kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

‘জরুরি কাজের কথা বলে বাজার করে এনেছি’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘জরুরি কাজের কথা বলে বাজার করে এনেছি’

বিকেল ৩টা। ফোল্ডার স্ট্রিটের যে প্রান্তটি প্রধান সড়কের (গুলিস্তান থেকে রাজধানী মার্কেটের দিকে যেতে) সঙ্গে যুক্ত, সেখানে বাঁশ দিয়ে বেড়া দেওয়া। বেড়ার সঙ্গে লাগানো ব্যানারে বড় করে লেখা ‘প্রবেশ নিষেধ’। সেই বেড়ার ফাঁক দিয়ে এক ব্যক্তি লাউ, শাকসবজিভর্তি বস্তা ঢুকিয়ে দিয়ে স্ত্রীকে ফোন করেন। বেড়ার কাছাকাছি এক বাসা থেকে এক নারী বেরিয়ে এসে সেই বস্তা টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যান। ওই ব্যক্তি সেখান থেকে প্রধান সড়ক হয়ে চণ্ডীচরণ স্ট্রিটের প্রবেশপথ দিয়ে বাসায় চলে যান।

যাওয়ার আগে ওই ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের গলিতে একটি বাসায়ও করোনা রোগী নেই। অথচ আমাদের একটা কষ্টের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এই খানে মীনাবাজার, স্বপ্ন এসব থেকে অর্ডার দিয়ে মালামাল কিনতে হয়। কিন্তু তাদের কাছ থেকে গলা কাটা দামে আমরা এসব কিনব কেন? এই কারণে জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে বের হয়ে কাঁচাবাজার করেছি।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রাজাবাজারে লকডাউন ছিল, ওই খানে কি সবাই ভালো হয়ে গেছে?’

গতকাল শনিবার সকাল থেকে লকডাউন শুরু হওয়া ওয়ারীর একটি খণ্ডচিত্র এটি। অনেককেই নানা অজুহাতে লকডাউন করা এলাকায় যাওয়া-আসা করতে দেখা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কড়াকড়িও দেখা গেছে। লকডাউন নিয়ে ক্ষোভ যেমন আছে, তেমনি করোনার বিস্তার ঠেকাতে কষ্ট করার পক্ষের লোকেরও অভাব নেই।

যেমন—মো. মোস্তফা নামের এক ব্যক্তি পার্সেল নিতে ওয়ারী থানার কাছে ৪ নম্বরে গেটে। জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা তো একটা বড় সংকট। আমাদের এলাকা লকডাউন হওয়ায় কষ্ট হচ্ছে। এর পরও যদি করোনামুক্ত হয়, তাতে আমরা কষ্টটা মানতে রাজি। দায়সারাভাবে লকডাউন হলে তা করোনা প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা রাখবে না।’

চণ্ডীচরণ স্ট্রিট ছাড়াও এলাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার আরেকটি পথ র্যাংকিন স্ট্রিট। ওই পথ দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন দুই নারী। তাঁদের হাতে আপেল, কমলাসহ কয়েক রকমের ফল। প্রবেশপথেই তাঁদের আটকালেন পুলিশ সদস্যরা। জানতে চাইলেন তাঁরা কোথায় কার কাছে যাবেন। ওই দুই নারী জানালেন, অসুস্থ এক আত্মীয়কে দেখার জন্য যাবেন তাঁরা। কিন্তু পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকরা জানিয়ে দেন ভেতরে ঢোকা সম্ভব নয়। পরে তাঁরা অসুস্থ আত্মীয়র সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে চলে যান।

জানা গেছে, গতকাল সকাল ৬টা থেকে ওয়ারীতে লকডাউন শুরু হয়েছে। চলবে ২৫ জুলাই পর্যন্ত। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন ওই এলাকার টিপু সুলতান রোড, যোগীনগর রোড ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের একটি অংশ (গুলিস্তান থেকে রাজধানী মার্কেটের দিকে যেতে), লারমিনি স্ট্রিট, ফোল্ডার স্ট্রিট, হেয়ার স্ট্রিট, ওয়্যার স্ট্রিট, র্যাংকিন স্ট্রিট ও নবাব স্ট্রিট লকডাউনের আওতায় রয়েছে। তিন-চার শ বাড়ি রয়েছে লকডাউন করা এলাকায়।

এর মধ্যে যে পথগুলোতে লোহার গেট রয়েছে, সেগুলো আটকে দেওয়া হয়েছে। যেগুলোতে কোনো গেট নেই সেগুলো বাঁশ দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি রাস্তার বন্ধ স্থানে বড় করে ব্যানার টানিয়ে রাখা হয়েছে। ব্যানারে লেখা রয়েছে, ‘কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধে ওয়ার্ড-৪১ ওয়ারী রেড জোন এলাকা লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। ৪ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত।’ বড় করে লেখা রয়েছে ‘প্রবেশ নিষেধ’।

৪ নম্বর গেটে দায়িত্ব পালনকারী স্বেচ্ছাসেবক মো. আজাদ রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ১২০ জন প্রতি শিফটে কাজ করছি। কারো কোনো সমস্যা হলে আমাদের ফোন করে, আমরা তাদের বাড়িতে গিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করি। খাবারদাবার তাদের বাড়িতে পৌঁছে দিই।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা রাস্তায় দেখছি কেউ বের হয় কি না। যদি বের হতে চায়, তাহলে তাদের বাসায় চলে যাওয়ার জন্য বলি।’ ওয়ারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে কভিড পরীক্ষার বুথ খোলা হয়েছে বলে জানান এ স্বেচ্ছাসেবক।

কিন্তু গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লকডাউন কার্যক্রম পরিদর্শন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. এমদাদুল হক। কয়েকটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, তিনি স্বাস্থ্যবিধি না মেনে গাড়িবহর নিয়ে এলাকায় প্রবেশ করেন, যদিও তিনি এমন অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন।

এমদাদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, প্রথম দিন হিসেবে যদি কোনো ঘাটতি থেকে থাকে, তা আগামী দিনগুলোতে ঠিক হয়ে যাবে। লকডাউনের মধ্যে নাগরিক সেবা দিতে ওয়ারীতে ই-কমার্স রয়েছে, ভ্যান সার্ভিস রয়েছে। তারা বিভিন্ন খাবার নিয়ে ভেতরে অবস্থান করছে। ওষুধের দোকানগুলো খোলা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার লোকজন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছে। এ ছাড়া লকডাউন এলাকায় দুজন চিকিৎসক রয়েছেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তাঁরা করোনায় আক্রান্ত ৪৬ জন রোগীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেছেন। করোনার উপসর্গ আছে এমন পাঁচজনের নমুনাও সংগ্রহ করেছেন তাঁরা। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের জন্য প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানান তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা