা। এই ভোগান্তি আর আর্থিক ক্ষতির দায় কে নেবে?’

আব্দুল মতিনের মতো অনেকের কাছে বিদেশযাত্রায় এখন ‘গলার কাঁটা’ করোনা সনদ। গত শনিবার মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের ধর্মঘটের কারণে ফ্লাইট ছিল এমন অনেক যাত্রীই নমুনা দিয়ে সঠিক সময়ে করোনা সনদ না পাওয়ায় গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হতে পারেননি। এতে গচ্চা গেছে তাঁদের টিকিটের অর্থ। নমুনা দিতে গেলে বিদেশগামী যাত্রীদের পাসপোর্ট কপি, ভিসার কপি এবং টিকিটের কপি সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়। ফ্লাইটের নির্ধারিত সময়ের ৪৮ ঘণ্টা আগে নমুনা দিতে পারছেন যাত্রীরা। এরপর সনদ পেলে তবেই বিমানবন্দরের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে তাঁদের। সরকার ২৩ জুলাই থেকে আকাশপথে বিদেশ গমনকারীদের জন্য কভিড-১৯ (নেগেটিভ) পরীক্ষার সনদ বাধ্যতামূলক করেছে। বিমানযাত্রার ৭২ ঘণ্টা আগে কোনো নমুনা জমা নেওয়া হবে না এবং ২৪ ঘণ্টা আগে রিপোর্ট ডেলিভারির ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এই নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটায় অনেকেই চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, করোনা সনদ না পাওয়ায় ইদানীং অনেক যাত্রী ফ্লাইট মিস করছেন। গত শনিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া এমিরেটসের ফ্লাইটে চারজন বিজনেস ক্লাস এবং ১১ জন ইকোনমি ক্লাসের যাত্রী হাজির হতে পারেননি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং টার্কিশ এয়ারলাইনসের অনেক যাত্রী করোনা সনদ জটিলতায় বিদেশ যেতে পারেননি।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি০৪৭ ফ্লাইটের টিকিট কেটেছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। কিন্তু নমুনা জমা দিয়ে সঠিক সময়ে করোনা সনদ না পাওয়ায় গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা করতে পারেননি তিনি। মোস্তাফিজ বলেন, ‘করোনা টেস্টের রিপোর্ট আনতে গেলে ডিএনসিসির নমুনা সংগ্রহ কেন্দ্র থেকে বলা হয়, প্রিন্টারে সমস্যা হয়েছে, অনলাইনে রেজাল্ট পৌঁছে যাবে। রোদের মধ্যে না দাঁড়িয়ে থেকে সবাইকে বাড়ি চলে যাওয়ার জন্য বলা হয়। এরপর আমি ফ্লাইটের জন্য বিমানবন্দরে যাই। কিন্তু বিকেল ৫টা পেরিয়ে সন্ধ্যা ৬টা বাজলেও করোনা টেস্টের ফল মেলেনি। সনদ না থাকায় আমাকে বিমানবন্দরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। আমার টিকিটের দাম গচ্চা গেল। এমন দায়িত্বহীন আচরণের বিচার কোথায় দেব।’

জানতে চাইলে টার্কিশ এয়ারলাইনসের ঢাকা কার্যালয়ের সেলস অ্যান্ড ট্রাফিক অফিসার এজাজ কাদরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিমানবন্দরের হেলথ ডেস্ক ‘ওকে’ সিল না দিলে আমরা চেক ইন করতে পারি না। এই কারণে আমাদের ২৩ এবং ২৬ জুলাইয়ের ফ্লাইটে ১৮ জন যাত্রী করোনা সনদ সমস্যার কারণে গন্তব্যে যেতে পারেননি।’

দুবাইগামী যাত্রী কবীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৬৮ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে ওয়ানওয়ে টিকিট কেটেছি ফ্লাই দুবাইয়ে। করোনা সনদ নেগেটিভ পাব কি না জানি না। জানি না কপালে কী আছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুবাইগামী আরেকজন যাত্রী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত কভিড-১৯ সনদ পেলাম না। জরুরি কাজে বিদেশ যাওয়া হলো না। এর দায় নিতে হবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে।’

তিনি বলেন, বিকেল ৩টা থেকে ৫টার মধ্যে সনদ দেওয়ার কথা থাকলেও তারা দিচ্ছে না। ই-মেইলে পাঠানোর কথা বলা হলেও তা পাঠানো হচ্ছে না। আবার কল সেন্টারে ফোন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এই কি সেবার নমুনা।’ 

জানতে চাইলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা সনদ নিয়ে শুরু থেকেই ঝামেলা হচ্ছে। ওয়েবসাইটে করোনা সনদ না পেলে আমাদের কিছু করার নেই। এভাবেই আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

এদিকে চট্টগ্রামে করোনা পরীক্ষা শনাক্তকরণ সনদ পেতে আড়াই শতাধিক বিদেশগামী অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছে। গত দুই দিনে ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে অপেক্ষা করেও শেষ পর্যন্ত ২৫ জন বিদেশ যেতে পারেননি।

জানতে চাইলে মহাখালীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আইসোলেশন সেন্টারের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জোবায়দুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে স্যাম্পল নেওয়ার কাজটুকু সরাসরি তত্ত্বাবধান করছি। এরপরে তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মীরা ল্যাবে টেস্টের জন্য নিয়ে যাচ্ছে। ডাটা এন্ট্রি, রিপোর্ট তারা দেখভাল করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কাজটি করছে, আমরা তাদের সহায়তা করছি।’

গত শনিবার রিপোর্ট পেতে দেরি হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ল্যাবের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের কারণে তাদের রিপোর্ট দিতে কিছুটা দেরি হয়েছিল। প্রথম দিনে ১১১ জন নমুনা দিয়েছিল, যা এখন বেড়ে ৬৮০ জনে দাঁড়িয়েছে। আমরা ২০টি কাউন্টারের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছি, যেখানে মহিলা, বয়স্ক, বিদেশিদের জন্য আলাদা কাউন্টার করা হয়েছে। কোনো যাত্রী ফিরে যাচ্ছে না।’

বাসা থেকে স্যাম্পল কালেকশন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জোবায়দুর রহমান বলেন, ‘লোকবল সংকটের কারণে বাসা থেকে স্যাম্পল নিতে পারছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাদের লোকবল বাড়ছে, এটি চালু হবে বলে আশা করি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা