kalerkantho

বুধবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৭। ৫ আগস্ট  ২০২০। ১৪ জিলহজ ১৪৪১

ডাব্লিউটিসির নৈরাজ্য

নিজস্ব লাইটার জাহাজে পণ্য পরিবহনে বাধা

আতঙ্কে আমদানিকারকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও চট্টগ্রাম   

৭ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নিজস্ব লাইটার জাহাজে পণ্য পরিবহনে বাধা

নাব্যতা কম থাকায় দূর সমুদ্রে নোঙর করা হয় মাদার ভেসেল বা পণ্যবাহী বড় জাহাজ। আর সেই জাহাজ থেকে আমদানি করা পণ্য লাইটার বা ছোট জাহাজে করে খালাস করা হয়। দেশের ৩৭টি ঘাট ও শিল্প মালিকদের কারখানা ঘাটে এসব পণ্য খালাস করা হয়। আমদানি করা এসব পণ্যের বড় অংশ সিমেন্টশিল্পের কাঁচামাল, ইস্পাত তৈরির কাঁচামাল, কয়লা, সার ও ভোগ্য পণ্য। উপকূল অতিক্রম করার সরকারি অনুমতিপত্র রয়েছে এসব লাইটার জাহাজের। কিন্তু সম্প্রতি মালবাহী এসব লাইটার জাহাজের ওপর ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের নতুন (ডাব্লিউটিসি) ছাড়পত্র নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করায় অভ্যন্তরীণ রুটে পণ্য পরিবহনে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। ডাব্লিউটিসির ছাড়পত্র নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত অভ্যন্তরীণ নৌ রুটে পণ্য পরিবহনে বিশৃঙ্খলা এবং সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নিজেদের লাইটার জাহাজ থাকার পরও পণ্য পরিবহনে ডাব্লিউটিসির অনুমতির অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে শিল্পোদ্যোক্তা ও আমদানিকারকদের।

সূত্র মতে, উদ্যোক্তাদের আমদানি পণ্য নিজেদের লাইটার জাহাজে নিজ নিজ কারখানায় পরিবহনে বাধা সৃষ্টি করছে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডাব্লিউটিসি)। কর্ণফুলী নদী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন নৌঘাটে উদ্যোক্তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। লাইসেন্স ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে লাইটার জাহাজ আটকে দেওয়া হচ্ছে। ডাব্লিউটিসির এ ধরনের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে নদীপথে পণ্য পরিবহনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের এ নৈরাজ্যের মূলে রয়েছে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের এক আদেশ। গত ৪ জুন সংস্থাটির মহাপরিচালক কমোডর সৈয়দ আরিফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সার্কুলারে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ মালবাহী নৌযানগুলোর অনুকূলে উপকূল অতিক্রমের অনুমতিপত্র (বে-ক্রসিং) থাকার পরও যদি কোনো অভ্যন্তরীণ মালবাহী নৌযান ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের ছাড়পত্র ছাড়া মালামাল পরিবহন করে তাহলে ওই সব মালবাহী নৌযানের মালিক ও এজেন্টদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।

অধিদপ্তরের ওই আদেশ পাওয়ার পর বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন ডাব্লিউটিসির নেতারা। অভিযোগ উঠেছে, নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে জোর করে সব লাইটার জাহাজকে তাদের অধীনে নিয়ে আসতে চাইছে। তারা চাইছে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা লাইটার জাহাজ নিয়ে পণ্য খালাস করতে।

গত ২৯ জুন নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন শিল্পমালিক ও বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকে মাদার ভেসেল থেকে ডাব্লিউটিসির মাধ্যমে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাসের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরা হয়। আমদানিকারকরা বলেছেন, কোন জাহাজে করে তাঁরা ভেসেল থেকে পণ্য নিয়ে আসবেন তা নির্ধারণ করার কেউ নন নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। তা নির্ধারণ করার জন্য যথেষ্ট মালিক ও ডাব্লিউটিসি। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কারো পক্ষ নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসের জন্য ডাব্লিউটিসি নির্ধারিত লাইটার জাহাজে নানা সমস্যা রয়েছে। একদিকে এসব জাহাজের ভাড়া বেশি, পাশাপাশি এই জাহাজগুলো মানহীন ও ত্রুটিপূর্ণ। আবার এসব জাহাজের বীমাও নেই। জাহাজের মাস্টার ও নাবিকরা যুক্ত রয়েছেন কার্গো চুরির সঙ্গে। চুরির ঘটনা ঘটার পর অভিযোগ করলে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে না ডাব্লিউটিসি। এসব জাহাজের ডিবি ট্যাংকের কোনো সাউন্ডিং পাইপ না থাকায় জাহাজের কার্গো কখনো সঠিকভাবে পরিমাপ করা যায় না। ফলে কার্গো অথবা ব্যালাস্ট ওয়াটার ডিবি ট্যাংকে স্থানান্তর করে কার্গো চুরি সহজ হয়।

আমদানিকারকরা আরো বলছেন, ডাব্লিউটিসির কাছ থেকে লাইটার জাহাজ চাওয়া হলে সঠিক সময়ে পাওয়া যায় না। ডাব্লিউটিসির অনীহার কারণে মাদার ভেসেলকে বসিয়ে রেখে গুনতে হয় অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা। এতে আমদানি ব্যয় বেড়ে তার চাপ পড়ে ভোক্তা সাধারণের ওপর। দেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পরও আমদানিকারকদের লাইটার জাহাজ ইচ্ছামতো বন্ধ করে দিচ্ছে ডাব্লিউটিসি।

নদীপথে পণ্য পরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে জাহাজ মালিকদের সংগঠন ২০০৩ সালে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল গঠন করে। সেলটি গঠনের পর পণ্য পরিবহনে ডাব্লিউটিসি থেকে লাইটার জাহাজ ভাড়া করতে হতো। লাইটার জাহাজের চরম সংকটে ২০১৩ সালে কখনো কখনো একটি জাহাজ বরাদ্দ পেতে এক মাসের বেশি সময় লেগে যেত। ফলে পণ্য পরিবহনে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে দেশের বড় শিল্পগ্রুপগুলো। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অন্তত ২৫ জন শিল্পমালিক নিজেদের বিনিয়োগে তৈরি করেন লাইটার জাহাজ। এসব জাহাজ তৈরিতে প্রতিটির জন্য খরচ হয় ১০ কোটি টাকার বেশি। তখন থেকেই নিজেদের জাহাজে নিজেদের পণ্য পরিবহন শুরু করেন জাহাজ মালিকরা।

কিন্তু গত ৪ জুন নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক স্বাক্ষরিত সার্কুলার জারির পর কোটি কোটি টাকা খরচ করে লাইটার জাহাজ তৈরি করলেও পণ্য আনতে বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।

এ অবস্থায় ওই সার্কুলারটি বাতিল করতে সম্প্রতি নৌপরিবহন অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশে সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ)। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ডাব্লিউটিসির অদক্ষতা ও জ্ঞানের অভাবে উপকূল বাণিজ্যে আমদানিকারকদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। লাইটার জাহাজের মাস্টারদের ওপর ডাব্লিউটিসির কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। মাস্টারদের অদক্ষতায় গন্তব্যে পণ্য পৌঁছাতে সাপ্লাই চেইন বাধা পাচ্ছে। ফলে পণ্য পরিবহনে খরচ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারেও বেড়ে যাচ্ছে পণ্যের দাম। আমদানিকারকরাও পড়ছেন ব্যাপক ক্ষতির মুখে। অনিয়মের কারণে ডাব্লিউটিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

দেশের বড় ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলছেন, লাইটার জাহাজ বরাদ্দ পেতে ভয়ানক সংকটে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছিলাম। তখন বাধ্য হয়ে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে লাইটার জাহাজ কিনি। এসব জাহাজে নিজেদের পণ্যই পরিবহন করি। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে যা করা হচ্ছে, তাতে আমাদের পক্ষে আর পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় আছি। পদে পদে হয়রানি করা হলে যথাসময়ে নির্ধারিত গন্তব্যে ভোগ্য পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হবে না। এতে দেশজুড়ে পণ্য পরিবহনের সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।’

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের এক জাহাজ মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গতকাল কর্ণফুলী নদীর ১৫ নম্বর ঘাটে গিয়ে একদল লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে জাহাজকর্মীদের হুমকি দেয়। জাহাজে উঠে ডাব্লিউটিসির ছাড়পত্র চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিনিয়ে নেয়। এভাবে চলতে পারে না। এটাকে আমি বলব নৈরাজ্য। সরকার যদি সিদ্ধান্ত নেয় ডাব্লিউটিসির সিরিয়ালেই সব ছোট জাহাজ চলবে তাহলে আলোচনার মাধ্যমে সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে।’ 

একাধিক জাহাজ মালিক বলছেন, ডাব্লিউটিসির শীর্ষস্থানীয় নেতারা জাহাজের সিরিয়াল না মেনে নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী পণ্য পরিবহন করছেন। করোনাকালীন সাধারণ জাহাজ মালিকরা কোনো ট্রিপ না পেয়ে অলস বসে থাকলেও নেতারা ঠিকই পণ্য পরিবহন করে আয় করেছেন। নেতাদের জাহাজ সিরিয়ালে আনা গেলেই শৃঙ্খলা ফিরবে।

প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, ‘পণ্য পরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের প্রয়োজন আছে। কিন্তু নীতিমালা ঠিক করে প্রতিষ্ঠানটি সব স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণে পরিচালিত হতে হবে। একপক্ষীয় কিছু করা ঠিক নয়। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে আমরা শিল্পমালিকরা বৈঠকও করেছি। তিনি বিষয়টির যৌক্তিকতা বুঝতে পেরেছেন। আশা করছি ইতিবাচক কিছু হবে।’

মন্তব্য