kalerkantho

শুক্রবার। ২৬ আষাঢ় ১৪২৭। ১০ জুলাই ২০২০। ১৮ জিলকদ ১৪৪১

কিছুটা থিতু তিস্তা রুদ্ররূপে যমুনা

বানের পানিতে আটকা ও ভাঙনে দিশাহারা হাজার হাজার মানুষ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৩০ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কিছুটা থিতু তিস্তা রুদ্ররূপে যমুনা

গাইবান্ধার ফুলছড়ির রসুলপুর এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ঢুকে পড়েছে বন্যার পানি। এ অবস্থায় মালপত্র যতটুকু রক্ষা করা যায়, সে চেষ্টায় ব্যস্ত সেখানকার মানুষ। গতকালের চিত্র। ছবি : কালের কণ্ঠ

উজানের ঢল ও টানা বর্ষণে ‘ভয়ংকর’ হয়ে উঠছে উত্তর জনপদের অন্যতম প্রধান নদী যমুনা। এখনো বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছে যমুনার পানি। বিপত্সীমার অনেক ওপরে বইছে ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘটের পানিও। বানের পানিতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় দিশাহারা মানুষ। পানি বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে নদীভাঙনও। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পদ্মার পানি বেড়ে বিপত্সীমা ছুঁই ছুঁই করছে। এদিকে ‘আগ্রাসী’ তিস্তার গর্জন কিছুটা থিতু হয়ে এসেছে। তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে কমতে শুরু করেছে পানি। সুরমা নদীর পানি কমতির দিকে থাকলেও এখনো বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছে। কমেছে যাদুকাটার পানিও। অনেক এলাকায় ডুবে গেছে রাস্তাঘাট। ভেসে গেছে মাছ, ডুবেছে ফসল। কিছু বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ তৎপরতা শুরু হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর—

ধুনট (বগুড়া) : টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনটে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। যমুনা নদীর পানি গতকাল সোমবার বিকেল ৩টার দিকে বিপত্সীমার ৬২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। যমুনা নদীর অববাহিকায় চর ও আশপাশের গ্রামগুলো জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে ফসলের ক্ষেত। বন্যাকবলিত অনেকে পাকা স্কুল, সড়ক, বাঁধ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। বগুড়া জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আজাহার আলী বলেন, বন্যাদুর্গত এলাকার জন্য সরকারিভাবে ২৫ মেট্রিক টন চাল ও দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

কাজীপুর (সিরাজগঞ্জ) : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং ভারি বর্ষণে কাজীপুর পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বেড়ে গতকাল দুপুর থেকে বিপত্সীমার ৬৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে চরাঞ্চলের ছয়টি ইউনিয়নের বাড়িঘর তলিয়ে গিয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়ছে লাখো মানুষ। এদিকে যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে বিপত্সীমার ৩৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

গাইবান্ধা : গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘটের পানি বাড়ছেই। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, গতকাল বিকেল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি ফুলছড়ির তিস্তামুখ ঘাট পয়েন্টে বিপত্সীমার ৮০ সেন্টিমিটার এবং ঘাঘটের পানি নতুন ব্রিজ পয়েন্টে বিপত্সীমার ৫৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ফলে জেলার আরো নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ওই সব নদীর তীরবর্তী সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার ১৫ ইউনিয়নের কমপক্ষে ২৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে নদীভাঙনও। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান জানান, পানি বাড়তে থাকায় ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও গাইবান্ধা শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

জামালপুর : জামালপুরে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। গতকাল বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বিপত্সীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদের পানিও দ্রুত বাড়ছে। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারি বর্ষণে জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ী ও বকশীগঞ্জ উপজেলায় আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এদিকে বন্যার পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তারা হলো মেলান্দহের সানি (১০) ও মাদারগঞ্জের সোহান (৭)।

কুড়িগ্রাম (আঞ্চলিক) : রৌমারী ও রাজীবপুরে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চল ও অববাহিকায় দুই উপজেলার ১০ হাজার পরিবারের ঘরে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। পানির তীব্র চাপে কর্তিমারী চৌরাস্তার বেড়িবাঁধ ভেঙে নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়েছে। বন্যার পানিতে ৭০ হাজার মানুষ গৃহবন্দি হয়ে আছে।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) : গোয়ালন্দে পদ্মা নদীর পানি বিপত্সীমা ছুঁই ছুঁই করছে। গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ২৮ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে বিপত্সীমার মাত্র ৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে পদ্মায় পানি বেড়ে গোয়ালন্দের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ।

নীলফামারী : নীলফামারীতে আগের চেয়ে কমেছে তিস্তার পানি। গতকাল বিকেল ৩টায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি বিপত্সীমার ৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। এর আগে গত শুক্রবার থেকে রবিবার পর্যন্ত তিস্তার পানি বিপত্সীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

লালমনিরহাট : লালমনিরহাটে টানা চার দিন পর তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে (ডালিয়া) পানি বিপত্সীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও বাড়িঘর থেকে পানি নেমে গেছে। তবে বেড়েছে নদীভাঙন। এদিকে গতকাল বিকেলে ধরলার পানি বিপত্সীমার ২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। জেলা প্রশাসক আবু জাফর জানিয়েছেন, সরকারিভাবে বন্যাকবলিত মানুষের মাঝে এরই মধ্যে ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি নদীভাঙনের শিকার পরিবারগুলোকে সহায়তার আওতায় আনতে তালিকা তৈরি হচ্ছে।

উলিপুর (কুড়িগ্রাম) : উলিপুরে ধরলা ও তিস্তার পানি কমতে থাকায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এতে বন্যাকবলিত উপজেলার আটটি ইউনিয়নের পানিবন্দি মানুষের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও তারা শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে রয়েছে।

সুনামগঞ্জ : বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল বন্ধ থাকায় সুরমা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও এখনো বিপত্সীমার ওপর দিয়ে বইছে। তবে নদীর পানি এখনো নিম্নাঞ্চলে চাপ সৃষ্টি করায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান বলেন, গতকাল বিকেল থেকে সুরমা নদীর পানি বিপত্সীমার ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে যাদুকাটার পানি বিপত্সীমার নিচ দিয়ে বইছে।

জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) : জগন্নাথপুরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কয়েক দিনের অব্যাহত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের শ্রীধরপাশা, জগদ্বীশপুর, গলাখাই, কাদিপুর, পাড়ারগাঁও গ্রামের নিচু এলাকা ডুবে গেছে। এতে দুই শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

বারহাট্টা (নেত্রকোনা) : বারহাট্টায় গত শুক্রবার রাত থেকে টানা চার দিনের বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে বন্যা দেখা দিয়েছে। উপজেলার চিরাম, রায়পুর, বাউশী, আসমা, সাহতাসহ সাত ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে নিচু এলাকার শত শত পরিবার।

শিবচর (মাদারীপুর) : পদ্মা নদীর পানি অস্বাভাবিক বেড়ে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ভয়াবহ ভাঙনঝুঁকিতে রয়েছে একাধিক স্কুল ভবন, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, কমিউনিটি ক্লিনিক, বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। নদীভাঙন প্রতিরোধে স্থানীয় সংসদ সদস্য চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরীর নির্দেশে জিও ব্যাগ ডাম্পিং করে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। 

কেশবপুর (যশোর) : কেশবপুরে ভারি বর্ষণে পৌর এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এরই মধ্যে পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যকুল ও হাবাসপোল এলাকার ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে।

রাজবাড়ী : গড়াই নদীর পানি বাড়তে থাকায় বালিয়াকান্দির দুটি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম ভাঙনের কবলে পড়েছে।

চাঁদপুর : ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়েছে চাঁদপুরের ইব্রাহিমপুর ও পাশের আলুবাজার ফেরিঘাট এলাকা। গত কয়েক দিনের মেঘনার ভাঙনে দুই শতাধিক বসতবাড়ি, ছোট একটি বাজার এবং বিআইডাব্লিউটিসির বিশাল টার্মিনালের একাংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা