kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ২৬  মে ২০২০। ২ শাওয়াল ১৪৪১

সংবাদপত্রে করোনার আঘাত

জোরালো হচ্ছে সরকারি সহায়তার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩০ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জোরালো হচ্ছে সরকারি সহায়তার দাবি

ভোরে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সংবাদপত্রে চোখ বোলায় লাখ লাখ মানুষ। বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা লোকমুখে ঘুরতে থাকা অসংখ্য ‘ভুল বার্তা’ যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে যথার্থভাবে পরিবেশিত হয় মুদ্রিত সংবাদপত্রে। পাঠকও মুক্ত হয় বিভ্রান্তি থেকে। সঙ্গে জানতে পারে দেশ ও বিদেশের হাজারো ঘটনা। তবে বৈশ্বিক মহামারি করোনার নেতিবাচক প্রভাবে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে বাংলাদেশের সংবাদপত্র। সংবাদপত্রশিল্পের এই অপ্রত্যাশিত সংকটকে নজিরবিহীন বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

অপ্রত্যাশিত এ সংকট থেকে উত্তরণে সরকারি সহায়তা জরুরি হয়ে পড়েছে। তৈরি পোশাক খাতসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের কর্মীদের বেতন-ভাতা দিতে সরকার পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। করোনাভাইরাসের প্রকোপে বর্তমানে অবরুদ্ধ অবস্থায় প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে সংবাদপত্রগুলো। সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তথ্যসেবা অব্যাহত রেখেছেন। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদপত্রশিল্পকে বাঁচাতে সরকারি প্রণোদনাসহ অন্যান্য সহায়তা দ্রুত সময়ে দিতে হবে বলে মত দিয়েছেন এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা।

ঘরবন্দি পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়েছে সংবাদপত্রের বিতরণ ব্যবস্থা। সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ। এ অবস্থায় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। এমন পরিস্থিতিতে সংবাদপত্র ছাপানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে ট্যাবলয়েড দৈনিক মানবজমিন কর্তৃপক্ষ তাদের প্রকাশনা বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যান্য সংবাদপত্র তাদের অনেক বিভাগ বন্ধ করছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রের সম্পাদক ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠায়। বর্তমানে সংবাদপত্রগুলো তাদের মুদ্রিত পত্রিকা দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ২৫ জেলায় সরবরাহ করতে পারছে না। কোনোটির আবার এক-তৃতীয়াংশও সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। কাগজে করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে, এমন ভ্রান্ত ধারণায় হকারদের কাছ থেকে পত্রিকা কিনছে না পাঠকদের একটি অংশ; যদিও এই ভুল ধারণা এরই মধ্যে ভাঙতে শুরু করেছে। কিন্তু সাধারণ ছুটি ঘোষণার ফলে যানবাহন ও দোকানপাট বন্ধ থাকায় হকাররা সংবাদপত্র বিক্রি করতে পারছেন না।

বিভিন্ন হকার সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ ছুটি ঘোষণার ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ বিভিন্ন শহরের হকাররা তাঁদের নিজ নিজ গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন। হকার কমে যাওয়ায় ভেঙে পড়েছে পত্রিকার বিলি-বণ্টন প্রক্রিয়া।

এ অবস্থায় বিপুল বিনিয়োগ ও জনবল নিয়ে সংবাদপত্রশিল্প পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো গভীর সংকটে পড়েছে। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন বিভাগ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া বিজ্ঞাপন বিল তুলতে পারছে না। সরকারি বিজ্ঞাপনের বিশাল অঙ্কের বকেয়াও পড়ে আছে।

অতীতেও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সংবাদপত্র বন্ধ হয়নি। তবে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষ দৈনিক মানবজমিন প্রকাশনা বন্ধ করে দিয়েছে।

করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাবে বিপর্যস্ত অর্থনীতির মুখোমুখি দেশের সংবাদপত্র। সংবাদপত্র প্রকাশনা টিকিয়ে রেখে সামনে এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) কোষাধ্যক্ষ, দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, “কর্মীদের সুরক্ষার জন্যই আমি পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করেছি। হকাররা পত্রিকা বিতরণ করতে পারছেন না। কলকাতায় বন্ধ হয়েছে ‘বর্তমান’ ও ‘আজকাল’-এর প্রকাশনা। এ অবস্থায় আমি মনে করি, সংবাদপত্রশিল্পে সরকারের প্রণোদনা দেওয়া এবং সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা বিজ্ঞাপন বিল দ্রুত পরিশোধ করা উচিত। রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এটি অবশ্যই অভিনন্দনযোগ্য উদ্যোগ। সংবাদপত্রশিল্পেও এ ধরনের সহায়তা জরুরি।”

কাগজে করোনাভাইরাস ছড়ায় না—পত্রিকা পাঠকদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) এরই মধ্যে বিবৃতি দিয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ছাপা সংবাদপত্রের কাগজে করোনাভাইরাস টিকে থাকার কোনো তথ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পাওয়া যায়নি।

সংবাদপত্রশিল্প বাঁচাতে কিছু করার অনুরোধ জানিয়েছেন আমাদের নতুন সময়-এর সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিকরা অত্যন্ত দৃঢ় মনোবল, অঙ্গীকার ও দায়িত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে সাহসের সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদের সব খবর পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে নিজেদের দিন-রাত নিয়োজিত  রেখেছেন। জরুরি ভিত্তিতে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সংবাদপত্রের পুঞ্জীভূত বকেয়া বিজ্ঞাপনের বিল এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে ছাড়করণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া, সরকারের তরফে গার্মেন্টশিল্পের জন্য যেমন প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে, তেমনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সংবাদপত্রের ব্যয় নির্বাহ এবং বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য প্রয়োজনমতো সুদমুক্ত ব্যাংকঋণ সহায়তা, জরুরি ভিত্তিতে দরিদ্র কর্মজীবী হকারদের জন্য সরকারি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করার অনুরোধ করছি।’

ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে যদি সংবাদপত্রকর্মীদের বেতন দিতে হয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা ছাড়া একেবারেই অসম্ভব। যেখানে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি সব অফিস বন্ধ থাকবে, সেখানে বিশেষ উদ্যোগে সংবাদপত্রগুলোর বিল আদায়ের ব্যবস্থা যদি সরকার না করে, তাহলে বড় ধরনের সংকটে পড়বেন সংবাদকর্মীরা।’

ঢাকা সংবাদপত্র হকার্স বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. মোস্তফা কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা মহানগরী থেকে লোকজন চলে গেছে। এ ছাড়া ধারণা ছড়ানো হয়েছে—করোনাভাইরাস ছড়ায় খবরের কাগজেও। এই ভুল ধারণার ফলে সংবাদপত্র বিক্রি কমেছে। সরকারকেও প্রচার করতে হবে, খবরের কাগজে এ ভাইরাস ছড়ায় না। সংবাদপত্রশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি সহায়তা জরুরি।’

তথ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আজ-কালের মধ্যে নোয়াব নেতাদের সঙ্গে তথ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হতে পারে। তারপর সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে বা সরকারের অবস্থান বোঝা যাবে—তারা সংবাদপত্রশিল্পে কী সহায়তা দেবে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা