kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

করোনাভাইরাস

অন্য প্রস্তুতি ভালো বিপদের ভয় হাসপাতালে

তৌফিক মারুফ   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অন্য প্রস্তুতি ভালো বিপদের ভয় হাসপাতালে

কভিড-১৯ বা নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কি না, তা দেখতে দেশে যে ৮৪ জনের রক্ত ও লালার নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে তাদের অনেকেই ভর্তি হয়েছিল ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার সরকারি হাসপাতালে। সৌভাগ্যক্রমে তাদের কারো মধ্যে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়নি। যদি এর কোনো একজনের শরীরেও ওই ভাইরাস শনাক্ত হতো বা হয়—তাহলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে কোনো হাসপাতালই প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত মানের আইসোলেশন ব্যবস্থা কার্যকর করতে পারত না বা এখনো সেই সক্ষমতা নেই। সরকারের উদ্যোগে এরই মধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে যে আইসোলেশন ইউনিট করা হয়েছে তা কেবলই প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু ব্যবস্থামাত্র। পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবকাঠামো, কারিগরি ও পরিবেশগত। আর শুধু স্বাস্থ্য বিভাগ একাও এ কাজ সামাল দিতে পারবে না। করোনাভাইরাস পরিস্থিতির তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা এবং এ বিষয় নিয়ে কাজ করা বেশ কয়েকজন নীতিনির্ধারক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ থেকে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

তবে এর মধ্যেই একমাত্র ভরসা হয়ে উঠছে সরকারের কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালটি। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে উত্তরায় এই হাসপাতাল থেকে অন্য রোগীদের অন্যান্য হাসপাতালে সরিয়ে এটিকে কেবলই করোনাভাইরাসের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাজনিত বিশেষায়িত হাসপাতালে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক (সচিব পদমর্যাদায়) অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো অবস্থাতেই দেশের কোনো সাধারণ হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ বা জেলা-উপজেলা হাসপাতালে করোনাভাইরাসের রোগী ব্যবস্থাপনা করা ঠিক হবে না। কারণ কোনো হাসপাতালে যদি একজনও কভিড-১৯ পজিটিভ পাওয়া যায় তাহলে ওই হাসপাতালটি অন্যদের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এ ছাড়া এ ভাইরাসটি যেহেতু অত্যধিকত উচ্চমাত্রার ছোঁয়াচে তাই এসব হাসপাতালের সাধারণ আইসিইউতেও (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) রাখা যাবে না। আবার ওই ধরনের হাসপাতাল খালি করে অন্য সব রোগীকে নিরাপদে সরিয়েও নেওয়ার অবস্থাও থাকবে না। তাই সন্দেহজনক কোনো করোনাভাইরাস আক্রান্তকে কোনো সাধারণ হাসপাতালে না যাওয়া বা নেওয়ার জন্য আমি একাধিক বৈঠকেও পরামর্শ দিয়েছি।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাস নিয়ে সতর্কতা ও দেশের বাইরে থেকে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রস্তুতিতে বাংলাদেশ অনেকখানি এগিয়ে থাকলেও সম্ভাব্য চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুতি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষ করে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোগত অবস্থান, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ব্যবস্থাপনা ও সন্দেহজনক রোগীদের হাসপাতালে প্রবেশের ক্ষেত্রে রয়েছে বহু রকম জটিলতা। এরই মধ্যে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায় সন্দেহজনক বেশ কয়েকজন ব্যক্তি হাসপাতালে প্রবেশ ও পরবর্তী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা থেকে এমন জটিলতা বিভিন্নভাবে খুঁজে পেয়েছেন স্বাস্থ্য বিভাগের নীতিনির্ধারকরা। যদিও এখন ওই সব ঘাটতি কাটাতে জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের একাধিক বৈঠকও হয়েছে। যেখানে বিভিন্ন সমস্যা ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। এর পরও যদি দেশে করোনাভাইরাস দেখা দেয় তখন পরিস্থিতি কতটা সামাল দেওয়া যাবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে জনস্বাস্থ্যবিদদের মধ্যে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অবকাঠামো ও ভিড়ের কারণে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত মান রক্ষা করে আইসোলেশন বা কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা কার্যকর করা কঠিন। কারণ শুধু একজন রোগীকে আইসোলেশনে নিলেই চলবে না। সন্দেহজনক রোগীর নমুনা পরীক্ষার ফল না পাওয়া পর্যন্ত ওই একই ব্যবস্থা কার্যকর হওয়া দরকার।’

মহাপরিচালক বলেন, শুধু একজন রোগীর বাসা-বাড়ি, যে যে পথে হাসপাতালের এসেছেন, তাঁর সঙ্গে যাঁরা ছিলেন, হাসপাতালে তাঁর সংস্পর্ষে যারা এসেছেন সবাইকে বিশেষ পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে। এমনকি পুরো এলাকা ঘিরে রেখে বাইরে থেকে কারো প্রবেশ বা ভেতর থেকে কাউকে বের হতে দেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের বাস্তবায়তায় এটা কিভাবে করা সম্ভব তা নিয়ে আমরা উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একাধিকবার বৈঠক করেছি। বিভিন্নজন বিভিন্ন পরামর্শ-মতামত দিয়েছেন। যেগুলো আমরা মন্ত্রণালয়ে দিয়েছি। কারণ এটা শুধু স্বাস্থ্য বিভাগ একা করতে পারবে না। সরকারের আরো কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বাস্তবায়নমূলক জরুরি পদক্ষেপ দরকার হবে। তা না হলে শুধু রোগী ব্যবস্থানা নিশ্চিত করে অন্যদের সুরক্ষা দেওয়া যাবে না।’

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও করোনাভাইরাসসংক্রান্ত সরকারি কোয়ারেন্টাইন কার্যক্রমের সমন্বয়কারী ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রচার ও সচেতনতায় আমরা অনেক এগিয়েছি। বিমানবন্দরসহ অন্য বন্দরগুলোতে বাইরে থেকে প্রবেশকারী যাত্রীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ভালোভাবে চলছে। তবে সংকট হচ্ছে হাসপাতালে ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি নিয়ে। এই জায়গাটিতে ব্যবস্থাপনা কার্যকর রাখা খুব কঠিন।’ তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের ভিড় সামলে সম্ভাব্য করোনাভাইরাস আক্রান্ত বা সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তির হাসপাতালে প্রবেশের ব্যবস্থা নেই। এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক যারা হাসপাতালে গিয়েছিল সৌভাগ্যক্রমে তাদের কারো মধ্যেই করোনার সংক্রমণ পাওয়া যায়নি। যদি কোথাও একজনেরও করোনা হয়, তবে ওই হাসপাতালের অন্য রোগী এবং রোগীর বাড়ি ও হাসপাতালে আসার পথে যারা বিভিন্নভাবে তার সংস্পর্শে এসেছিল তাদের মনিটর করা হয়নি। এ ছাড়া ওই রোগীর সংস্পর্শে বা চিকিৎসার কাজে নিয়োজিত চিকিৎসক বিশেষ গাউন মাস্ক ব্যবহার করলেও নার্স, আয়া, অন্য কর্মীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা করেননি। এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

করোনাভাইরাস বিষয়ক বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্র ও আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মঙ্গলবার পর্যন্ত ৮৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তাদের কারো মধ্যেই করোনাভাইরাস পাওয়া যায়নি। তবে এই ৮৪ জনের মধ্যে ৪৪ জন বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়েছিল। আর বাকি ৪০ জনের মধ্যে ২৪ জন আমাদের আইইডিসিআরে এসে নমুনা দিয়ে গেছে। ১৬ জনের বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালগুলোতে যেসব ইউনিট রয়েছে সেগুলো একেবারে আলাদা করে ফেলার মতো ব্যবস্থা নেই। এটা এ ধরনের বড় সংক্রমণের জন্যও একটা চ্যালেঞ্জ। তাই আমরা এখন ঢাকার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল ও মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালকেই দেশের করোনাভাইরাসসংক্রান্ত বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করতে চাই। সেই সঙ্গে সবাইকে বলতে চাই যাতে অন্ততপক্ষে ঢাকায় যাঁরা নিজেদের সন্দেহজনক বলে মনে করবেন তাঁরা যেন অন্য কোনো হাসপাতালে না গিয়ে সরাসরি উত্তরার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে যান। সেখান থেকে অন্য রোগীদের সরিয়ে ফেলা হয়েছে।’

ড. ফ্লোরা পরামর্শ দিয়ে বলেন, যদি কেউ নিজেকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করেন সবার আগে তিনি নিজেই অন্যদের সংস্পর্ষ এড়িয়ে চলবেন, মাস্ক ব্যবহার করবেন এবং হাসপাতালে যাওয়ার ক্ষেত্রেও যতটা সম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করবেন।

আগের দিন মঙ্গলবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক নিজ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে চীনের দেওয়া করোনাভাইরাস পরীক্ষার কিট গ্রহণ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে করোনাভাইরাসমুক্ত। এ ছাড়া আমাদের এখানে সব রকমের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও রয়েছে।’

এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশে যেকোনো ভাইরাস শনাক্তকরণে কোরিয়া সরকারের দেওয়া একটি রিয়ালটাইম পিসিআর মেশিন হস্তান্তর করা হয়েছে। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও স্বাস্থ্যসচিব আসাদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

আইইডিসিআরের ব্রিফিং : গতকাল আইইডিসিআরে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে পরিচালক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা নানা কারণে আমাদের দেশে বসবাস করছে। তাদের সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের কর্তব্য। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের দায়ী করা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও ভীতিজনিত প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া মাত্র। কোনো বিশেষ দেশের নাগরিকদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি করোনার রোগী শনাক্ত করা ও প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’

ড. ফ্লোরা জানান, সিঙ্গাপুর ও আরব আমিরাতে বাংলাদেশের যে কয়জন নাগরিক আক্রান্ত হয়েছেন তাঁরা সবাই চিকিৎসাধীন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা