kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

পুঁজিবাজারসহ কয়েক খাতে কালো টাকা বৈধ হতে পারে

ফারুক মেহেদী ও রফিকুল ইসলাম   

৩ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



পুঁজিবাজারসহ কয়েক খাতে কালো টাকা বৈধ হতে পারে

করোনায় সরকারের অর্থায়ন সুবিধা, বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চাঙ্গা করাসহ বিভিন্ন কারণে বাজেটে কালো টাকা সাদা করার দাবি উঠেছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছে। এ অবস্থায় পুঁজিবাজারসহ কয়েকটি খাতে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। অন্য খাতগুলোতে শর্ত খুব সহজ না হলেও পুঁজিবাজারের জন্য শিথিল হতে পারে বিনিয়োগ নীতিমালা। অর্থ মন্ত্রণালয় ও পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম বলেন, ‘আন-ডিসক্লোজড মানি নিয়ে একটা আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে হয়তো ভালো কোনো খবর আসবে। এখন এই মানি বাজারে এলে পুঁজিবাজারের জন্য ভালো খবর হবে। আইনের কারণে পুঁজিবাজারে কালো টাকা আসছে না, তবে এবার হয়তো এ বিষয়ে ইতিবাচক কিছু হবে। আশা করি, বিনিয়োগকারী এ অর্থ পুঁজিবাজারে আনতে পারবে বা বিনিয়োগ করতে পারবে।’

জানা যায়, এনবিআর এবার কালো টাকা ও অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের ব্যাপারে ইতিবাচক রয়েছে। আসন্ন বাজেটে এ নিয়ে একটি ঘোষণা আসতে পারে। এমনিতেই চলতি অর্থবছরে কালো টাকা ও অপ্রদর্শিত অর্থ বিদ্যমান করের সঙ্গে ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে সাদা করার সুযোগ রয়েছে। আবাসন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে এ সুযোগ নেওয়া যায়। তবে জরিমানার বিধান রাখায় বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে তেমন কোনো সাড়া দেখা যায়নি।

এনবিআর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের সূত্রে জানা যায়, বলতে গেলে কোনো বিনিয়োগই হয়নি। মূলত শর্ত কঠিন হওয়ায় বিনিয়োগ হয়নি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। করোনার কারণে অর্থনীতি এখন বেশ নাজুক অবস্থায় রয়েছে। সরকারের হাতে টাকা দরকার। অথচ কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আয় হচ্ছে না। আবার সরকারকে বিনিয়োগও করতে হবে। অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে হবে। তাই সহজ শর্তে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। সরকারের ভেতরেও এ নিয়ে আলোচনা আছে। এ জন্যই সরকার বিষয়টি নিয়ে ভাবছে বলে জানা যায়। তবে আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার চুক্তিবদ্ধ হওয়ায় খুব সহজ শর্তে এ সুযোগ দিতে পারবে না। জরিমানা থাকবে। তবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হয়তো জরিমানা না-ও থাকতে পারে। আরো কিছু শর্ত হয়তো শিথিল হতে পারে। অন্য খাত বিশেষ করে আবাসন, হাইটেক পার্ক ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের শর্ত খুব একটা পরিবর্তন না-ও  হতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, এটি সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। আপাতত ইতিবাচক হলেও শেষ পর্যন্ত কী হয় তা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বিষয়। এ ধরনের বিষয়ের সিদ্ধান্ত শেষ মুহূর্তে গিয়েও পরিবর্তন হতে পারে। দেখা যাবে হয়তো শর্তগুলো আরো সহজ করা হয়েছে, হয়তো আরো কিছু খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ আগেও ছিল, এখনো আছে। তবে শর্ত কঠিন হওয়ায়, জরিমানা আরোপ করায় তেমন সাড়া নেই। এভাবে চালু করলেও তেমন সাড়া পড়বে না। এবারও সুযোগটি দেওয়া হতে পারে। তবে সব খাতে সমান শর্ত না-ও থাকতে পারে।

এ ব্যাপারে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন বাইরে থেকে টাকা পাওয়া কঠিন। ঠিকমতো রেমিট্যান্সও আসবে না। আমাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। এ জন্য কোথায় টাকা আছে, সব অর্থনীতিতে আনতে হবে। কালো টাকা সাদা করার কথা আমরা বহু বছর ধরে বলে আসছি। কিন্তু সাড়া নেই। কারণ সময়সীমা নির্ধারণ করে জানানো হচ্ছে না। যদি বলা হয় যে এ সময়ের মধ্যে তোমার যত কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ যা আছে ঘোষণা দাও। না হলে আমরা অভিযানে নামব। তখন যাদের পাব তাদের ধরব। এ ভয়টা দেন। আন্তরিকতার সাথে করতে হবে। তাহলেই টাকা অর্থনীতিতে ঢুকবে।’

এদিকে পুঁজিবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের বিষয়ে বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনায় বিপর্যস্ত হয়েছে দেশের অর্থনীতি, যার প্রভাবে তারল্য সংকটে পুঁজিবাজার। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ইচ্ছা থাকলেও পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় সক্রিয় হতে পারছে না। তাঁদের মতে, বিগত সময়ের চেয়ে শেয়ারের দাম এখন অনেক কম। আগামী বাজেটে পুঁজিবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ রাখলে পুঁজিবাজারে তারল্যের জোগান বাড়বে। এই ক্ষেত্রে বন্ড বা শেয়ারে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত লক-ইন রাখার শর্তে বিনিয়োগের সুযোগ দিলে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সম্প্রতি করোনা সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থা তুলে ধরে স্বল্প সুদে ঋণ সহায়তা, অগ্রিম আয়কর না দেওয়া ও পুঁজিবাজারে কালো টাকার বিনিয়োগ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্রোকারেজ হাউসগুলোর সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ)।

করোনার কারণে দীর্ঘ ৬৬ দিন বন্ধের পর গত রবিবার খুলেছে দেশের পুঁজিবাজার। লেনদেনের প্রথম দিন মূল্যসূচকে বড় উত্থান হলেও পর পর দুই দিন পুঁজিবাজারে পতন চলছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র কালের কণ্ঠকে জানিয়েছে, মানুষের আয়ের পথ থমকে যাওয়ায় জীবন চালাতে অনেকে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন তুলছে। করোনার ধাক্কার কারণে পুঁজিবাজারে বড় বিনিয়োগকারীরাও সক্রিয় হতে পারছে না। এই ক্ষেত্রে তারল্য সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে তারল্য সংকট কাটাতে পুঁজিবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলে আশার সঞ্চার করবে বলে মনে করছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক রকিবুর রহমান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন অর্থনীতির জন্য কালো টাকা খুবই প্রয়োজন। পুঁজিবাজারে কালো টাকার সুযোগ দিতে হবে। দীর্ঘদিন থেকে মন্দাবস্থা চলছে। কালো টাকার বিনিয়োগ বাড়লে গতিশীলতা আসবে। এই মুহূর্তে পুঁজিবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগ সুযোগ ভালো সিদ্ধান্ত হবে। কর না দেওয়ার কারণে দেশে অনেক কালো টাকা রয়েছে, আবার কেউ পাচারও করেছে। দেশের অর্থনীতিকে জাগাতে কালো টাকা আনতে হবে, যা অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে।’

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শরিফ আতাউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কালো টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে সাদা করার সুযোগ রাখার দাবি জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব দিয়েছি। এতে আমরা বলেছি, কালো টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে, যা তিন বছর লক-ইন থাকবে। তিন বছর বিনিয়োগ থাকার পর সেই শেয়ার কিংবা বন্ড বিক্রি করতে পারবে। কালো টাকার অর্ধেক বন্ড আর অর্ধেক পরিমাণ শেয়ার কিনবে। তিন বছর ওই বন্ড বা শেয়ার বিক্রি করতে পারবে না কিন্তু লভ্যাংশ পাবে, যেমনটা ব্যাংকে রাখলে পেতেন।’

তিনি বলেন, ‘বাজারে এই টাকা ঢুকলে ভালো শেয়ারের বিক্রি বাড়বে। আর ভালো শেয়ারে বিনিয়োগ তিন বছর লক-ইন থাকলে বাজার শক্তিশালী হবে। বাজারে টাকা এলে বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়বে। পুঁজিবাজারে একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

এদিকে আবাসন খাতের সংগঠন রিহ্যাবও চায় সহজ শর্তে আবাসন খাতে কালো টাকার বিনিয়োগ। সংগঠনের সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্যারালাল ইকোনমিতে যে অর্থ আছে আমরা চাইব সেটাকে মেইনস্ট্রিম ইকোনমিতে নিয়ে আসার জন্য। সরকার কিন্তু বারবার রিয়েল ইকোনমিতে অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু একটি বিশেষ সংস্থার তৎপরতার কারণে উদ্যোক্তা বা বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসছেন না। উন্নত দেশে এই অর্থের ব্যাপারে কেউ কোনো প্রশ্ন করে না। কোনো ক্রিমিনাল চার্জও তাদের বিরুদ্ধে করা হয় না। যদি সরকারের ভেতর থেকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে আগামী পাঁচ বছর যারা অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শন করবে, তাদের ব্যাপারে কোনো সংস্থা কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না।’

এনবিআরের আয়কর বিভাগ জানায়, ১৯৭৫ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে বেশির ভাগ সময়েই নানা শর্তের কারণে অবৈধ টাকার মালিকরা তাতে সাড়া দেননি। ১৯৭৫ সালে সেনা শাসন আমলে সাদা হয় দুই কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ৫০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ৪৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ১৫০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সাদা হয় ৯৫০ কোটি ৪১ লাখ টাকা। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বৈধ হয় ৮২৭ কোটি টাকা। ২০০৭ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সাদা হয় ৯ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বৈধ হয় এক হাজার ৮০৫ কোটি টাকা। আর ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বৈধ হয় ৮৫৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা