kalerkantho

রবিবার। ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭। ৯ আগস্ট ২০২০ । ১৮ জিলহজ ১৪৪১

সাক্ষাৎকার

কভিড পর্যুদস্ত অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখবে কৃষি খাত

ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী ব্যাংক

জিয়াদুল ইসলাম   

৬ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কভিড পর্যুদস্ত অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখবে কৃষি খাত

করোনা মহামারিতে সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে অর্থনীতির ‘ব্যাকআপ’ হিসেবে পরিচিত ব্যাংক খাত। আর্থিক খাতের এই ক্ষতি প্রশমিত করতে কৃষি খাতকে একমাত্র সমাধান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ। প্রচলিত ব্যাংকিং দিয়ে এই সংকট মোকাবেলা করা যাবে না বলেও মনে করেন তিনি। কৃষি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে রূপালী ব্যাংক তিন বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে বলেও জানান তিনি। সম্প্রতি কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।

ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, ‘করোনায় বিশ্বের সব দেশে আর্থিক কর্মকাণ্ড প্রায় স্থবির। এর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যাংক খাত। উৎপাদন যদি না থাকে ব্যাংকিং হবে কোথায়? ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য স্থবির হয়ে আছে। রপ্তানি বাণিজ্য সহসা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সম্ভাবনাও কম। তাই আমাদের সামনে এখন প্রধান বিকল্প কৃষি খাত। কৃষি খাত আমাদের বাঁচিয়ে দেবে। কারণ কৃষি খাতে উৎপাদন বন্ধ হয়নি।’ তিনি বলেন, কৃষি খাতের প্রধান সমস্যা বিপণন। করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুতে যোগাযোগবিচ্ছিন্নতার কারণে কৃষি বিপণনে ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হয়েছিল। এখন পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকার এগিয়ে এসেছে। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য কিনে সেনাবাহিনী, পুলিশ বিভাগে দেওয়া হয়েছে।

রূপালী ব্যাংকে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি কৃষকদের জন্য এমন কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন, যাতে তাঁরা সরাসরি উপকৃত হন। এ প্রসঙ্গে রূপালী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকেই আমরা দুগ্ধ খামারিদের জন্য কম সুদে ঋণ দিচ্ছি। আমাদের স্লোগান তৈরি করেছি ‘করোনাকালে দুধ না ফেলে ঘি বানান, দুগ্ধ খাতে জাগুক প্রাণ’। শুধু ঘি নয়, দুগ্ধজাত বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে মিল্ক ভিটার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ হারে খামারিদের প্রণোদনা সুবিধার আওতায় ঋণ দেওয়ার বিষয়টি আমাদের পর্ষদে অনুমোদিত হয়েছে। আদা চাষে বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে রেয়াতি সুদে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পেঁয়াজ সংকট মোকাবেলায় পেঁয়াজ উৎপাদনে ব্যাপক ভিত্তিতে ঋণ বিতরণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রকার মৌসুমি ফল, ফুল ও সবজি উৎপাদন, ডেইরি এবং পোল্ট্রি খাতে উৎপাদন অব্যাহত রাখা ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সব শাখার মাধ্যমে ঋণ প্রদান করা হচ্ছে। টমেটো চাষিদেরও স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে।

কৃষির পাশাপাশি শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখতে যা যা করা দরকার তার সবই করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে রূপালী ব্যাংক। তিনি বলেন, ‘তৈরি পোশাক, স্বাস্থ্যসেবা খাত এবং উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছি আমরা। প্রধানমন্ত্রীঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় নিয়মিত গ্রাহকদের আউটস্টান্ডিং ঋণের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পুনরুর্থায়ন করছি, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারে। এ ছাড়া ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের দুই মাসের বেতন এরই মধ্যে প্রদান করা হয়েছে। আরো এক মাসের অর্থ নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করা হবে।’

জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিক্যালকে ঋণ দিয়েছে রূপালী ব্যাংক। নির্বিঘ্নে কভিড রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি সুবিধাও প্রদান করা হয়েছে। রূপালীর এমডি বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধরে রাখতে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত ব্যাংকিং দিয়ে এখনকার পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যাবে না। জুলাইয়ের পর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রানুযায়ী অর্থনীতির গতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা বোঝা যাবে। কোথাও আগুন লাগলে প্রাথমিকভাবে আগুন নেভানোই মূল কাজ, অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করা সময়োপযোগী নয়। কী করতে হবে, মুনাফা হবে কি না—সে চিন্তা এখন অপ্রয়োজনীয়। ব্যাংক খাতের এখন প্রয়োজন টিকে থাকা।

বর্তমান কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেও আশার কথা শোনালেন রূপালীর এমডি। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে ব্যাংকিং খাতে বড় ধাক্কা লাগলেও গত তিন মাসে আমাদের প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা আমানত বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের রেমিট্যান্সও বেড়েছে। তাই বলা যায়, যে আশঙ্কা সবাই করছে, তা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারব। যারা বলে, কর্মচারীদের বেতন কমাতে হবে, সেটাও সঠিক কোনো পদ্ধতি নয়। এখন মুনাফার কথা কোনোভাবেই চিন্তা করার দরকার নেই। আমরাও এই মূহূর্তে কোনো মুনাফার কথা ভাবছি না।’

ডিজিটাল ব্যাংকিং ও গ্রাহকসেবায় রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য যেকোনো ব্যাংকের তুলনায় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে রূপালী ব্যাংক। তিনি জানান, আগামী তিন বছরের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকেও পেছনে ফেলে ডিজিটালি এক নম্বর ব্যাংক হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। ব্যাংক খাতে সুদহার কমে আসায় অর্থনীতি নিয়েও বেশ আশাবাদী এই দক্ষ ব্যাংকার বলেন, ‘বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ছিল সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এটা আগেই নামিয়ে এনেছে। আর গত ১ এপ্রিল থেকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোও এটা কার্যকর করেছে। ফলে পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলেই আমদানি-রপ্তানিসহ বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে।’

করোনা মহামারির মধ্যেও রূপালী ব্যাংকের কর্মীদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উল্লেখ করে আল মাসুদ বলেন, ‘এই ব্যাংকের সব কর্মীর অভিভাবকত্বের দায়িত্ব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে দিয়েছেন। এই ব্যাংকের প্রতিটি কর্মী আমার সন্তানের মতো। তাই এটা আমার নৈতিক দায়িত্ব যে কোনো সংকটকালে কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে হবে আমাকে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা