kalerkantho

সোমবার । ৪ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪১

চট্টগ্রাম গাজীপুর নারায়ণগঞ্জে বন্ধ হচ্ছে কারখানা

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চট্টগ্রাম গাজীপুর নারায়ণগঞ্জে বন্ধ হচ্ছে কারখানা

রাজধানীর পরই বেশি পোশাক কারখানা রয়েছে চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে। ক্রেতাজোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের খবরদারি ও নানা শর্তের কারণে ছোট ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক কারখানা মালিক ঋণখেলাপি হয়েছেন, বেতন দিতে পারছেন না কর্মীদের। সে কারণে কোনো কোনো উদ্যোক্তা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে চলেছেন। এসব এলাকায় গত তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে নিট ও ওভেন পোশাকের কয়েক শ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

চট্টগ্রাম থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক রাশেদুল তুষার জানান, দেশের তৈরি পোশাকের বাজার ২০০৫ সালে যখন বিশ্বব্যাপী অবস্থান জানান দিচ্ছিল সেই সময়ে এ খাতের রপ্তানি আয় ৬৯০ কোটি ডলারের মধ্যে চট্টগ্রামের অবদান ছিল ১৮১ কোটি ডলার। অর্থাৎ ২৬ শতাংশের বেশি। গত বছর এ খাতে রপ্তানি আয় দাঁড়ায় তিন হাজার ৩০৭ কোটি ডলার। এর মধ্যে চট্টগ্রামের পোশাক খাতে রপ্তানি আয় ১৩৩ কোটি ডলার, যা মোট রপ্তানি আয়ের মাত্র ৪ শতাংশ। এর সঙ্গে চট্টগ্রামের দুই রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) পোশাক খাতের ৬.৮ শতাংশ অবদান যোগ করলে ১০ শতাংশের বেশি হয়।

বিজিএমইএ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে চট্টগ্রামে চালু থাকা ৬১০টি গার্মেন্ট কারখানার মধ্যে সরাসরি রপ্তানি (ইউডি-ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন) করার অনুমতি ছিল ৩৩৯টির। বাকিগুলো মূলত সাবকন্ট্রাক্টে কাজ করত। অথচ গত বছর চট্টগ্রামে চালু ছিল ৩২৮টি কারখানা। এর মধ্যে সরাসরি রপ্তানির অনুমোদন রয়েছে মাত্র ১৮৬টি কারখানার। আর ১৪২টি কারখানা চলে সাবকন্ট্রাক্টে।

বিজিএমইএ থেকে প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর চট্টগ্রামে ১৪০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। বেকার হয়েছে ৪৬ হাজার কর্মী। এর মধ্যে গত তিন বছরেই চট্টগ্রামে ১১০টি কারখানা বন্ধ হয়ে বেকার হয়েছে ৩৩ হাজার কর্মী।

বিজিএমইএর সহসভাপতি এ এম চৌধুরী সেলিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটি ছোট কারখানারও চাহিদামতো অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ করতে চার থেকে পাঁচ কোটি টাকার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেভাবে ব্যাংক সাপোর্ট পাইনি। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি সব কাজ ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ার কারণে গার্মেন্ট খাত এগোচ্ছে না।’

গাজীপুর থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক শরীফ আহেমদ শামীম জানান, সেখানেও একে একে বন্ধ হচ্ছে পোশাক কারখানা। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে বিজিএমইএর অন্তর্ভুক্ত ৭৬টি কারখানা রয়েছে। মালিকরা বলছেন গ্যাস, বিদ্যুৎ, শ্রমিক মজুরি তথা উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, কমপ্লায়েন্ট খরচ ইত্যাদির কারণে লোকসান এবং ক্রেতাসংকটের কারণে কারখানা বন্ধ করে দিতে হচ্ছে।

গাজীপুর শিল্প পুলিশ, বিজিএমইএ নেতা, কারখানার মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে গাজীপুর জেলায় বন্ধ হওয়া বিজিএমইএভুক্ত কারখানাগুলোর মধ্যে ৩৩টি নিট, ২৩টি সোয়েটার আর বাকিগুলো ওভেন ও অন্যান্য খাতের। এসব কারখানার মধ্যে ডডি এক্সপোর্ট ওয়্যার, প্যাসিফিক এ ওয়ান সোয়েটার, পেল্টা কোয়ালিটি, ওয়াগা স্টাইল ওয়াইজ, মার্ক মুড, ইউন্টেরিয়া টেক্সটাইল, ডিভাইন টেক্স সোয়েটার, আসিফ অ্যাপারেলস, এহসান ফ্যাশন, জারা ডেনিম, অ্যালিগেন্স ওরিয়েন্টাল, সুপ্রিম ইন্ডাস্ট্রিজ, অটো স্পিনিং, রেপিশন অ্যাপারেলসের মতো নামিদামি কারখানাও রয়েছে।

উদ্যোক্তারা জানান, প্রতিদিনই নতুন নতুন কারখানা বন্ধ হচ্ছে। বেশ কয়েকটি বড় কারখানা বন্ধের গুঞ্জন রয়েছে। 

গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মো. ছিদ্দিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এককথায় বলতে গেলে উৎপাদন বাড়লেও ক্রেতারা দাম না বাড়ানোর কারণে লোকসানের মুখে কারখানা বন্ধ হচ্ছে। শ্রমিকরা কর্মহীন হচ্ছেন। বিষয়গুলো প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হচ্ছে।’

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি দিলীপ কুমার মণ্ডল জানান, সেখানেও একে একে নিট ও ওভেন পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ক্রেতাজোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের খবরদারির প্রভাব পড়েছে মারাত্মকভাবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ দুটি সংস্থার কড়াকড়ি শর্ত পূরণ করতে না পেরে অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। গত পাঁচ বছরে নারায়ণগঞ্জে কয়েক শ ছোট, মাঝারি ও বড় কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হয়েছে হাজার হাজার কর্মী।

মালিকদের অভিযোগ, যে তিনটি শর্ত নিয়ে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স কাজ শুরু করেছিল, এর মধ্যে শ্রমিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা অন্যতম। কিন্তু তারা পোশাকের ন্যায্য মূল্য নিয়ে কোনো কথাই বলেনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিট ও ওভেন খাতের মধ্যে নারায়ণগঞ্জে মূলত নিট পোশাক কারখানাই বেশি। ফতুল্লার বিসিক শিল্পাঞ্চলসহ জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট ৬০০ নিট ও ৫০টি ওভেন পোশাক কারখানা চালু রয়েছে।

নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর হিসাবে সংগঠনের সদস্যসংখ্যা দুই হাজার হলেও বর্তমানে সারা দেশে চালু আছে মাত্র ৮০০ কারখানা। গত পাঁচ বছরে নিট খাতের এক হাজার ২০০ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু বিসিক শিল্পাঞ্চলেই গত কয়েক বছরে ১০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বেকার হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার শ্রমিক। দেশে প্রথম দিকে গড়ে উঠা পোশাক কারখানা মিনার ইন্ডাস্ট্রিজ, মিনার টেক্সটাইল, মিনটেক্স, জার্জিস, মনোয়ারা, সান হোসিয়ারি, অটো টেক্স, মিনার হোসিয়ারি, লেবার হোসিয়ারি, গ্যালাক্সি স্পোর্টস, নামকন, রিভলাইন ও ইউনিসন এখন বন্ধ।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা