kalerkantho

সোমবার । ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ১  জুন ২০২০। ৮ শাওয়াল ১৪৪১

ভারত ২১ দিনের লকডাউনে

► ভারতই ভবিষ্যৎ নির্ধারক! ► ১৯৬ দেশ-অঞ্চলে আক্রান্ত চার লাখ ► মৃত্যু ১৮ হাজার ছাড়িয়েছে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৫ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভারত ২১ দিনের লকডাউনে

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় ২১ দিনের লকডাউন বা অবরুদ্ধ ঘোষণা করেছে ভারত। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গতকাল মঙ্গলবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, মঙ্গলবার (গতকাল) রাত ১২টা থেকে ১৪ এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত পুরো ভারত লকডাউন থাকবে।

এই লকডাউন না মানলে ভারত ২১ বছরের জন্য পিছিয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন মোদি। তিনি বলেন, ‘দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, আপনাদের পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে এমন অনুরোধ করছি। এই কটা দিন বাইরের জীবন ভুলে যান।’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের কাছে অনুরোধ, এই সংকটের সময় ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাবেন না। আমার বিশ্বাস প্রত্যেক ভারতীয়, সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলবেন।’

তিনি আরো বলেন, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, ইতালি—এই দেশগুলোর স্বাস্থ্য পরিষেবা অত্যন্ত উন্নত। তা সত্ত্বেও তারা করোনা মোকাবেলা করতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে উপায় কী? একটাই উপায়, যাঁরা করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছেন তাঁদের থেকে শিক্ষা নেওয়া। ওই সব দেশে সরকারের কথা শুনে বাড়ির বাইরে বেরোননি সাধারণ মানুষ। আমাদেরও তা মেনে চলতে হবে।

এদিকে আক্রান্ত কিংবা মৃতের সংখ্যা এক দেশে কমছে তো ১০ দেশে বেড়ে যাচ্ছে—নতুন করোনাভাইরাসের সঙ্গে বিশ্বের লড়াইটা প্রায় আড়াই মাস ধরে এভাবেই চলছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে ভারত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, শত কোটির বেশি জনসংখ্যার দেশ ভারত কিভাবে ভাইরাসটি মোকাবেলা করবে, তার ওপরই নির্ভর করছে বাকি বিশ্বের ভবিষ্যৎ কেমন হবে। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন, কেবল চীন, ইউরোপ কিংবা যুক্তরাষ্ট্র নয়, করোনাভাইরাসের কারণে মাসুল গুনতে হবে গোটা বিশ্বকে।

‘করোনাভাইরাস ডিজিজ ২০১৯’ (কভিড-১৯)-এ প্রায় ২০০টি দেশ ও অঞ্চল আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা চার লাখ ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ১৮ হাজার ২৯৫ জনের। সুস্থ হয়ে উঠেছেন এক লাখের বেশি মানুষ।

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ইতালিতে দৈনিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা গত দুই দিন কমেছে। তবে স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রে এই সংখ্যা বাড়ছে। এরই মধ্যে সর্বোচ্চ আক্রান্তের তালিকায় চীন ও ইতালির পর জায়গা করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। চীনে খানিকটা স্বস্তি ফিরলেও ‘দ্বিতীয় আঘাতের’ (সেকেন্ড ওয়েভ) আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। কারণ দেশটিতে প্রতিদিনই বাইরে থেকে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রবেশ করছে।

ভারতের হাতেই ভবিষ্যৎ : জনসংখ্যার দিক থেকে চীনের পরই ভারতের অবস্থান। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১৩৫ কোটি। এ অবস্থায় ভারত করোনাভাইরাসকে কিভাবে মোকাবেলা করবে, তার ওপরই বিশ্বের ভবিষ্যৎ অনেকখানি নির্ভর করছে বলে সতর্ক করে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও)। সংস্থাটির জরুরি স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচির প্রধান মাইক রিয়ান গতকাল জেনেভায় বলেন, ‘ভারত ব্যাপক জনবসতিপূর্ণ একটি দেশ। তাই চলমান এই বৈশ্বিক মহামারি ভবিষ্যতে কী রূপ ধারণ করবে, তা নির্ভর করবে ভারতের ওপর। এটা গুরুত্বপূর্ণ যে, দেশটি এরই মধ্যে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।’ তবে ভারতকে আরো অনেক কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে বলেও মনে করেন তিনি। গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দেশটিতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৫১৯ এবং ১০ জনে।

ইউরোপের পরিস্থিতি : চীন বাদে কভিড-১৯-এ আক্রান্তের তালিকায় শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় রয়েছে যথাক্রমে ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, জার্মানি, ইরান, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রিয়া। এর মধ্যে সাতটি দেশ ইউরোপের। এই ১০টি দেশে গতকাল পর্যন্ত মোট আক্রান্ত হয়েছে দুই লাখ ৬৮ হাজার ৪০১ জন মানুষ। এর মধ্যে ইউরোপের সাতটি দেশেই আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ৮৩ হাজার ৬৯৩। বাকি ৮৪ হাজার ৭০৮ জনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রেই ৫০ হাজার ৮৬০ জন। এই ১০টি দেশে মৃতের সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার। এর মধ্যে ইউরোপের সাতটি দেশেই মারা গেছে ১১ হাজারের বেশি মানুষ। ইতালিতে গত রবিবার মৃত্যু হয়েছে ৭৪৩ জনের। দেশটিতে মোট আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৬৯ হাজার ১৭৬ এবং ৬৮২০-তে। স্পেনে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৩৯ হাজার ৬৭৬ এবং দুই হাজার ৮০০-তে। এর মধ্যে সব শেষ ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে সাড়ে চার হাজারের বেশি; মৃত্যু হয়েছে ৪৮৯ জনের। জার্মানিতে তিন হাজার ৭২৫ জন বেড়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৭৮১ জনে। আর মোট মৃত্যু হয়েছে ১৫৬ জনের। ফ্রান্সে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা যথাক্রমে ১৯ হাজার ৮৫৬ এবং ৮৬০। এর মধ্যে গতকাল কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে আরো চার চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে গতকাল থেকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা যুক্তরাজ্যে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে আট হাজার ৭৭ এবং ৪২২ জনে।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি : সর্বোচ্চ আক্রান্তের তালিকায় গত রবিবারও চতুর্থ স্থানে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু পরের দিন চীন ও ইতালির পরই জায়গা হয়েছে তাদের। গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৮৬০ জনে। আর মৃত্যু হয়েছে ৬৫৩ জনের। যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে নিউ ইয়র্কে ২৫ হাজার ৬৬৫ জন। এর পরই আছে নিউ জার্সি ৩৬৭৫, ওয়াশিংটন ২২২১ ও ক্যালিফোর্নিয়ায় ২২৬৬ জন।

এশিয়া ও আফ্রিকা : দ্বিতীয় দফায় করোনাভাইরাস আঘাত করে কি না, সেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে চীনে। দেশটিতে স্থানীয়ভাবে আক্রান্তের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বিদেশ থেকে সংক্রমিত হয়ে আসার সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। গতকাল দেশটিতে মোট ৭৪ জনের মধ্যে কভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে একজন স্থানীয়ভাবে আক্রান্ত হয়েছেন। বাকিরা বিদেশ থেকে আসা। আগের দিন চীনে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩৯; যাঁদের সবাই বিদেশ থেকে সংক্রমিত হয়ে চীনে প্রবেশ করেন। প্রথমবারের মতো কভিড-১৯-এ আক্রান্তের খবর নিশ্চিত করেছে মিয়ানমার। সোমবার রাতে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের দেশে দুজনের মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এঁদের একজন সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে; আরেকজন যুক্তরাজ্য থেকে মিয়ানমারে ফিরেছেন। ইরানে গতকাল আরো ১২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১,৭৬২ জন। এ নিয়ে দেশটিতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল যথাক্রমে ২৪,৮১১ ও ১,৯৩৪ জনে। এশিয়ার আরেক দেশ থাইল্যান্ড গতকাল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় জরুরি অবস্থা জারি করেছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদু বুহারির চিফ অব স্টাফ আব্বা কিয়ারি। অন্যদিকে পুরো দেশ তিন সপ্তাহের জন্য অবরুদ্ধ করে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। গতকাল পর্যন্ত দেশটিতে ৪০০ জনের বেশি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

বিশ্বের সার্বিক পরিস্থিতি : বৈশ্বিক পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত বিশ্বের ১৯৬টি দেশ ও অঞ্চল কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চার লাখ ১০ হাজার ৪৬৫ জনে। মোট মৃত্যু হয়েছে ১৮ হাজার ২৯৫ জনের। সুস্থ হয়েছেন এক লাখ সাত হাজার ৮৯ জন। এ ছাড়া বিশ্বের প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন গড়ে ৫০ দশমিক ৬ জন। প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ২ দশমিক ২ জনের। আর আক্রান্তদের বৈশ্বিক মৃত্যুর হার ৪.৩৬ শতাংশ।

উহান থেকে লকডাউন উঠছে ৮ এপ্রিল : করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল বলে বিবেচিত চীনের উহান শহর ৮ এপ্রিল অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্তি পাচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার চীনের হুবেই প্রদেশের স্বাস্থ্য কমিশন এক ঘোষণায় এ কথা জানিয়েছে। রাজধানী উহান বাদে আজ বুধবার থেকে হুবেই প্রদেশে প্রবেশ ও প্রদেশটি থেকে বের হওয়ার ওপর আরোপিত সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে তারা। সূত্র : এএফপি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা