kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

করোনায় রক্তনালি অচলে মৃত্যু ঠেকানোর পথ আছে দেশেই

তৌফিক মারুফ   

১৮ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনায় রক্তনালি অচলে মৃত্যু ঠেকানোর পথ আছে দেশেই

কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার উন্নত বিশ্বে ষাটোর্ধ্ব মানুষের মধ্যে বেশি হলেও বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। দেশে এ পর্যন্ত মৃতদের মধ্যে ৪২ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের ওপরে। বাকি ৫৮ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের নিচে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের সর্বশেষ চিত্র অনুসারে, ৬০ বছর বয়সের নিচে মৃতদের মধ্যে ৫১-৬০ বছরে ২৭ শতাংশ, ৪১ থেকে ৫০ বছরের ১৯ শতাংশ, ৩১ থেকে ৪০ বছরের ৭ শতাংশ এবং বাকিরা এর নিচের বিভিন্ন বয়সের। অবশ্য গতকাল রবিবার সরকারি বুলেটিনে যে ১৪ মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়েছে তাদের বয়স বিভাজনে দেখা গেছে, ১১-২০ বছরের মধ্যে একজন, ৩১-৪০ বছরের মধ্যে একজন, ৪১-৫০ বছরের মধ্যে দুজন, ৫১-৬০ বছরের মধ্যে তিনজন, ৬১-৭০ বছরের মধ্যে তিনজন, ৭১-৮০ বছরের মধ্যে তিনজন এবং ৮১-৯০ বছরের মধ্যে একজন। অর্থাৎ ৬০ বছরের ওপরে ও নিচে মৃত্যু সমান সমান।

দেশের ৬০ বছরের নিচে মৃত্যুহার বেশি কেন তা পর্যালোচনার ওপর জোর দিয়েছেন বিভিন্ন পর্যায়ের রোগতত্ত্ব ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। কেউ কেউ দেশের বাইরে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এখন পর্যন্ত দেশে এ বিষয়ে সুসংগঠিত বা আনুষ্ঠানিক কোনো গবেষণার তথ্য মেলেনি।

রোগতত্ত্ববিদ ও আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে ইউরোপ বা আমেরিকায় বয়স্ক মানুষ বেশি থাকায় সেখানে তাঁদের মৃত্যুহার বেশি। আমাদের দেশে ওই সব দেশের তুলনায় বয়স্ক মানুষ কম। ফলে মৃত্যুহার নিচের বয়সীদের মধ্যে বেশি প্রতীয়মান হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নিচের বয়সের কিংবা যাদের তুলনামূলক পুরনো জটিল রোগ কম ছিল তাদের কেন মৃত্যু হয়েছে, এ বিষয়ে এখনো আমরা পরিষ্কার কোনো স্টাডি করে উঠতে পারিনি। তবে প্রতিদিনই বিশ্বের কোথাও না কোথাও কিছু না কিছু নতুন উপসর্গ দেখা দিচ্ছে বলে আমরা জানতে পারছি। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিচ্ছে।’

ড. মুশতাক বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে শিশুর মৃত্যু পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। সেখানে তারা বলেছে, অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদের মধ্যে শুধু ফুসফুসের সংক্রমণ ছাড়াও শরীরের বিভিন্ন অংশে নানা ধরনের জটিল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় মৃত্যু বাড়ছে। করোনাভাইরাস শরীরের যেকোনো অংশেই আক্রমণ করছে বলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জাতীয় হৃদেরাগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন দেশের কিছু কিছু গবেষণার চিত্র থেকে আমরা নিশ্চিত যে করোনাভাইরাস কেবল ফুসফুস আক্রান্ত করছে না। ভাইরাসটি অনেকের শরীরের বিভিন্ন অংশের রক্তনালিতে আক্রমণ করছে। এতে জরুরি বা অপরিহার্য রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে রোগীর মৃত্যু ঘটছে। যেমন কোনো কোনো দেশের গবেষণায় দেখা গেছে, কারো মস্তিষ্কের রক্তনালি, কারো হৃদ্যন্ত্রের রক্তনালি, এমনকি কারো শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের রক্তনালি আক্রান্ত করে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ করে দিয়ে তাদেরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।’

ওই হৃদেরাগ বিশেষজ্ঞ এ ক্ষেত্রে অবশ্য যাঁরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত তাঁদের মধ্যে সমন্বিত বিশেষজ্ঞ টিম রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাসের মহামারি শুরুর আগে থেকেই অন্যান্য কারণেও মানুষের শরীরের বিভিন্ন রক্তনালিতে হঠাৎ রক্ত জমাট বেঁধে গিয়ে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আবার সময়মতো যদি রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে বিষয়টি ধরার মতো সুযোগ করে দেওয়া যায় তাহলে রক্তনালির জমাট বাঁধা রক্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে তরল করে রক্ত পরিসঞ্চালন স্বাভাবিক করে নিয়ে আসা যায়। এতে মানুষের জীবন বেঁচে যায়। এই চিকিৎসাটি এখন আমাদের দেশে সহজ। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা আমাদের দেশে হাসপাতালে আছে তাদের ওপর সমন্বিত গবেষণা চালানো। আমি নিজে এরই মধ্যে এ ইস্যুটি নিয়ে কয়েকটি দেশের হৃদেরাগ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছি। সেখান থেকেও কিছু অর্থপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। এখন এগুলো নিয়ে দেশে কিভাবে কাজ করা যায় সেদিকে এগোচ্ছি।’

এই বিশেষজ্ঞ দেশে যারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মারা যাচ্ছে তাদের অটোপসির তাগিদ দেন।

অন্যদিকে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাসপাতালে যাদের মৃত্যু হচ্ছে তাদের কিছু বিষয়ে আমরা স্টাডি করার চেষ্টা করছি। আর মৃত্যুর আগে তাদের যেসব ওষুধ দেওয়া হচ্ছে সেগুলো নিয়েও কিছুটা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা