kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

‘সব কিছু বন্ধের’ ১০ দিন

সাত দিনই বিশৃঙ্খল

কেন্দ্রীয়ভাবে ত্রাণ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা এবং কঠোর হওয়ার পরামর্শ প্রশাসন ও সেনাবাহিনীকে

শরীফুল আলম সুমন   

৫ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাত দিনই বিশৃঙ্খল

নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে প্রথম দফায় গত ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি দিয়ে দেশের প্রায় সব কিছু বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। এর আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে ঘরে রাখা, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা। প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণেও করোনা মোকাবেলায় মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানান।

গতকাল শনিবার শেষ হয় প্রথম দফার ১০ দিনের এই সাধারণ ছুটি। যদিও ছুটির সময়সীমা আরো সাত দিন অর্থাৎ আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে; কিন্তু ছুটিতে ঘরে থাকার নির্দেশনা যথাযথভাবে মানা হয়েছে প্রথম তিন দিন। আর বাকি সাত দিনই ছিল অনেকটা বিশৃঙ্খল অবস্থা। সব কিছু বন্ধের চতুর্থ দিন থেকেই কাজের সন্ধানে বেরিয়েছে নিম্নবিত্তরা। আর অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে বেরিয়েছে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা।

বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দেশের মানুষকে আগে কখনো পড়তে হয়নি। তাই অনেকে বুঝে, আবার কেউ না বুঝেও সরকারি নির্দেশনা ভেঙেছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল করেনি। আর নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবীরা যারা দিন আনে দিন খায়, তারা অনেকটা বাধ্য হয়েই ঘর থেকে বেরিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৬ মার্চ সব কিছু বন্ধের প্রথম দিন করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৯ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছিল পাঁচজনের এবং সুস্থ হয়েছে সাতজন। আর প্রথম দফায় ছুটির শেষের দিন গতকাল এই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭০ জনে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে আটজনের ও সুস্থ হয়েছে ৩০ জন।

জানা যায়, গত ২৬ মার্চ থেকে সব কিছু বন্ধ ঘোষণা করলেও এর কয়েক দিন আগে থেকেই প্রচার শুরু হয়। ঢাকা ছাড়ে প্রায় কোটি মানুষ। ফলে এমনিতেই রাজধানীর ওপর চাপ কমে যায়। এ ছাড়া সারা দেশে মাঠে নামানো হয় সেনাবাহিনীকে। ২৬ মার্চ ছিল বৃহস্পতিবার এবং আগে থেকেই সরকারি ছুটির দিন। এরপর ২৭ ও ২৮ মার্চ সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার। ফলে এই তিন দিন অনেকটাই কঠোরভাবে নির্দেশনা মানা হয়। এরপর গত ২৯ মার্চ থেকে নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবীরা কাজের সন্ধানে বাইরে বের হতে থাকে। একই সঙ্গে আরো অনেক মানুষ নানা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হয়। গত ৩০ ও ৩১ মার্চ নির্দেশনা মানার ক্ষেত্রে অনেকটা ঢিলেঢালা ভাব দেখা যায়। অনেক মানুষকে ঘরের বাইরে দেখা গেছে। ছোটখাটো দোকান খোলা পাওয়া গেছে। গ্রামের হাট-বাজারগুলোতে ছিল মানুষের ভিড়। আর শহরের অলিগলিতেও লোক দেখা যায়। এ কারণে ১ এপ্রিল থেকে প্রশাসন কঠোর হয়। সেনাবাহিনীর টহল বাড়ানো হয়। গ্রামের বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে তল্লাশিচৌকি বসানো হয়। যা গত ৩ এপ্রিল অর্থাৎ নবম দিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। কিন্তু এত কিছুর পরও শ্রমজীবী মানুষকে ঘরের বাইরে বের হওয়া ঠেকানো যায়নি। সাধারণ মানুষও নানা ছুতায় ঘর থেকে বেরিয়েছে।

গতকাল দশম দিনেও রাস্তায় গাড়ির আধিক্য ছিল। তবে আজ রবিবার থেকে সরকারি-বেসরকারি অফিস, গণপরিবহন, বিপণিবিতান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও গার্মেন্ট বন্ধ করা হয়নি। ফলে গার্মেন্টে চাকরি করা লাখ লাখ মানুষ, যারা গ্রামে গিয়েছিল, তারা দলে দলে হেঁটে বা পণ্যবাহী যানবাহনে চড়ে ঢাকায় ঢোকে। এতে আগামী ছুটির দিনগুলোতে সরকারি নির্দেশনা কতটুকু মানা হবে, তা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত ১০ দিনে সরকারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট প্রচার চালানো হয়েছে। প্রায় সবাই বিষয়টি সম্বন্ধে জেনেছে। এর পরও যারা নির্দেশনা মানছে না তাদের জন্য কঠোর হতে হবে প্রশাসন ও সেনাবাহিনীকে। কেন্দ্রীয়ভাবে ত্রাণ বিতরণে জোর দিতে হবে। যারা প্রকৃতভাবে ত্রাণ পাওয়ার উপযোগী তাদের ঘরে ঘরে তা পৌঁছে দিতে হবে। যাতে কারো বাইরে বের হওয়ার প্রয়োজন না হয়। এ ছাড়া তদারকিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথম ১০ দিনে আমরা যেটা চেয়েছিলাম, সেটা পাইনি। এর প্রধান কারণ আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা। তবে মানুষের সচেতনতার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে, কিন্তু আরো হওয়া উচিত ছিল। আর রাস্তায় যারা গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে, তারা তো শিক্ষিত, তাদের আরো বেশি সচেতন হতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাবেক শিক্ষক বেশ কয়েকটি পরামর্শও দেন। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসক, নার্সসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য পিপিই (ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম) নিশ্চিত করতে হবে। কভিড-১৯-এর পরীক্ষার ব্যবস্থা আরো বিস্তৃত করতে হবে, অধিক মানুষকে পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। যেখানে খাদ্যের অভাব রয়েছে, সেনাবাহিনীর সহায়তায় তা নিশ্চিত করতে হবে। বিত্তশালীদের এ ক্ষেত্রে আরো এগিয়ে আসতে হবে। ৫০০ নয়, ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি থাকতে পারে, যারা বিষয়টি নিয়ে ২৪ ঘণ্টাই কাজ করবে। মানুষকে আরো বেশি সচেতন করতে হবে। যারা করোনাভাইরাসের সংক্রমণে মৃত্যুবরণ করবে তাদের দাফনটা যথাযথ হতে হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা