kalerkantho

রবিবার । ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৩১  মে ২০২০। ৭ শাওয়াল ১৪৪১

অপরাধ ও মাদকের আখড়া বাড্ডা থানা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৯ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অপরাধ ও মাদকের আখড়া বাড্ডা থানা

অপরাধ-অপকর্মের আখড়ায় পরিণত হয়েছে রাজধানীর বাড্ডা থানা এলাকা। সেখানে খুনখারাবি, ডাকাতি-ছিনতাই, মদ-জুয়াসহ অন্যান্য অপরাধ চলছে বাধাহীনভাবে। থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে পারভেজ ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মধ্যেই বাড্ডা হয়ে উঠেছে ভয়ংকর জনপদ। পুলিশের মাসোহারাই সেখানে শেষ কথা। ওসি-এসির বখড়ার চাহিদা পূরণ করে রীতিমতো ইজারা স্টাইলে যেকোনো অপরাধ ঘটানো হচ্ছে। মাদক বাণিজ্য, জুয়া, দেহব্যবসা, চাঁদাবাজি, ফুটপাত বাজার, জায়গা-জমি জবরদখল থেকে শুরু করে প্রতিটি অপরাধ স্পট থেকেই ওসি মো. পারভেজ ইসলাম ও এসি এলিন চৌধুরীর নামে বখড়াবাজির গুরুতর অভিযোগ আছে।

বাড্ডায় পেশাদার অপরাধীদের দৌরাত্ম্য থামানোর পরিবর্তে তাদের অপরাধে জোগান দেওয়াই পুলিশের প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে খুনোখুনির মাত্রা। মাত্র পাঁচ বছরেই রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছে অন্তত ৩২ জন। এর মধ্যে গত তিন মাসেই সংঘটিত হয়েছে আটটি হত্যাকাণ্ড। একাধিক সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্রের হাতেই ঘটেছে বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ড। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, কেবল টিভির ব্যবসা, অটোরিকশার স্ট্যান্ড দখল, পশুর হাট ও ফুটপাতের চাঁদাবাজি ভাগ-বাটোয়ারাকে কেন্দ্র করেই এসব খুনোখুনি ঘটে। তবে জায়গা-জমি জবরদখলকে কেন্দ্র করেই ঘটে সর্বোচ্চসংখ্যক খুনোখুনি, হামলা-মামলা, লুটপাটের ঘটনা। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারেই পুলিশ নানা কৌশলে ‘রাজনৈতিক কোন্দল’-সংশ্লিষ্টতা জুড়ে দেয় এবং তদন্ত কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি করে। ফলে বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য আর আলোর মুখ দেখে না। খুনিদের কাউকে গ্রেপ্তারের দক্ষতাও দেখাতে পারে না থানা পুলিশ। বাড্ডা থানায় বিভিন্ন হত্যা মামলার ১৬ জন আসামিকে র‌্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও বিপরীতে থানা পুলিশ মাত্র দুজন এজাহারভুক্ত আসামির নাগাল পায়।

মূলত অপরাধীচক্রের সঙ্গে থানা পুলিশের দহরমমহরম সম্পর্ক থাকার কারণেই চিহ্নিত খুনি, তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী, ডাকাত-ছিনতাইকারী, চাঁদাবাজসহ দাগি আসামিরা গ্রেপ্তার এড়িয়ে বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায়। আদালতের জারি করা ওয়ারেন্ট তামিলের ক্ষেত্রেও থানা পুলিশের চরম অনীহা রয়েছে। শুধু বাড্ডা থানায়ই বিভিন্ন আদালতের পাঠানো ১২ শতাধিক ওয়ারেন্ট (গ্রেপ্তারি পরোয়ানা) মাসের পর মাস ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে। ওয়ারেন্ট তামিলের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট আসামিদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায় করারও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

খুনখারাবির জন্য ভাড়াটে খুনিচক্রও গড়ে উঠেছে বাড্ডায়। আছে বেতনভুক্ত ক্যাডার গ্রুপ। একাধিক হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত খুনিদের বরাত দিয়ে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র জানায়, চিহ্নিত অস্ত্রবাজ সন্ত্রাসীরা রীতিমতো মাসিক বেতন পায়। ‘দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা’ অনুযায়ী সর্বনিম্ন ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত তাদের বেতন নির্ধারণ রয়েছে। গডফাদার শ্রেণির অপরাধীরা বেতনভুক্ত এ ক্যাডারদের পুষে থাকে। তাদের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, অপহরণ করে আটকে রাখা, জায়গা-জমি জবরদখল, বাড়িঘর-দোকানপাট থেকে উচ্ছেদ করাসহ নানা রকম সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটিয়ে থাকে তারা। ফলে বাড্ডার অপরাধ বেড়ে চলছে লাগামহীনভাবে। বাড়ছে জোর-জুলুম আর পুলিশি ‘অত্যাচার’ বাণিজ্য।

এদিকে অপরাধের একেকটি ক্ষেত্র একেক দারোগাকে নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব দিয়ে শুধু মোটা অঙ্কের মাসোহারা ধার্য করে দেওয়া হয়েছে। থানা ইজারা নেওয়ার স্টাইলেই একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠাসহ ধরা-ছাড়া বাণিজ্য ফেঁদে বসেছেন এসআই মাহমুদ, এসআই নাদিম, এসআই ইব্রাহীম, এসআই রাজীবসহ কয়েকজন চিহ্নিত পুলিশ কর্মকর্তা। বাড্ডা থানার কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তা এরই মধ্যে এলাকায় বোবা চাঁদাবাজ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন। একই থানায় দীর্ঘদিন অবস্থান করার সুবাদে সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে অপরাধীদের গলায় গলায় পিরিত জমে উঠেছে। দাগি অপরাধীদের সঙ্গে কয়েক পুলিশ কর্মকর্তা রীতিমতো আত্মীয়তার বন্ধনও গড়ে তুলেছেন। বাড্ডার অপরাধ দমনের পরিবর্তে অপরাধ লালন করাটাই যেন তাদের মুখ্য দায়িত্ব হয়ে উঠেছে।

দীর্ঘদিন অবস্থানকারীদের মধ্যে অন্যতম এসআই ইব্রাহীম ও এসআই জুলহাস জুটির নিপীড়ন-নির্যাতনে অতিষ্ঠ ছিল বাড্ডাবাসী। অসংখ্য অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জুলহাসকে পুলিশ সদর দপ্তরে নেওয়ার পর এসআই ইব্রাহীমের সঙ্গে জুটি বেঁধেছেন এসআই মাহমুদ। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা পরিচয়দানকারী এসআই নাদিম রীতিমতো ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন। বাড্ডার চিহ্নিত অপরাধী সোর্স গ্রিল জামাল ও বহু মামলার দুর্ধর্ষ আসামি সুমনকে নিয়ে এসআই রাজিব আলাদা অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। এসআই রাজিবের দোহাই দিয়ে ওই দুই অপরাধী যখন-তখন যে কারো ওপর হামলে পড়ছেন।

সোর্সনির্ভর চাঁদা বাণিজ্যে এএসআই সজল, এএসআই মুরাদ, এএসআই মনির ও এএসআই কালাম রাত-দিন তৎপর থাকেন বলেও অভিযোগ আছে। এঁরা রাতের বাড্ডায় ভয়ংকর চেহারায় আবির্ভূত হন। সোর্স পরিচয়ে চিহ্নিত অপরাধীদের সঙ্গে নিয়ে রাতভর দাপিয়ে বেড়ান তাঁরা। কি ভালো মানুষ কি খারাপ মানুষ—তাদের সামনে পড়লে কারো যেন রক্ষা নেই। সামারি বাণিজ্যের ধকল পোহাতেই হবে ভুক্তভোগীদের, দিতে হবে চাহিদা মাফিক টাকা। অপরাধী সোর্সদের মধ্যে অন্যতম ইদ্রিস, মুরাদ, সুমন, গ্রিল জামাল, বিপ্লব, সাধন, পিচ্চি মোশারফ, পিচ্চি সহিদসহ ১০-১২ জন। নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত এ সোর্সদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে পাঁচ-সাতটি করে মামলাও আছে। এসব অপরাধীকে পুলিশের গাড়িতে দেখে সাধারণ মানুষ তটস্থ হয়ে পড়ে।

থানা পুলিশের তত্ত্বাবধানেই চলে সোর্স ইদ্রিসের পাইকারি ইয়াবা বাণিজ্য। ইয়াবার খুচরা বাণিজ্যের তল্লাট চালায় সোর্স গ্রিল জামালের স্ত্রী সুমি। সোর্স সুমন ও পিচ্চি মোশারফের ইয়াবা বাণিজ্য দেখভাল করেন এসআই রাজিব। সোর্স রফিক, বিপ্লব, পিচ্চি সহিদ, রকি ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে রমরমা ফিটিং বাণিজ্যও চালিয়ে থাকে নিয়মিত। বাড্ডার বিভিন্ন পয়েন্টে রাত-দিন জুয়া বাণিজ্য পরিচালনার মাধ্যমে জুয়াড়ি জাহাঙ্গীর এরই মধ্যে কোটিপতিতে পরিণত হয়েছে। সাধারণ গ্যারেজ মালিক জাহাঙ্গীর সরাসরি ওসির সঙ্গে যোগসূত্রের মাধ্যমে ১৫টি জুয়ার স্পট চালিয়ে থাকে বলে সূত্রে জানা যায়। তার জুয়ার আসরে হানা দেওয়ার সাহস কোনো দারোগা রাখেন না বলেও গর্ব করে বলে বেড়ান তিনি।

বাড্ডার মাদক ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণের নামে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের কাজটি করেন খোদ ওসির বডিগার্ড সিরাজুল ইসলাম সিরাজী। তাঁর লম্বা হাতের বখড়াবাজি থেকে শপিং মল, ফুটপাতের দোকানি, এমনকি ভ্রাম্যমাণ সিগারেট-বাদাম বিক্রেতারাও রেহাই পান না। এদিকে থানায় আটককৃত গাড়ির যন্ত্রপাতি ও অটোরিকশার ব্যাটারির একচেটিয়া বাণিজ্য ফেঁদে বসেছেন ওসির ড্রাইভার আকতার হোসেন। থানা এলাকায় মদের স্পট ১০-১২টি, প্যাথিডিনের স্পট ১৪-১৫টি, গাঁজার স্পট ১২-১৩টি, ডিআইটি প্রজেক্ট, আফতাবনগর, দক্ষিণ বাড্ডা, কুমিল্লাপাড়া মিলিয়ে ফেনসির স্পট আছে ১৪-১৫টি। কিন্তু একই এলাকায় ইয়াবার স্পটসংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। মুন্সীগঞ্জের রিয়াদ উল্লাহর নিয়ন্ত্রণে চলে বাড্ডা এলাকার ১০-১২টি মাদক স্পট। বাড্ডায় বরিশাইল্যা রফিক, ক্যাশিয়ার দুলালের ভাই ফর্মা বেল্লাল, সাঁতারকুলের বাবা শাহীন, রব, বাপ্পি, সুমন, মোটা বিপ্লব, ডিলা ও তাদের সহযোগীরা সব ধরনের অপরাধ-অপকর্ম করে বেড়ালেও কারো টুঁ শব্দ করার জো নেই। এসব মাদক আখড়া উচ্ছেদ করা দূরের কথা, বরং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ওসির সখ্য থাকায় দারোগারাও মাদক বাণিজ্যে তাল মিলিয়ে থাকেন।

এসআই নাদিমের গোপন চাঁদাবাজি চলে ক্যারম, জুয়ার আড্ডায়। বাড্ডা থানা এলাকায় ক্যারম বোর্ডের মাধ্যমে জুয়ার রমরমা আসর চলে ৮০-৯০টি। প্রতি ক্যারম বোর্ডের মালিক থেকে সপ্তাহে ৩০০-৫০০ টাকা বখড়া নেওয়া হয় থানা পুলিশের নামে। কেউ কখনো মাসোহারা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তত্ক্ষণাৎ ক্যারম বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট মালিককে আটক করে থানায় নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। বাড্ডার পোস্ট অফিস গলি ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকায় রয়েছে উঠতি সন্ত্রাসীদের দাপট। মাদক ব্যবসায়ী রমজান আলী, আসিফ, শহীদুল, রশিদ, মিলন, রফিক, সবুর, আলাউদ্দিন, কামরুলসহ অনেকে প্রকাশ্যেই অপরাধ করে যাচ্ছে। জায়গা দখল করে বসাচ্ছে জুয়ার আসর। সরু গলির ধারে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। ডাম্পিং জোনের কাছেই চারটি টিনের ঘর। পাশেই কয়েকটি রিকশা গ্যারেজ। আগাছায় ভরা স্থানটিতে টিনের ঘরে নিয়মিত মাদক ও জুয়ার আসর বসে বলে অভিযোগ করে অনেকে। রাত হলেই সেখানে ক্যারম বোর্ড সাজিয়ে অবস্থান নেয় সন্ত্রাসীরা। পূর্ব বাড্ডায়ই এ রকম অন্তত ২০টি জুয়ার আসর বসছে বলে জানায় স্থানীয়রা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা