kalerkantho

 ৪ ফাল্গুন ১৪২৬ । সোমবার । ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪১

সেবা দিতে গিয়ে জীবন বিপন্ন স্বাস্থ্যকর্মীদের

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সেবা দিতে গিয়ে জীবন বিপন্ন স্বাস্থ্যকর্মীদের

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল চীনের উহান শহরের একটি হাসপাতালের নার্স নিং ঝু। কভিড-১৯ রোগাক্রান্তদের সেবা-শুশ্রূষায় দিন-রাত সমান করে খাটছিলেন। এরই মধ্যে গত ২৬ জানুয়ারি তাঁর শরীরে এই রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। এর পর থেকে তিনি ব্যক্তিগত কোয়ারেন্টাইনে আছেন। তিনি সত্যিই এ রোগে আক্রান্ত কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ কারণে জাতির ক্রান্তিকালে তাঁকে অবরুদ্ধ থাকতে হচ্ছে। নিং ঝুর কথায়, তাঁর হাসপাতালের অন্তত ১০০ জন স্বাস্থ্যকর্মী ব্যক্তিগত কোয়ারেন্টাইনে আছেন। তাঁদের কাজে ফেরা নির্ভর করছে নিউক্লিক এসিড টেস্টের ওপরে। এ ছাড়া হাসপাতালটির আরো ৩০ জনের সন্ধান মিলেছে, যাঁরা কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছেন। ফলে সেবা দিতে গিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের জীবন যেমন বিপন্ন হয়ে পড়েছে, তেমনি হাসপাতালের মাত্রাতিরিক্ত চাপ সামাল দেওয়াও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন (এনএইচসি) গতকাল জানিয়েছে, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ পর্যন্ত এক হাজার ৭১৬ জন স্বাস্থ্যকর্মী নতুন করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। এরই মধ্যে তাঁদের ছয়জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ৬ ফেব্রুয়ারি মারা যান চিকিৎসক লি ওয়েনলিয়াং, যিনি জনস্বার্থে এ ভাইরাস নিয়ে সতর্কবার্তা ছড়িয়ে প্রশাসনের রোষানলে পড়েন। তাঁর মৃত্যুর পর বাক্স্বাধীনতার প্রশ্নে দেশটিতে চরম জনরোষ দেখা দেয়। কভিড-১৯ আক্রান্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের ৮৭.৫ শতাংশই হুবেই প্রদেশের বাসিন্দা।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের শুরুতে অনেক স্বাস্থ্যকর্মী সাধারণ মাস্ক ব্যবহার করতেন। এ কারণে অনেকেই সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছেন হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রামক রোগ বিভাগের প্রধান ইভান হুং। তিনি বলেন, আসলে শুধু আইসোলেশন ওয়ার্ডে সেবার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের এন৯৫ মাস্ক, গগল্জ, ফেস শিল্ড ও সুরক্ষিত পোশাক পরাই যথেষ্ট নয়। বরং সাধারণ ওয়ার্ড, জরুরি ওয়ার্ড—সবখানেই নিজেকে সতর্ক রাখা উচিত, যাতে করে কভিড-১৯ আক্রান্তের কাছ থেকে সুরক্ষিত থাকা যায়।

এদিকে গত বুধবার চীনে এ রোগে মৃত্যু ও সংক্রমিত হওয়ার যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল তাতে কিছুটা সংশোধনী এনেছে এনএইচসি। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ভুলবশত হুবেই প্রদেশের মৃতের সংখ্যা দুইবার যোগ করা হয়েছিল। পরে সেখান থেকে ১০৮ জন বাদ দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া সংক্রমিতের সংখ্যায়ও ভুল হয়েছিল; যাচাই-বাছাই শেষে সেই সংখ্যা ১০৪৩ কমে গেছে। রোগ নির্ণয় পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার পর এ দিন মৃত্যু ও সংক্রমণে উল্লম্ফন দেখা দিয়েছিল।

এর পরদিন বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছে। হুবেইয়ে নতুন করে সংক্রমিত হয়েছে চার হাজার ৮২৩ জন। সব মিলিয়ে দেশটিতে এখন পর্যন্ত ৬৩ হাজার ৮৫১ জনের সংক্রমিত হওয়ার খবর মিলল। এদিন মোট মারা গেছে ১২১ জন, যার মধ্যে ১১৬ জনই হুবেই প্রদেশের। এতে চীনের মূল ভূখণ্ডে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩৮০ জনে (সংশোধিত)। আর এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ছয় হাজার ৭২৩ জন। ফলে দেশটিতে বর্তমানে মোট ৫৫ হাজার ৭৪৮ জন কভিড-১৯ রোগী আছে।

চীনের বাইরে বৃহস্পতিবার জাপানে দেশটির একজন নাগরিক মারা গেছে। এর আগে হংকং ও ফিলিপাইনে মারা গেছে দুজন। তারা চীনের নাগরিক। চীনের বাইরে এখন পর্যন্ত বিশ্বের ২৪টি দেশ ও বিশেষ অঞ্চলে অন্তত ৫০০ জন কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়েছে।

জাপানে মৃত্যু : কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে জাপানে প্রথম মৃত্যু হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী কাত্সুনোবু কাতু জানান, ২২ জানুয়ারি করোনাভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন অশীতিপর এক নারী। তিনি থাকতেন টোকিওর দক্ষিণ-পশ্চিমের কানাগাওয়া এলাকায়। মৃত্যুর পর তাঁর নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত হন কর্মকর্তারা।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরো জানান, রাজধানী টোকিওতে এক ট্যাক্সিচালকও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তাঁর শরীরে করোনাভাইরাস মিলেছে।

জাপানের এক সরকারি কর্তা জানান, আক্রান্ত চালকের গাড়িতে সম্ভবত কোনো চীনা যাত্রী উঠেছিলেন। তাঁর থেকেই ভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত হতে খোঁজ-খবর নিচ্ছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।

জাপানের স্থানীয় মেইনিচি শিমবুন পত্রিকা জানাচ্ছে, সেখানকার পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ওয়াকাইয়ামায় একজন চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। সব মিলিয়ে জাপানে এখন করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২৫০। চীনের পর প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আক্রান্ত জাপানই।

ইয়োকোহামায় প্রমোদতরি ত্যাগের সুযোগ : জাপানের ইয়োকোহামা বন্দরের কাছে পৃথক করে রাখা প্রমোদতরিতে অবস্থানরত ৮০ ঊর্ধ্ব ব্যক্তিদের দেশটিতে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বিকেলে মোট ১১ জনকে একটি বিশেষ বাসে করে বন্দর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নন কিন্তু আগে থেকে অসুস্থ ৮০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি, কিংবা যারা ডায়মন্ড প্রিন্সেসের জানালাবিহীন ঘরে আছেন তাঁদের জাহাজটি থেকে সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

জাপানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রমোদতরিটির যাত্রীদের ৮০ শতাংশই ষাটোর্ধ্ব। ২১৫ জনের বয়স ৮০-র ঘরে; ১১ জন পেরিয়েছেন ৯০। গত মাসে জাহাজে থাকা হংকংয়ের ৮০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর আরোহীদের পরীক্ষা করা শুরু হয়। প্রমোদতরিতে যাত্রী ও ক্রু মিলিয়ে মোট ২১৮ জনের দেহে কভিড-১৯ রোগ ধরা পড়েছে। সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি যাত্রীর ডায়মন্ড প্রিন্সেসের ‘কোয়ারেন্টাইন’ অবস্থা বুধবার শেষ হওয়ার কথা।

৫ বন্দর ঘুরে ঠাঁই পেল প্রমোদতরি : যাত্রীদের সঙ্গে করোনাভাইরাসও চলে আসতে পারে, এমন আশঙ্কায় কোনো বন্দর কর্তৃপক্ষ নোঙর করার অনুমতি না দেওয়ায় সাগরে ঘুরতে থাকা একটি প্রমোদতরি অবশেষে কম্বোডিয়ায় নোঙরের অনুমতি পেয়েছে। করোনাভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কায় এশিয়ার পাঁচটি বন্দর এমএস ওয়েস্টারডাম প্রমোদতরিকে নোঙরের অনুমতি দেয়নি। দুই হাজারেরও বেশি আরোহী থাকা ওয়েস্টারডামে একজনও করোনাভাইরাস সংক্রমিত নেই।

মঙ্গলবার প্রমোদতরিটি ব্যাংকক বন্দরে নোঙর করার উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু অনুমতি পায়নি। বরং থাইল্যান্ড নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজ প্রমোদতরিটিকে পাহারা দিয়ে নিয়ে থাইল্যান্ডের জলসীমার বাইরে দিয়ে আসে। এখান থেকেই জাহাজটি থাইল্যান্ডের প্রতিবেশী কম্বোডিয়ার উদ্দেশে রওনা দেয়। অবশেষে বৃহস্পতিবার সকালে জাহাজটি কম্বোডিয়ার বন্দর-শহর সিহানুকভিলে নোঙর করার মতো একটি স্থানে পৌঁছায়।

প্রমোদতরিটির ক্যাপ্টেন ভিনসেন্ট স্মিথ জানান, কর্তৃপক্ষকে আরোহীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার সুযোগ দিতে জাহাজটি সিহানুকভিলের বাইরে নোঙর করবে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে যাত্রীরা জাহাজ ছাড়তে পারবে এবং কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন থেকে যার যার দেশে ফিরে যাবে।

ওয়েস্টারডাম প্রমোদতরিকে নোঙর করার অনুমতি দেওয়ায় কম্বোডিয়ার প্রশংসা করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস গ্যাবরিয়েসুস।

করোনার দিনে চীনে ভ্যালেনটাইনস ডে : করোনাভাইরাসের আতঙ্ক যখন গ্রাস করেছে পুরো বিশ্বকে, চীনে রীতিমতো যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তখন সেখানে কিভাবে পালিত হচ্ছে ভ্যালেনটাইনস ডে? চীনের গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, যেখানে দেখানো হয়েছে করোনাভাইরাসের আতঙ্ক উপেক্ষা করে চীনের মানুষ কিভাবে তাদের প্রেম-ভালোবাসা প্রকাশ করছে, এমনকি বিয়ে করছে।

‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’ হচ্ছে নোবেল পুরস্কারজয়ী কলম্বিয়ান লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের একটি বিখ্যাত প্রেমের উপন্যাস। গ্লোবাল টাইমসের এই ভিডিওটির শিরোনাম তারই অনুকরণে ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব করোনাভাইরাস আউটব্রেক’।

সিঙ্গাপুরের স্ট্রেইট টাইমস জানাচ্ছে, ভ্যালেনটাইনস ডে চীনে যে রকম ব্যাপকভাবে উদ্যাপিত হয়, এবার তা দেখা যাচ্ছে না। বহু অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। সংক্রমণের আশঙ্কায় অনেক প্রেমিক-প্রেমিকা ঘরে বসেই দিনটি উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

করোনা থেকে বাঁচল শতবর্ষী নারী : করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিন দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন থাকার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৯৬ বছর বয়সী চীনা নাগরিক লু। প্রাণঘাতী ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা লু-ই হচ্ছেন এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি।

চীনে শনাক্ত হওয়া ভাইরাসটিতে যেখানে অনেক যুবক মারা যাচ্ছেন, সেখানে প্রায় শতবর্ষী এই নারীর বেঁচে যাওয়ার বিষয়টি সবার মধ্যে আশা জাগাচ্ছে। এর আগে গত সপ্তাহে ৯২ বছর বয়সী এক নারী ভাইরাসটির আক্রমণ থেকে রেহাই পান।

জিঝাং প্রদেশের নিংবো শহরের বাসিন্দা লু অসুস্থ হয়ে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে তাঁকে হংজুর জিঝাং বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে টানা তিন দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকার পর গত বৃহস্পতিবার তিনি ছাড়পত্র পান।

হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিভাগের পরিচালক ড. শেং জিফেং বলেন, লু তাঁর মেয়ের কাছ থেকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। আর তাঁর মেয়ে সংক্রমিত হয় এক বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে। এখন লুর মেয়ের চিকিৎসা চলছে। সূত্র : সিএনএন, বিবিসি, এএফপি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা