kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

জঙ্গিবাদবিরোধী তৎপরতা

শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে সচেষ্ট সুচিন্তা ফাউন্ডেশন

তৈমুর ফারুক তুষার    

১০ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে সচেষ্ট সুচিন্তা ফাউন্ডেশন

বছরখানেক আগে চট্টগ্রামের একটি মাদরাসায় জঙ্গিবাদবিরোধী সমাবেশ করতে যান সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের সংগঠকরা। অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত গাইতে আপত্তি জানায় ওই মাদরাসার শিক্ষার্থীরা। তাদের যুক্তি, একজন বিধর্মীর লেখা সংগীত তারা গাইবে না। এমন পরিস্থিতিতে সংগঠকরা শিক্ষার্থীদের বোঝান, দেশের জাতীয় পতাকা এবং সংগীত কোনো ধর্মবিশেষের নয়, সব নাগরিকের। এগুলো ইসলামবিরোধী নয়। দেশপ্রেমিক সব নাগরিকের এগুলোর প্রতি আনুগত্য থাকতে হয়। আর দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। পরে ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংগীত গাইতে রাজি হয়।

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মাদরাসাগুলোয় ধর্মীয় গোঁড়ামি দূর করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশপ্রেমিক একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে কাজ করছে সুচিন্তা ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ এ আরাফাত কালের কণ্ঠকে তাঁর প্রতিষ্ঠানের নানা কর্মকাণ্ডের কথা জানালেন।

মোহাম্মদ এ আরাফাত জানান, মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রাখা এবং তাদের দেশের উন্নয়নের মূল স্রোতের সক্রিয় অংশীদার করতে কাজ করছে সুচিন্তা ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্ত করে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা।

সুচিন্তার একাধিক সংগঠক কালের কণ্ঠকে জানান, ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রামের মাদরাসাগুলোয় সুচিন্তার সভা-সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য হলো ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে কেউ যেন শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদে যুক্ত করতে না পারে। শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে মুক্ত করে উদারপন্থী সহনশীল মনন গঠনে সহায়তা করা। দেশকে এগিয়ে নিতে কূপমণ্ডূকতা যে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রতিবন্ধক, সেটি বোঝানো। গুজব দেশের মানুষের সম্প্রীতি ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ বিষয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছে সুচিন্তা।

জানা যায়, সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের সংগঠকরা মাদরাসাগুলোয় গিয়ে শিক্ষার্থীদের জঙ্গিবাদে না জড়ানোর শপথ পাঠ করানোর পাশাপাশি জয় বাংলা স্লোগানের মধ্য দিয়ে সমাবেশ শেষ করেন। সমাবেশ শুরু করা হয় জাতীয় সংগীত গাওয়ার মধ্য দিয়ে। একই সঙ্গে সমাবেশে পরিবেশন করা হয় নাতে রসুল ও কোরআন তিলাওয়াত।

সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এ আরাফাত বলেন, ‘প্রতি মাসে আমরা ঢাকা ও চট্টগ্রামে অন্তত একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসায় সভা-সেমিনার করি। ঢাকায় মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ে আর চট্টগ্রামে মাদরাসায় জঙ্গিবাদবিরোধী সেমিনার করা হচ্ছে। মানুষের কাছে গিয়ে জঙ্গিবাদবিরোধী সচেতনতা তৈরি করে একটি অসাম্প্রদায়িক, আধুনিক সমাজ নির্মাণে কাজ করছি আমরা।’

তিনি বলেন, ‘আমরা মানুষের কাছে সঠিক তথ্য ও যুক্তি তুলে ধরে তাঁদের সত্যের পক্ষে থাকতে উদ্বুদ্ধ করার কাজটি করছি। যাদের কাছে তথ্য নেই, জ্ঞান নেই, তাদের ভুল পথে নিয়ে যাওয়া সহজ। আমরা তথ্যনির্ভর প্রজন্ম তৈরি করে তাদের ক্ষমতায়ন করতে চাই। বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, মৌলবাদী গোষ্ঠী গুজব ছড়িয়ে মানুষকে দিয়ে নানা অপকর্ম করাচ্ছে। সে জন্য আমরা চেষ্টা করছি, বিভিন্ন তথ্য একেবারে সাধারণ মানুষের বোঝার উপযোগী করে তাদের কাছে উপস্থাপন করতে, যাতে তারা সত্য ও মিথ্যার মাঝখানের পার্থক্যটা বুঝতে পারে।’

চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত ২৩টি মাদরাসায় জঙ্গিবাদবিরোধী সভা-সমাবেশ করা হয়েছে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি জালালাবাদ তালিমুল কোরআন মাদরাসায় জঙ্গিবাদবিরোধী সেমিনার করা হয়। গত বছরের ২৪ নভেম্বর আল আমিন রাবেয়া কামিল মডেল মাদরাসা মিলনায়তনে জঙ্গিবাদবিরোধী আলেম-উলামা-শিক্ষার্থী সমাবেশ করা হয়। ৭ নভেম্বর চট্টগ্রামের লালিয়ার হাট হোসাইনিয়া আলিম মাদরাসা মিলনায়তনে করা হয় সেমিনার। এর আগে ২৩ অক্টোবর উম্মুল কোরআন ইসলামিক একাডেমিতে, ৩০ সেপ্টেম্বর মসজিদিয়া ইসলামিয়া আলিম মাদরাসা, ২৮ আগস্ট কামাল ইশকে মুস্তাফা (দ.) ফাজিল মাদরাসায় সমাবেশ করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় চট্টগ্রামের মাদরাসাগুলোয় আরো ১৮টি জঙ্গিবাদবিরোধী সমাবেশ করা হয়েছে। এসব সমাবেশে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুচিন্তার সংগঠকরা উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম বিভাগের সমন্বয়ক জিনাত সোহানা চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক চর্চার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি দেশকে একটি অকার্যকর জঙ্গিরাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে যুবসমাজকে বিপথে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র আমাদের সমৃদ্ধি ও শান্তির পথে অন্তরায়। তরুণসমাজকে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মাধ্যমে একাত্ম করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে পারলেই জঙ্গিবাদ নির্মূল সম্ভব।’

জানা গেছে, ঢাকায় সাউথ এশিয়া ইউনিভার্সিটি, নর্দান কলেজ, হজরত শাহ আলী মহিলা কলেজ, রায়হান স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ন্যাশনাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, আশা ইউনিভার্সিটি ছাড়া আরো ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জঙ্গিবাদবিরোধী সেমিনার করে সুচিন্তা ফাউন্ডেশন। এতে দেশের বিশিষ্টজনরা শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে বক্তব্য দেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা