kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭। ১১ আগস্ট ২০২০ । ২০ জিলহজ ১৪৪১

বাড়েনি চিকিৎসা সুবিধা

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

৩ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাড়েনি চিকিৎসা সুবিধা

ঢাকার পর চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হচ্ছে কিছুদিন ধরে। বেড়েছে মৃত্যুহারও। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের, ঢাকা বিভাগে ১১ জনের। অথচ চট্টগ্রাম বিভাগে করোনার চিকিৎসাসেবা ঢাকার তুলনায় অপ্রতুল। ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ খ্যাত চট্টগ্রামে করোনা চিকিৎসার হাসপাতাল, চিকিৎসা সরঞ্জামাদি, বিশেষ করে আইসিইউ, ভেন্টিলেটর, সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট রয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগরসহ বিভাগের ১১ জেলায় এ পর্যন্ত শনাক্ত রোগী ২২ হাজার ২১২ জন। এর মধ্যে মহানগর ও চট্টগ্রাম জেলায়ই বিভাগের আক্রান্তের ৪১ শতাংশ। বিভাগে এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৪৮৮ জনের, যার মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলায়ই ১৮৪ জন। বিভাগে মৃত্যুহার ২৫ শতাংশ; অথচ মহানগর ও চট্টগ্রাম জেলায় তা ৩৭.৭০ শতাংশ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকায় সম্প্রতি আক্রান্ত ও মৃত্যুহার কমতে শুরু করলেও চট্টগ্রামে ক্রমেই বাড়ছে। ঢাকায় সুস্থ হওয়ার হারও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় বিশ্বমানের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বিশেষায়িত হাসপাতালসহ প্রায় অর্ধশত সরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া আছে অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের উন্নত মানের হাসপাতাল। রয়েছে অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকও। কিন্তু চট্টগ্রামে চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান একেবারে অপ্রতুল। দেশের জাতীয় রাজস্ব আয়ের বেশির ভাগ চট্টগ্রাম থেকে যাচ্ছে। অথচ চিকিৎসাসেবায় ঢাকা থেকে বন্দরনগর বহুগুণ পিছিয়ে আছে। এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে করোনা পরিস্থিতিতে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মহানগরে সরকারি ব্যবস্থাপনায় মাত্র পাঁচটি হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা চলছে। হাসপাতালগুলো হলো—চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতাল, বিআইটিআইডি হাসপাতাল ও বন্দর হাসপাতাল। এর বাইরে বেশ কিছু বেসরকারি হাসপাতালে করোনার চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এসব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে নানামুখী সমস্যা ও সংকট রয়েছে।  

করোনা চিকিৎসার বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কালের কণ্ঠকে জানান, এমনিতেই চিকিৎসাব্যবস্থায় ঢাকার মতো মানসম্মত চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় চট্টগ্রাম অনেক পিছিয়ে। চট্টগ্রামে সরকারি দুটি হাসপাতালে মাত্র ১৭টি আইসিইউ শয্যা আছে। বেসরকারি সব হাসপাতাল মিলে শতাধিক আইসিইউ শয্যা থাকলেও সেগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে করোনা রোগী ভর্তি করেনি। প্রশাসনের নানামুখী চাপ এবং সামাজিক আন্দোলনের মুখে কিছুদিন ধরে নগরের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে করোনার চিকিৎসাসেবা শুরু হয়েছে। এর পরও ঢাকার তুলনায় চট্টগ্রাম করোনার চিকিৎসাসেবায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এ কারণে মৃত্যুহার বাড়ছে।

চিকিৎসকরা জানান, তিন বছর আগে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম চালু হলেও এখনো হাসপাতাল শুরু হয়নি। বিভাগের একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল। এখানে ১০০ শয্যার করোনা ওয়ার্ড চালুর পাশাপাশি এখন করোনা রোগীদের জন্য সাত শয্যার আইসিইউ রয়েছে। চমেক হাসপাতালের আগে চট্টগ্রামে প্রথমে করোনা হাসপাতাল হিসেবে অনেকটাই এককভাবে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে নগরের আন্দরকিল্লাস্থ চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল। এখানে শয্যাসংখ্যা বাড়িয়ে প্রায় দেড় শ করা হয়েছে। এর বাইরে ১০ শয্যার আইসিইউ রয়েছে করোনার চিকিৎসায়। তবে চমেক হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম থাকলেও জেনারেল হাসপাতালে এখনো চালু হয়নি; কাজ চলছে। এর বাইরে সরকারি আরো তিনটি হাসপাতালে করোনার চিকিৎসাসেবা চললেও সেখানে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম ও আইসিইউ নেই। নগরে বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় অর্ধশত হাসপাতাল ও ক্লিনিক থাকলেও সেখানে হাতে গোনা কয়েকটিতে সেন্ট্রাল অক্সিজেন রয়েছে। আইসিইউ রয়েছে প্রায় ১৫টি হাসপাতালে। বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে মাত্র দুটিতে আইসিইউ আছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের উপপরিচালক ডা. শফিকুল ইসলাম গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম কম। আইসিইউয়ের অভাব রয়েছে। তবে আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুহার কম রয়েছে।’

পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদ চট্টগ্রামের সভাপতি বিশিষ্ট চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘ঢাকার তুলনায় চট্টগ্রামে চিকিৎসাসেবার সুযোগ একেবারে অপ্রতুল। চমেক হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতাল সরকারি এ দুটি হাসপাতালের ওপর শুধু চট্টগ্রাম নয়, পুরো বিভাগ নির্ভরশীল। ঢাকায় সরকারি-বেসরকারি বহু চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান থাকলেও চট্টগ্রামে তা নেই। আর এখানে সরকারি-বেসরকারি যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, সেগুলোও করোনা পরিস্থিতিতে যথাযথভাবে এগিয়ে আসছে না।’

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসেসিয়েশন (বিএমএ) চট্টগ্রামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. মোহাম্মদ শরীফ বলেন, ‘ঢাকায় সরকারি-বেসরকারি মিলে তিন শতাধিক চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে অনেকগুলো হাসপাতালে উন্নত মানের চিকিৎসাসেবা রয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী হলেও চিকিৎসাব্যবস্থা অপ্রতুল। এর প্রভাব পড়েছে করোনা পরিস্থিতিতে। চট্টগ্রামে যেভাবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বেড়েছে, তাতে প্রকৃত লকডাউনের বিকল্প নেই।’   

বিএমএ চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রামে এখনো চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান সেভাবে গড়ে ওঠেনি। বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো এখন কভিড, নন-কভিড রোগী ভর্তি করছে। সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম রয়েছে হাতে গোনা কয়েকটিতে। চিকিৎসা সুবিধা না বাড়ালে সামনে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা