kalerkantho

বুধবার । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭। ১২ আগস্ট ২০২০ । ২১ জিলহজ ১৪৪১

পরিবর্তনের রাজনীতির তাগিদ বিএনপিতে

বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলার চেষ্টা

এনাম আবেদীন   

১৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




পরিবর্তনের রাজনীতির তাগিদ বিএনপিতে

ক্ষমতায় যেতে হলে বিএনপির রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে—এমন আলোচনা এখন দলটির গণ্ডি পেরিয়ে শুভানুধ্যয়ী ও সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যেও। বলা হচ্ছে—যে প্রক্রিয়া বা কর্মসূচি নিয়ে বিএনপি এখন চলছে তাতে ভবিষ্যতেও ক্ষমতায় আসা কঠিন হবে। ফলে দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আধুনিকায়ন এবং গুণগত পরিবর্তন আনার পাশাপাশি ভূ-রাজনীতি ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মকৌশল প্রণয়নের চেষ্টা চালাচ্ছে দলটি।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি পরিবর্তনের রাজনীতি শুরু করেছে সেই ভিশন ২০৩০ ঘোষণার সময় থেকেই। কারণ ক্ষমতায় গেলে দেশ কিভাবে পরিচালনা করব সে বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন ওই সময়ই রূপরেখা ঘোষণা করেছেন। এখন সংগঠনকে যুগোপযোগী করার চেষ্টা চলছে।’

‘সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ কঠোর হাতে দমনের পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে দুর্নীতি নির্মূল করে সুশাসন প্রতিষ্ঠাই ভবিষ্যতে বিএনপির সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার’ বলেন মির্জা ফখরুল।

সুধীসমাজে বিএনপিপন্থী বলে পরিচিত অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ মনে করেন, ‘ঘুরে দাঁড়াতে হলে মুক্তিযুদ্ধ, ভূ-রাজনীতি এবং বৈশ্বিক পরিবর্তনকে বিবেচনায় রেখে বিএনপিকে পলিসি নির্ধারণ করতে হবে। তা ছাড়া দুর্নীতিবিরোধী এবং সুশাসনের বিষয়ে জনগণের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে হবে। বিএনপি এরই মধ্যে সে লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে।’

সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের মতে, ‘জনগণের মধ্যে এমন একটি ধারণা আছে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের তুলনায় ভালো আর কী করবে! দুর্নীতি বা লুটপাট একই রকম চলতে থাকবে। ফলে ক্ষমতায় এলে বিএনপি এগুলো করবে না এটি জনগণের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। তা ছাড়া নেতৃত্বের প্রশ্নেও বিএনপিকে অস্পষ্টতা দূর করতে হবে।’

চেয়ারপারসন পদে খালেদা জিয়া বহাল থাকলেও ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তারেক রহমান। এতে বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে দলটির ভেতরে-বাইরে এক ধরনের অস্পষ্টতা রয়েছে। তবে লন্ডনে থাকলেও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে এখন পর্যন্ত তারেকই দল পরিচালনা করছেন। তাঁর নেতৃত্বে গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও ফলাফল ভালো করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং দেশের ভেতরে ‘ক্ষমতার বিকল্প বিভিন্ন কেন্দ্রের’ সমর্থন না পাওয়া এর প্রধান কারণ বলে মনে করা হয়। ওই কারণের জন্য কেউ কেউ দায়ী করেন দল পরিচালনায় তারেকের প্রকাশ্য তৎপরতা এবং শরিক দল জামায়াতকে ২২টি আসনে মনোনয়ন দেওয়ার ঘটনাকেও। এর পরে অবশ্য দলের সংসদ সদস্যদের সংসদে যোগদানের ঘটনা তারেকের একক সিদ্ধান্তে ঘটে। ওই ঘটনায় প্রথমে কিছুটা বিতর্ক তৈরি হলেও পরে নেতারা বলেন, সিদ্ধান্ত সঠিকই ছিল। কারণ বিএনপির সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে সংসদে গেলে দলে ভাঙন দেখা দিত।

ভোটের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ড্যাবের কমিটি গঠনপ্রক্রিয়াও দলের ইতিবাচক রাজনীতির পথে হাঁটার প্রমাণ বলে কেউ কেউ মনে করেন।       

প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে আছে বিএনপি। গত এক যুগে বেশ কয়েকবার সরকারবিরোধী আন্দোলন করেও নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে দলটি ব্যর্থ হয়েছে। উপরন্তু প্রায় এক লাখ মামলায় দলটির প্রায় ৩০ লাখ নেতাকর্মী আসামি থাকায় সাংগঠনিকভাবে বিএনপি স্থবির হয়ে পড়েছে। ২০০৮ সাল থেকে তিনটি নির্বাচনের দুটিতে ভরাডুবি এবং একটিতে অংশ না নেওয়ার ফলাফল পর্যালোচনা করে দলটি নতুন ধারার রাজনীতি চালু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—গত বছর থেকে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিকে নতুন পদ্ধতিতে সক্রিয় করা হয়েছে। পরিবর্তন আনা হয়েছে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ওই ফোরামের বৈঠকের ধরনেও। বৈঠকের আগে-পরে এজেন্ডা পৌঁছে যাচ্ছে কমিটির প্রত্যেক সদস্যের কাছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ওই এজেন্ডা তৈরি করছে দলীয় গবেষণা সেল বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট রিসার্স সেন্টার (বিএনআরসি)। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ওই সেল বিভিন্ন বিষয়ে দেশি-বিদেশি লেখক, শিক্ষাবিদ, পত্রিকার সম্পাদক ও কলামিস্টদের কাছ থেকে মতামত নিয়ে গবেষণার কাজ করছে। সম্প্রতি করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিএনপি ঘোষিত ৮৭ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ প্রস্তাবটিও তৈরি করেছে ওই সেল।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এক-এগারোর ঘটনা কেন ঘটেছে এবং সেটি উপলব্ধি না করে উদ্ভূত ফলাফল অন্য দলের অনুকূলে যাওয়ার ঘটনা বিশ্লেষণ নতুন করে কর্মকৌশল নির্ধারণের চেষ্টা করছে বিএনপি। এ ক্ষেত্রে ২০০৬ সালে সিপিডি ও নাগরিক কমিটির উদ্যোগে প্রণীত ‘বাংলাদেশ রূপকল্প ২০২১’ পর্যালোচনা করে দেখছে দলটি। বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে দলটির চিন্তাধারা ও কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনতে দেশের বড় দুটি বেসরকারি সংস্থা বিএনপিকে সহায়তা করছে। এ ছাড়া সুশাসন, বৈদেশিক সম্পর্ক রক্ষাসহ যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিএনআরসি দেশি-বিদেশি একাধিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে বলে জানা গেছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা