kalerkantho

রবিবার। ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৭ জুন ২০২০। ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

তাঁর স্মৃতি সব সময় আমাদের পথ দেখাবে

ড. রফিকুল ইসলাম

১৫ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



তাঁর স্মৃতি সব সময় আমাদের পথ দেখাবে

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মৃত্যুতে আমি আমার এক ভাইকে হারালাম। জাতি হারাল তার একজন শ্রেষ্ঠ সন্তানকে।

আমরা দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলাম। অধ্যাপক ছিলাম। আমরা একই আবাসিক এলাকায় বসবাস করেছি। দীর্ঘ সময় ধরে ঘনিষ্ঠভাবে তাঁকে দেখেছি।

আমাদের দেশে আমরা যাঁদের বুদ্ধিজীবী বলি তাঁদের মধ্যে আনিসুজ্জামান ছিলেন সবচেয়ে তীক্ষ বুদ্ধি, মেধাসম্পন্ন, প্রগতিশীল এবং মুক্তচিন্তার অধিকারী; যদিও তাঁর পিএইচডি থিসিস ছিল মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য বিষয়ে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি যাঁদের নিয়ে কাজ করেছেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কিংবা রবীন্দ্রনাথ কিংবা অন্যান্য যা কিছু নিয়ে কাজ করেছেন তার মধ্য দিয়ে তাঁর মৌলিক বুদ্ধিবৃত্তি, মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং পাণ্ডিত্য ফুটে উঠেছে।

এ ছাড়া তিনি এ দেশের বুদ্ধিভিত্তিক ও মননশীল আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকীতে কিংবা রবীন্দ্রসংগীত যখন নিষিদ্ধ হলো তার প্রতিবাদে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি মুজিবনগর সরকারের একজন অন্যতম উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পরে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নকালে বাংলা অনুবাদ তিনি করেছেন। পরবর্তীকালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগকে যেমন সমৃদ্ধ করেছেন, তেমনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগকেও সমৃদ্ধ করেছেন। দীর্ঘকাল তিনি বাংলা একাডেমির সভাপতির পদ অলংকৃত করে ছিলেন। বাংলা একাডেমির অভিধান প্রণয়ন ও বাংলা বানান রীতির সংস্কারে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন।

তিনি সরাসরি রাজনীতি করতেন না। কিন্তু প্রগতিশীল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষের অসাম্প্রদায়িক শক্তির সুদৃঢ় ভিত্তির জন্য কাজ করেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির গণ-আদালত এবং সাম্প্রতিককালের মানবতাবিরোধী অপরাধ আদালতে তিনি সাক্ষ্য দিয়ে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। এ জন্য তাঁকে অনেক হুমকি সহ্য করতে হয়েছে। সশস্ত্র প্রহরায় তাঁকে জীবন যাপন করতে হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এটা করেছেন। এ দেশের আর কোনো বুদ্ধিজীবী এটা করেছেন কি না তা আমরা জানি না।

তাঁর মৃত্যুতে যে শূন্যতা তৈরি হলো তা কোনো দিন পূরণ হবে না। তাঁর মতো একজন আধুনিক, প্রগতিশীল, মননশীল বুদ্ধিজীবী দ্বিতীয়জন নেই। তাঁর অভাব কোনো দিন পূরণ হবে না। আমাদের দুর্ভাগ্য যে সারা বিশ্ব যখন করোনাভাইরাসের মহামারির সঙ্গে লড়ছে, এই দুঃসময়ে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি। তাঁর স্মৃতি সব সময় আমাদের পথ দেখাবে।

লেখক : ভাষাসংগ্রামী ও জাতীয় অধ্যাপক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা