kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

করোনা ফ্লু ডেঙ্গু, জটিল হতে পারে পরিস্থিতি

তৌফিক মারুফ   

৪ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনা ফ্লু ডেঙ্গু, জটিল হতে পারে পরিস্থিতি

করোনাভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ এখন ঘরে ঘরে জনে জনে; বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশেও একই পরিস্থিতি। অন্য কিছু দেশের তুলনায় বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইনফ্লুয়েঞ্জা। বৃষ্টি হওয়ায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি আরো বেড়ে গেছে।

দেশের মানুষ গত বছরের ডেঙ্গুর ভয় এখনো কাটাতে পারেনি। মাত্র ছয় মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা যেমন লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল, তেমনি মারা গেছে প্রায় ৩০০ জন। সেই সঙ্গে গত বছর ইনফ্লুয়েঞ্জাজনিত নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় দেশে আক্রান্ত হয় এক লাখ ১১ হাজারের বেশি মানুষ। মৃত্যু হয় ২২ জনের। এ কারণে করোনার সঙ্গে এ দুটি রোগের প্রাদুর্ভাব যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকার করোনাভাইরাস মোকাবেলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিলেও এ পরিস্থিতিতে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু ও ডেঙ্গু প্রতিরোধের কাজও চালিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের সময় মশা নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেন। সেই সঙ্গে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ে ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রেখে চলতি মাসের মাঝামাঝি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ঢাকার দুই মহানগরে একটি জরিপ চালিয়েছে। মাত্র এক দিন আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর উদ্যোগে সমন্বিত একটি বৈঠক করে জোরালো গতিতে কার্যক্রম শুরুর জন্য ১২ দফা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সচিব পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এবার আমাদের দেশে বিশেষভাবে তিনটি ঝুঁকির দিকে একই তালে নজর রাখতে হবে। এখন দেশে সিজনাল ইনফ্লুয়েঞ্জার মূল সময় শুরু হয়ে গেছে। আবার ডেঙ্গু গত বছরের চেয়ে নাকি এবার তুলনামূলক বেশি রয়েছে এরই মধ্যে। আবার বৃষ্টি হওয়ায় এই ঝুঁকি বেড়ে গেল। করোনার মধ্যে ডেঙ্গু আর সিজনাল ফ্লু জটিলতার মাত্রা বাড়িয়ে তুলবে।’ তিনি বলছেন, যেহেতু মৌসুমি ফ্লুতে শ্বাসকষ্ট থাকে আবার করোনায়ও শ্বাসকষ্ট থাকে তাই অনেকেই শ্বাসকষ্ট হলেও বেশি শঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। এ ক্ষেত্রে এবার নজর বেশি রাখতে হবে। সবাইকেই সতর্ক থাকতে হবে।

রোগতত্ত্ববিদ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষ যেমন করোনা, ডেঙ্গু ও ইনফ্লুয়েঞ্জার উপসর্গ আলাদা করতে এবার হিমশিম খেতে পারেন, আবার চিকিৎসাকর্মীরাও এক ধরনের জটিলতায় পড়ে যাবেন বা এরই মধ্যে পড়ে গেছেন।’ তিনি বলেন, অনেক চিকিৎসাকর্মীই হয়তো জ্বর দেখলেই করোনার ভয়ে রোগীকে সেবা দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে এখন করণীয় হচ্ছে—সরকারের পক্ষ থেকে এই তিনটি বিষয়ে ভালো করে পার্থক্য বোঝা যায় এমন কিছু প্রচার করা। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনে আরো বেশি করে বুঝিয়ে দেওয়া উচিত যাতে করে তাঁরা দ্রুত কে কোন উপসর্গে আক্রান্ত সেটা প্রাথমিক পর্যায়ে ধরতে পারেন এবং সে অনুসারে যার জন্য যে ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন সেটা দিতে পারেন। নয়তো জ্বর শুনলেই এখন যে আতঙ্ক আছে সেটা কাটবে না। এ ক্ষেত্রে রোগীর হয়রানি ও বিপদের ঝুঁকি আরো বেড়ে যাবে।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুসারে, গত সাত বছরের মধ্যে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা এরই মধ্যে সর্বোচ্চ বা যেকোনো বছরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। যা খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকেই উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। গত বৃহস্পতিবার হঠাৎ বৃষ্টি হওয়ায় ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী এডিস মশার প্রজনন বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আরো বেড়ে গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা মোকাবেলার ব্যস্ততার মধ্যেও আমরা ডেঙ্গু প্রতিরোধে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। বৃষ্টি হলে আমাদের উদ্বেগ আরো বেড়ে যায়। এমনিতেই করোনা নিয়ে অস্থির অবস্থা চলছে, এর মধ্যে যদি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বা মশার উৎস ধ্বংসে সঠিকভাবে কাজ করা না যায় তবে ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি কাটবে না। এ ছাড়া সিজনাল ফ্লু তো আছেই। করোনা ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়া আর ফ্লু যদি একাকার হয়ে এবার দেশে জেঁকে বসে, তবে পরিস্থিতি খুবই জটিল হয়ে উঠবে। তাই আমাদের সবাইকে এবার সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের দায়িত্বে থাকা সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার জানান, বাংলাদেশে গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৬১ জন। মারা গেছেন ছয়জন। অন্যদিকে এ বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে দেশে ২৭১ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। গত বছর এই তিন মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭৩ জন। আর ২০১৫ সাল থেকে প্রতি বছর এই তিন মাসে কেবল ২০১৭ সালে মোট আক্রান্ত ছিল ১১৮ জন, বাকি বছরগুলোতে ওই সংখ্যা ছিল ১০০ জনের নিচে।

একই কর্মকর্তার তথ্যানুসারে দেখা যায়, গত চার বছরের মধ্যে এবারই ইনফ্লুয়েঞ্জাজনিত নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যু ছিল সর্বোচ্চ। প্রতি বছর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত এই হিসাব করা হয়। সে অনুসারে নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ২০১৬-১৭ সালে আক্রান্ত ছিল ১৬ হাজার ৪৯০ জন ও মৃত্যু ৯ জনের, ২০১৭-১৮ সালে আক্রান্ত ছিল ১৮ হাজার ৬৮৭ ও মৃত্যু ছিল ১৯ জনের, ২০১৮-১৯ সালে আক্রান্ত ছিল ২০ হাজার ৪৪৬ ও মৃত্যু ছিল সাতজন এবং সব শেষ গত বছরের নভেম্বর থেকে গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হয় এক লাখ ১১ হাজার ৭৩৭ জন এবং মারা যায় ২২ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, করোনাভাইরাস শনাক্ত ও রোগী ব্যবস্থাপনায় এখন পুরো দেশই বিশেষভাবে সক্রিয়। তবে সেই তুলনায় ডেঙ্গু ও ফ্লু ব্যবস্থাপনা অনেকটা চাপা পড়ে গেছে। তবে ডেঙ্গু মোকাবেলায় এই পর্যায়ে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে একইতালে এডিস মশার উৎস ধ্বংস করা। সেটা করতে না পারলে গত বছরের চেয়েও জটিলতা বাড়বে। কারণ করোনার কারণে এখন ঢাকার বেশির ভাগ মানুষই সারা দেশে ছড়িয়ে আছে এবং বেশির ভাগ মানুষই ঘরে থাকছেন। ফলে মশায় কামড়ানো ঝুঁকি বেড়ে গেছে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বা সংস্থার দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করাসহ ১২ দফা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে গত বৃহস্পতিবার আন্ত মন্ত্রণালয় সভায়। এতে ঢাকার দুই নগর সংস্থা, ক্যান্টনমেন্ট এলাকা, বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ একযোগে মশক নিধন অভিযান শুরু করবে। স্থানীয় সরকার বিভাগ সব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এ জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করে দেবে। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সম্মেলন কক্ষে মশক নিধন ও ডেঙ্গু প্রতিরোধসংক্রান্ত ওই সভায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম সভাপতিত্ব করেন।

সভায় মন্ত্রী বলেন, সরকারি ভবন, লেক, পার্ক, খাল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর বা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু মশা মারার কাজ করবে সিটি করপোরেশন। দীর্ঘ ছুটির সময় বন্ধ থাকা সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলো থেকে এডিস মশার উৎপত্তি যেন না হয় তা নিশ্চিত করারও নির্দেশ দিয়েছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহনীলা ফেরদৌসী জানান, পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুসারে এপ্রিল মাস থেকে বছরজুড়ে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোধে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের ডেঙ্গুবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া, ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন-২০২০ হালনাগাদ এবং ডেঙ্গু প্রশিক্ষণ মডিউল বিতরণ, ডেঙ্গু সচেতনতাবিষয়ক পোস্টার, লিফলেট, স্টিকার তৈরি ও বিতরণ, দেশের ৬৪ জেলায় ৫২ হাজার ৬০০ ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিট সরবরাহ করা হয়েছে। এ ছাড়া সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের সামনে এপ্রিল মাসজুড়ে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া সম্পর্কিত সচেনতামূলক ব্যানার ঝোলানো থাকবে। এ ছাড়া হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার চালু এবং সিটি কপোরেশন ও পৌর মেয়রদের নিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাবিষয়ক কার্যক্রম চালু থাকবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা