kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

বিশেষ লেখা

নতুন জীবনের স্বপ্নবীজ তবে উপ্ত হোক

নাসির উদ্দীন ইউসুফ

৫ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নতুন জীবনের স্বপ্নবীজ তবে উপ্ত হোক

কেমন কাটছে গৃহাভ্যন্তরের অন্তরীণ জীবন। না না অন্তরীণ ভাববেন না। ভাবুন ভিন্ন এক বাস্তবতায় ভিন্ন জীবনযাপন। অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম এক ধরাবাঁধা জীবনযাপনে। হঠাৎ করোনার আক্রমণে পাল্টে গেল সব কিছু। আর পাল্টে যাওয়াটা কি খুব খারাপ হলো। হয়তো ভবিষ্যৎ অনির্দিষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা পরে ভাবি। সারা পৃথিবী যখন ভাববে আমরা তখন ভাবব। এখন না হয় বর্তমান নিয়ে ভাবি।

আচ্ছা যে ইঁদুর দৌড়ের জীবন আমরা যাপন করেছি, সেখানে কি নিত্যনতুন আনন্দ প্রাপ্তির অবকাশ ছিল। সেই ১০টা-৫টা অফিস। বাদুড়ঝোলা হয়ে বাসে গৃহে প্রত্যাবর্তন। স্কুলের ভারি পাঠে নিমগ্ন সন্তানের কক্ষে উঁকি। টেলিভিশনে ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে দেখতে অযথা উত্তেজিত হওয়া। টেলিফোনে পরিচিতজনের সঙ্গে আওয়ামী লীগ-বিএনপি নিয়ে তুমুল ঝগড়া। বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে এক পশলা ঝড়ঝাপটা। মুখ ভার করে খাওয়ার টেবিলে নিঃশব্দে ডিনার সারা। এই তো। অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম এই গতবাঁধা জীবনে। করোনা এসে সে জীবন স্তব্ধ করে দিল। তো দিক না। কয়েক দিন দূরে থাকুন এসব থেকে। পেশাগত কারণে অসভ্য ব্যস্ততার কারণে সন্তানকে কোলে নিয়ে কত দিন দীর্ঘ সময় ধরে ছোটবেলার গল্প শোনাননি। কত দিন স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে মুখোমুখি নিঃশব্দে বসে থাকেননি। কত দিন জানালা দিয়ে বা ছাদে উঠে আকাশ দেখেননি। আকাশে মেঘ দেখেননি। সকাল বা সন্ধ্যায় পাখিদের ওড়াওড়ি দেখেননি। কত দিন লাউড স্পিকারে স্বামী-স্ত্রী সন্তানসহ একসঙ্গে টেলিফোনে বোন, ভাই অথবা বন্ধুর সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠেননি। কত দিন একসঙ্গে পুরো পরিবার মুড়ি ভাজা খেতে খেতে সাপলুডু খেলেননি। চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েননি। কত দিন একসঙ্গে পুরো পরিবার জীবননান্দ দাশের কবিতা পাঠ করে সবাইকে শোনায়নি। কত দিন একসঙ্গে লালনের গান শোনা হয়নি। কত দিন দেয়ালে ঝোলানো প্রয়াত পিতা-মাতার ছবি নিজ হাতে মোছেননি।

করুন না কত কত দিন করতে না পারা জীবনের জরুরি আনন্দের কাজগুলো। পরিবারের প্রিয় মানুষগুলোকে নিয়ে আকাশ দেখুন। পাখি দেখুন। গান শুনুন। কবিতা পড়ুন। আরব্য রজনী বা ঠাকুর মার ঝুলি নিয়ে গল্পে মেতে উঠুন। যদি পারেন মুক্তিযুদ্ধের কথা গৌরবের সঙ্গে ভাগাভাগি করুন।

মানুষ তো সৃষ্টিশীল প্রাণী। আরো কত আনন্দের উপসর্গ সৃষ্টি করে করোনাশাসিত অন্তরীণ জীবনকে সীমাহীন আনন্দে ভরিয়ে দেবে।

আরো আছে। সারা দিনের অফুরন্ত সময় থেকে কিছুটা সময় বের করে একা হোন। ভাবুন। ভাবুন যে জীবন ফেলে এসেছেন সে জীবনের অনাবিল আনন্দের স্মৃতিগুলো। সেই কৈশোরে এক্কাদোক্কা খেলতে গিয়ে আছাড় খেয়ে হাঁটু ছিলে গেলে গেঁদাপাতা চিবিয়ে ক্ষতস্থান চেপে ধরে ক্ষত সারার ছেলেমানুষি চেষ্টা। বোকাট্টা রঙিন ঘুড়ির পেছনে দিগ্বিদিক ছোটা ঊর্ধ্বমুখী বালকের সজনে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে কপালের চামড়া কেটে রক্তাক্ত হওয়ার মধুর স্মৃতি। ফুটবল খেলে জলেকাদায় একাকার হয়ে উত্তীর্ণ সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে মায়ের পিছে মুখ লুকিয়ে বাবার অগ্নিদৃষ্টি থেকে রেহাই পাওয়ার সুখস্মৃতি। আহা। আচ্ছা নিজ ঘরবাড়ি, নিজ আঙিনা পরিষ্কার রাখার জন্য এ জীবনে কতটুকু সময় আমরা ব্যয় করেছি। কতটুকু সময় দিয়েছি দুটি বৃক্ষ রোপণ করে পৃথিবীর জলবায়ুকে শোধন করতে। শুধু তো ভোগ করেছি। সব কিছু হরণ করেছি। বৃক্ষ, তৃণলতা, নদী, জল। সব কিছু। একবার ভাবি এই বিষাক্ত পৃথিবী তৈরি তো করেছি আমরা। এই বন্দি জীবনে অন্তত দুটি বৃক্ষ রোপণ করি। পাখি ও প্রাণীদের মায়া করার প্রতিজ্ঞা করি। এই ক্ষুদ্র সুন্দর পৃথিবীতে সবার অধিকার আছে এ কথা স্বীকার করি নিজের কাছে নিজে।

আবার এও ভাবুন। এ জীবনে কত মানুষের সঙ্গে কত সময় কাটিয়েছেন। ভালোমন্দ। কত সুখ চেখে নিয়েছেন দুই ঠোটে। কত কষ্ট নীরবে বুকে পুরেছেন।

আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি কষ্ট হয়তো দিয়েছেন কাউকে কাউকে। মানবজীবনে এ অবধারিত। কিন্তু এই তো সুযোগ মনে মনে মাফ চেয়ে নিন সেই মানুষগুলোর কাছ থেকে। ওরা জানবে না। কিন্তু আপনি জানবেন। আপনার বুকের ভেতর পুষেরাখা গ্লানি থেকে আপনি মুক্ত হবেন। সম্পূর্ণ এক নতুন মানুষ হয়ে উঠবেন আপনি।

করোনা-পরবর্তী পরিবর্তিত পৃথিবীর সঙ্গে সমানতালে পা ফেলে চলবার জন্য আপনার মন আপনার তৈরি হয়ে যাবে। আপনি নতুন এক পৃথিবীর সফল মানুষ হবেন। মানুষ পুনরায় সৃষ্টিশীলতাকে প্রাধান্য দেবে। পৃথিবী আবার ফলে ফুলে হেসে উঠবে। পৃথিবী আবার মানুষ ও সব প্রাণের জীবনবান্ধব একগ্রহে রূপান্তরিত হবে।

পৃথিবী আবার নিরাপদ হবে আমাদের সবার জন্য।

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযোদ্ধা

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা