kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

বিশ্বজুড়ে ‘করোনা ঠেকাও’ যুদ্ধ আরো কঠোর হচ্ছে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিশ্বজুড়ে ‘করোনা ঠেকাও’ যুদ্ধ আরো কঠোর হচ্ছে

করোনাভাইরাস আতঙ্কে পুরো বিশ্ব এখন তটস্থ। এর সংক্রমণ রুখে দিতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ। বহু দেশের সীমান্তই এখন বন্ধ। আন্তর্জাতিক চলাচলের ক্ষেত্রে তো বটেই, দেশের মধ্যেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকারগুলো। যার প্রত্যক্ষ ফলাফল, বিশ্বের অর্ধেক মানুষ এখন ঘরের মধ্যে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। সারা বিশ্বের প্রায় ৮৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন বন্ধ। সব ব্যবস্থার লক্ষ্য একটাই—করোনাকে ঠেকানো। আর এই একটিমাত্র লক্ষ্য হাসিলে বিভিন্ন দেশ বেছে নিয়েছে বিভিন্ন পথ। যেমন রাশিয়া কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রেখে বিধান করেছে। চীন ডিজিটালি এবং নিজের সর্বশক্তি ব্যবহার করে মানুষের গতিবিধির ওপর নজর রাখছে। জাপান আবার কড়া লকডাউনে রাজি নয়। জার্মানিতে মানুষের জন্য খানিকক্ষণ খোলা বাতাসে হাঁটার কথাও বলা হয়েছে। বেশির ভাগ দেশই শুরু করেছে চীনের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারির মধ্য দিয়ে। চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরেই প্রথম ছড়াতে শুরু করে এ ভাইরাস। রাশিয়া ও জাপানেরও প্রথম পদক্ষেপ ছিল এটি। ধীরে ধীরে এ তালিকায় যুক্ত হয় দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপের ২১টি দেশ ও ইরান। জাপানে আমেরিকানদের ক্ষেত্রে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন বাধ্যতামূলক করা হয়। তবে দেশ বাছাবাছির যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যায়নি অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। সব বিদেশির জন্যই তাদের দেশে ‘প্রবেশ নিষেধ’। আর নিজেদের নাগরিক যারা দেশে ফিরবে তাদের অবশ্যই কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। সিঙ্গাপুরও একই ব্যবস্থা নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া স্বদেশি, বিদেশি কাউকেই দেশে ঢুকতে বাধা দিচ্ছে না। তবে সবার জন্যই কোয়ারেন্টিন বিধান প্রযোজ্য। ভারত সব বিদেশির জন্য তাদের দরজা বন্ধ করেছে ১৮ মার্চ পর্যন্ত। যুক্তরাষ্ট্র তাদের উত্তরাঞ্চলীয় কানাডার সীমান্তে খিল তুলে দিয়েছে। সেনজেন (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) সীমান্ত বাইরের দেশের জন্য বন্ধ (১৮ তারিখ থেকে পরবর্তী ৩০ দিন পর্যন্ত)। কভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়া চীনেও এখন আর বিদেশি নাগরিকরা প্রবেশ করতে পারছে না। শুধু বিদেশি নয়, নিজের দেশের নাগরিকদের ওপরও প্রতিটি দেশ কড়াকড়ি আরোপ করেছে। রাশিয়ার পার্লামেন্ট গতকাল করোনাভাইরাস ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ালে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হবে বলে আইন পাস করেছে। একই সঙ্গে গুজব ছড়ালে তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। দেশটিতে গতকাল পর্যন্ত ভাইরাসে আক্রান্ত ছিল প্রায় আড়াই হাজার এবং মারা গেছে ১৭ জন। বর্তমানে রাশিয়ায় এক সপ্তাহের কর্মবিরতি চলছে। শুরুতে বিষয়টি নিয়ে রুশরা শিথিলতা দেখালে প্রধান শহর মস্কোতে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে ফোন ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে মানুষের চলাচলের ওপর নজরদারি করার পরিকল্পনাও তাদের রয়েছে।

এই মহামারিতে ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত ইতালিতে লকডাউন শুরু হয় ১২ মার্চ থেকে। ২৫ মার্চ এই লকডাউন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরিস্থিতি তাতে অনুমোদন দেয়নি। ফ্রান্স ও স্পেনও জনগণকে বাড়ি থেকে বের হতে অনুমতি নেওয়ার কথা বলেছে। লকডাউনের পথেই হাঁটছে ব্রিটেনও। এই তিন দেশের সরকারই নিয়মভঙ্গকারীদের জরিমানা করা হবে বলে সতর্ক করে দিয়েছে। জার্মানির রাজ্যভেদে লকডাউনের আইন ভিন্ন। সেখানে নাগরিকদের অল্প সময়ের জন্য হলেও খোলা বাতাসে হাঁটার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এখন অবশ্য বেজায় কড়াকড়ি। অতিপ্রয়োজনীয় না হলে ক্যালিফোর্নিয়ার মানুষকে বাসা থেকে বের হয়ে নিষেধ করা হয়েছে। অতিপ্রয়োজনীয় নয় এমন সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। ভয়াবহভাবে আক্রান্ত নিউ ইয়র্ক এখন পুরোপুরি লকডাউনে।

তবে সুখের কথা হচ্ছে, চীনের কড়াকড়ি এখন অনেকটাই কমে এসেছে। উহান এখন প্রায় সচল। আগামী ৮ এপ্রিল থেকে উহানের লকডাউন পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে। আর এ ক্ষেত্রে অভাবনীয় কাজ করেছে ১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারত। পুরো দেশ এখন ২১ দিনের লকডাউনে বন্দি। আর এই লকডাউন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও তীব্র কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া চলাচলের ওপর কড়াকড়ি রয়েছে বেশ কয়েকটি দেশে। আর্মেনিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান ও কসোভোতেও নানা মেয়াদের লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।

এর বাইরে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) শুরু থেকেই যত বেশি সম্ভব পরীক্ষা করার কথা বলছিল। এ কাজটি সবচেয়ে বেশি করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। যুক্তরাষ্ট্র নানা কারণ দেখিয়ে শুরুতে পরীক্ষা করার ব্যাপারে গড়িমসি করে। এখন অবশ্য তারাও এ ব্যাপারে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে নেওয়া আরেকটি পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে জনসমাগম হয় এমন বিনোদনের স্থানগুলো বন্ধ করে দেওয়া। একই সঙ্গে ঝাঁপ ফেলে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাজারেরও। বন্ধ রাখা হয়েছে স্কুল। জাতিসংঘের হিসাবে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮৭ শতাংশ স্কুল এখন বন্ধ। ইউনেসকো জানায়, ১৮০টিরও বেশি দেশের স্কুলে এখন ক্লাস নেওয়া হচ্ছে না।

ক্রীড়াজগতের পঞ্জিকাও তছনছ হয়ে গেছে করোনার আঘাতে। টোকিও ২০২০ অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিক আগামী বছর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। ফুটবল, রাগবি, ফর্মুলা ওয়ান, টেনিস, ক্রিকেট, গলফ এবং অন্য খেলার ওপরও এর প্রভাব পড়েছে। সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বহু অনুষ্ঠান এরই মধ্যে বাতিল হয়ে গেছে। স্থগিত হয়ে গেছে চলচ্চিত্র উৎসব, বাতিল হয়েছে তীর্থযাত্রা। তবে সরকারের সব ব্যবস্থার মধ্যেও সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা এর কতটা মানব তার ওপরই নির্ভর করছে এসব পদক্ষেপের সাফল্য। রাশিয়ার পার্লামেন্ট স্টেট অব দুমার স্পিকার ভিয়াচেস্লাভ ভলোদিন গতকাল আইন পাস করার পর বলছিলেন, ‘এ সবই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। আমরা যতটা দায়িত্বপূর্ণ আচরণ করব, ঠিক ততটাই সুরক্ষিত থাকবে আমার এবং আমাদের প্রিয়জনদের জীবন।’ সূত্র বিবিসি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা