kalerkantho

শনিবার । ২০ আষাঢ় ১৪২৭। ৪ জুলাই ২০২০। ১২ জিলকদ  ১৪৪১

করোনাকালে নতুন উদ্বেগ বাসভাড়া

► নগর ও আন্ত জেলা বাসের ভাড়া ৮০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ
► রেল ও নৌপথে ভাড়া বাড়ছে না

পার্থ সারথি দাস   

৩১ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনাকালে নতুন উদ্বেগ বাসভাড়া

রাজধানীর মিরপুর-১২ থেকে ভাটারার নতুনবাজার পর্যন্ত দূরত্ব ১৬ দশমিক ১ কিলোমিটার। এ পথের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলাচলে যাত্রীপ্রতি নির্ধারিত ভাড়া ২৭ টাকা। করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আগামীকাল সোমবার নগরে আবার যখন বাস চলাচল শুরু হবে তখন ৮০ শতাংশ বেশি ভাড়া দিতে হবে যাত্রীদের। অর্থাৎ ২৭ টাকার ভাড়া হয়ে যাবে ৪৮ টাকা।

গতকাল শনিবার বিআরটিএ সদর দপ্তরের ব্যয় বিশ্লেষণ সংক্রান্ত কমিটি শুধু এই রুট নয়, দেশের চার শতাধিক রুটে বাস-মিনিবাসের ভাড়া এক লাফে ৮০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। এ সুপারিশ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।

কমিটি সুপারিশ করেছে, একজন যাত্রী দুটি আসনের টিকিট কিনবে। দুটি টিকিটের দাম যত আসবে তা থেকে ২০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হবে। বাড়তি ৮০ শতাংশ ভাড়া দিতে হবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বাসে চড়ার জন্য। অবশ্য গতকাল কমিটির এ সুপারিশ অনুমোদন পায়নি। পরিবহন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সুপারিশ দ্রুত অনুমোদনের জন্য চাপ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে মতামত চাওয়া হবে। এরপর সুপারিশের কতটুকু চূড়ান্ত হবে তা বলা যাবে। রবিবার দপ্তর খোলাকালে প্রজ্ঞাপন হতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে। 

বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, দেশের চার শতাধিক রুটে নতুন ভাড়ার তালিকা তৈরির প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারির পর নতুন ভাড়ায় আগামীকাল থেকে বাস চালানো শুরু হবে।

বিআরটিএ ও পরিবহন মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, করোনাভাইরাস সংক্রমণের মধ্যেও সামাজিক দূরত্ব মেনে বাস চালানোর শর্ত মানতে গিয়ে ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টি আসে। বাস মালিকরা বলছেন, সামাজিক দূরত্ব মেনে অর্ধেক যাত্রী পরিবহন করলে তাঁদের আয় অর্ধেক কমে যাবে। তাই বাধ্য হয়ে ভাড়া বাড়াতে হবে। না হলে রাস্তায় বাস নামিয়ে আবার বন্ধ করে দিতে হবে। তাঁরা ভাড়া বাড়ানোর জন্য শুরু থেকেই সরকারের ওপর চাপ তৈরি করে আসছিলেন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটি বাসে ৫০ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করলে ৮০ শতাংশ বেশি ভাড়া দিতে আপত্তি থাকবে কেন?’

বিভিন্ন দেশে সরকার বেসরকারি গণপরিবহনে ভর্তুকি দিচ্ছে, আপনারা ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন কি না জানতে চাইলে এনায়েত উল্লাহ বলেন, গত শুক্রবার এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অবশ্য পরে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, নতুন যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তা-ই চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে ট্রেনে ৫০ শতাংশ আসন ফাঁকা রাখছে। কিন্তু ভাড়া বাড়ায়নি। আজ রবিবার থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ে বিভিন্ন রুটে আট জোড়া ট্রেন পরিচালনা করবে। একইভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার শর্ত মেনে যাত্রীবাহী নৌযান চলাচলও শুরু হচ্ছে আজ থেকে। নৌযান মালিকরাও ভাড়া বাড়াচ্ছেন না।

এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞ, সাধারণ যাত্রী ও পর্যবেক্ষকমহল বলছে, সরকার বিভিন্ন দেশের মতো করোনাকালে বেসরকারি সড়ক পরিবহন খাতে ভর্তুকি দিতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দর কমেছে। এর সঙ্গে সংগতি রেখে তেলের দাম কমানো হলে গণপরিবহনের ভাড়া বাবদ যাত্রীদের কাছ থেকে এত বেশি অর্থ আদায়ের দরকার পড়ে না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক, পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, যুক্তরাজ্য ও ভারতসহ অনেক দেশে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে করোনাকালে।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পরিবহন মালিকদের একচেটিয়া সব চাপই মেনে নেওয়া হবে যদি ভাড়া বাড়ানোর এ সুপারিশ অনুমোদন হয়।

যুক্তরাজ্যের লন্ডন শহরে গণপরিবহন পরিচালনাকারী সংস্থা ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডনের উপদেষ্টা কৃষাণু চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনাকালে লন্ডনে বাসসেবা চালু রয়েছে। কিন্তু বাসে ভাড়া বাড়ানো হয়নি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাড়া মওকুফ করা হয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমানো হয়েছে। অথচ বাসচালকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার খরচ বেড়েছে। তিনি বলছেন, এখন আবার সেখানে নতুন করে বাসভাড়া নির্ধারণ করা হতে পারে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ বেড়ে গেলে সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপে পড়ে উপার্জনহীন মানুষ। পোশাক শ্রমিকরা এরই মধ্যে অবশ্য কাজে যোগ দিয়েছেন সীমিত আকারে।

গত মাসে ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ (জেপিজিএসপিএস), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের ছয়টি পৃথক গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছিল, একেবারেই আয় ছিল না ৫৮ শতাংশ মানুষের। তাদের এ গবেষণায় তৈরি পোশাক খাতের কর্মী ও তরুণদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

এমন পরিস্থিতিতে বাসের ভাড়া বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে কঠিন প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান। তিনি গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনাকালে বাসভাড়া এভাবে বাড়ানো হলে সেটা অমানবিক হবে। আমরা আশা করব, সরকার যাত্রীসাধারণের ঘাড়ে বাড়তি চাপ না পড়ে সেদিকে গুরুত্ব দেবে। সড়ক পরিবহন খাতের প্রভাবশালী নেতারা যা দাবি করেন সরকারকে তাই মেনে নিতে দেখে আসছি। এবার যেন তা না হয়।’

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দর কমেছে। তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে তেলের দাম কমালে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর দরকার হয় না। করোনাকালের বাস, মিনিবাস বা অন্য কোনো গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর যুক্তি থাকতে পারে না। এটা মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।’

বাসভাড়া এক লাফে ৮০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেকোনো সংকটে বা অজুহাতে দেশে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ালে তা স্বাভাবিক সময়েও কমানোর কোনো নজির নেই। সরকার এক লাফে ৮০ শতাংশ ভাড়া বাড়ালে প্রকৃতপক্ষে বাস মালিকরা নানা ছলচাতুরী করে ১২০ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়ে দেবে।’

 

 

 

মন্তব্য