kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

ঘরেই অফিসের কাজে বহু প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা

মাসুদ রুমী   

২৪ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ঘরেই অফিসের কাজে বহু প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা

ব্যবসার চেয়ে কর্মী, গ্রাহক ও সাধারণ মানুষের সুরক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে দেশে কর্মরত বহুজাতিক কম্পানিগুলো। তাদের আহ্বান, ‘ঘরে অফিস করুন, নিজেকে ও সমাজকে সুরক্ষা করুন। বাইরে আসার দরকার নেই।’ করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে তাই সবার আগে তারা ঘরে থেকে অফিস (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) কর্মসূচি শুরু করেছে। কর্মীদের অনলাইন নেটওয়ার্কে যুক্ত করে কাজ চালিয়ে নিতে তাদের অসুবিধা হচ্ছে না। এমনকি করোনাভাইরাসের এই জরুরি পরিস্থিতিতে সবাইকে হোম কোয়ারেন্টিনের নীতি অনুসরণ করে বাইরে আসার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের আগাম বেতন দিয়ে দিয়েছে। বহুজাতিক কম্পানিগুলোর মতো কিছু দেশি কম্পানিও ‘ঘর থেকে অফিস’ চালু করেছে। সরকারি ও বেসরকারি অফিসের কর্মীরাও ‘সাময়িক’ সময়ের জন্য ঘরে অফিস করার সুযোগ পেতে সরকারের নির্দেশনা চান।

বাংলাদেশে যেসব বহুজাতিক কম্পানি ব্যবসা করে, তাদের বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআই-সিসিআই) সদস্যসংখ্যা ১৮৮। তবে তাদের মধ্যে কতগুলো কম্পানি বাসায় অফিস চালু করেছে তা জানা যায়নি।

বাসায় বসে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ, মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক, রেকিট বেনকিজার, ম্যারিকোর মতো বহু দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান; যারা ‘অফিস ফ্রম হোম’ চালুর পাশাপাশি করোনাভাইরাস ঠেকাতে বাড়তি প্রস্তুতি ও সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়েছে।

জানতে চাইলে ইউনিলিভার বাংলাদেশের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, পার্টনারশিপ অ্যান্ড কমিউনিকেশনস শামীমা আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত শনিবার থেকে আমরা প্রধান কার্যালয়ের ২৮৮ জনসহ মাঠ পর্যায়ের ৪০০ জন বাসা থেকে কাজ করছি। এতে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে না। যাঁদের বের হতেই হচ্ছে তাঁরা পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিয়ে বের হচ্ছেন।’

বাসায় অফিস বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে রেকিট বেনকিজার (বাংলাদেশ) লিমিটেডের মার্কেটিং ডিরেক্টর নুসরাত জাহান বলেন, “একটি বহুজাতিক দায়িত্বশীল কম্পানি হিসেবে রেকিট বেনকিজার তার কর্মীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গ্লোবাল নির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের বেশির ভাগ কর্মীই ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ ফরম্যাটে কাজ করছেন। অফিস টাইমে ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের টিম সবাই সবার সঙ্গে কানেক্টেড থাকছি। এ ছাড়াও আমরা ই-সিগনেচারের মাধ্যমে আপাতত পেপার ওয়ার্কগুলো করছি। আমাদের মনিটরিং টিম সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে।”

ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডের ডিরেক্টর এইচআর আশীষ মানে কালের কণ্ঠকে বলেন, “কভিড-১৯-এর সংক্রমণ রোধ করতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ম্যারিকো বাংলাদেশ তার কর্মীদের জন্য ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বাস্তবায়ন করেছে এবং ডিজিটাল সলিউশন কাজে লাগিয়ে অনলাইনে সব ধরনের যোগাযোগ, মিটিং পরিচালনা করছে। কর্মীদের ব্যক্তিগত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কেনাকাটার সুবিধার্থে অগ্রিম বেতন প্রদান করা হয়েছে।”

করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে কর্মীদের সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থায় বাসায় বসে অফিস চালু করেছে দেশের টেলিকম অপারেটরগুলো। রবি আজিয়াটা লিমিটেডের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, “রবির যেসব কর্মী ‘হোম অফিস’-এর মাধ্যমে কাজ করছেন তাঁদের জন্য ভিপিএনের (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একজন কর্মী বাসায় বসে অফিসের সব ধরনের কাজ করতে পারছেন। এ ছাড়া জরুরি বৈঠক ও যোগাযোগের জন্য ই-মেইল, ভিডিও কলিংয়ের মতো প্রচলিত ডিজিটাল সুবিধাগুলোও আমাদের কর্মীরা ব্যবহার করছেন।”

গ্রামীণফোনের হেড অব এক্সটার্নাল কমিউনিকেশন মুহাম্মদ হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিরাপত্তা আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এমপ্লয়ি এবং ব্যাবসায়িক পার্টনারদের নিরাপদ রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাইডলাইন বিবেচনায় নিয়ে ইতিমধ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। আমাদের এমপ্লয়ি যাঁরা সরাসরি গ্রাহক সেবার সঙ্গে জড়িত নন, তাঁদের ডিজিটাল পদ্ধতিতে বাসা থেকে অফিস করার জন্য উৎসাহিত করছি। একই সঙ্গে যাঁরা সরাসরি গ্রাহক সেবা দেবেন তাঁদের জন্য যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।’

বাংলালিংকের করপোরেট কমিউনিকেশনস সিনিয়র ম্যানেজার আংকিত সুরেকা বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলালিংকের সব অফিস ও সার্ভিস সেন্টারে ভাইরাস সংক্রমণ রোধের পদ্ধতি ও সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি আমরা বাংলালিংক গ্রাহকদের জন্য করোনাভাইরাস হটলাইন নম্বরে বিনা মূল্যে কলের সুবিধা প্রদান করেছি।’

দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কম্পানির জনসংযোগ ও বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপনার কাজে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকে বাসায় অফিস শুরু করেছে। মাস্টহেড পিআর ও টপ অব মাইন্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী (সিইও) জিয়াউদ্দিন আদিল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সহকর্মীদের সবাইকে যার যার বাসা থেকে অফিস করতে বলেছি। তবে জরুরি প্রয়োজনে অফিস খোলা আছে। আমরা সবার চলতি মাসের বেতনও দিয়ে দিয়েছি। অফিসের সময় বাসায় আর বাকি সময় বাইরে ঘুরে না বেড়াতেও কঠোর নির্দেশনা দিয়েছি। বাসাতেই থাকতে হবে এবং এটা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর অনন্য সুযোগ।’ 

কনসিটো পিআরের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মানজেনো রায়হান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা গত ১৮ মার্চ থেকে হোম অফিস শুরু করেছি। আমাদের অনেক সহকর্মী গণপরিবহন ব্যবহার করেন, যেখানে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। এ অবস্থায় একটি দায়িত্বশীল কম্পানি হিসেবে আমরা আমাদের সহকর্মীদের ঝুঁকির কথা চিন্তা করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। গত কয়েক দিন ফোন, অনলাইনে অফিস চালাতে খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না। আমাদের ক্লায়েন্টরাও ব্যাপারটা বুঝতে সক্ষম হয়েছে।’

বিক্রয় ডটকমের কো-ম্যানেজিং ডিরেক্টর ঈশিতা শারমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কর্মীদের সুরক্ষার জন্য আমাদের ২০০ কর্মী বাসা থেকে কাজ করছেন। তাঁদের বাসায় ল্যাপটপ ও ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবস্থা করেছি। সভাগুলো ভিডিও কলের মাধ্যমে হচ্ছে, ক্লায়েন্টদের অনলাইন পেমেন্টে উৎসাহিত করছি।’

তবে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ পদ্ধতিতে একাকী কাজ করায় সর্বোচ্চ আউটপুট নাও আসতে পারে। তাই এ সময় পুরনো অসমাপ্ত কাজের পাশাপাশি ক্রিয়েটিভ কাজের জন্য সময়টা কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্রো এন এক্সেলের প্রধান নির্বাহী এম জুলফিকার হোসেন। তিনি বলেন, ‘কভিড-১৯ মোকাবেলায় ওয়ার্ক ফ্রম হোম করা অত্যন্ত সঠিক পদক্ষেপ। অফিসের মতোই শিডিউলমাফিক কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় বসে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শুরু করতে হবে। ভিডিও কল গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। যদিও কোনো ড্রেস কোড নেই, তবে অফিসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পোশাক পরিধান করলে কাজে উদ্দীপনা বৃদ্ধি পায়।’

দেশীয় ডেকো গ্রুপের ফার্নিচার প্রতিষ্ঠান ‘ইশো’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রায়ানা হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই কঠিন পরিস্থিতিতে আমাদের কর্মীদের নিরাপত্তায় আমরা হোম অফিস চালু করেছি, যাতে মাইক্রোসফট টিমস, ট্রেলোর মতো ভিডিও টুলস ব্যবহার করে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে পারছি।’

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা রামিসা পারভিন প্রধান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে হোম অফিস শুরু হয়েছে। কিন্তু আমার হাজব্যান্ডের অফিস এখনো চলছে। ফলে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। দেশের সকল অফিস আপাতত কিছুদিনের জন্য বাসায় বসে করার সুযোগ দিতে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা