kalerkantho

 ৪ ফাল্গুন ১৪২৬ । সোমবার । ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪১

ডাকঘর সঞ্চয় প্রকল্পে সুদ অর্ধেক

মাথায় বাজ ক্ষুদ্র আমানতকারীদের

জিয়াদুল ইসলাম   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মাথায় বাজ ক্ষুদ্র আমানতকারীদের

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সালমা নাজনিন ২০১৭ সালে তিন বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয় প্রকল্পে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। চলতি বছরের জুলাই মাসে তাঁর সঞ্চয়ের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ভাবনায় ছিল, মেয়াদ শেষে ওই টাকা একই প্রকল্পে আরো তিন বছরের জন্য পুনরায় বিনিয়োগ করার। কিন্তু তাঁর এই ভাবনায় বাদ সেধেছে প্রকল্পের সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত। নতুন করে এখানে বিনিয়োগ করার কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছেন না। কারণ সুদের হার প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে। ক্ষোভ প্রকাশ করে সালমা নাজনিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিরাপদ বিনিয়োগের নিশ্চয়তা ও তুলনামূলক বেশি সুদ মেলায় এখানে অর্থ সঞ্চয় করেছিলাম, কিন্তু সুদ কমিয়ে দেওয়ায় সেই সুযোগটুকুও আর থাকছে না। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

ডাকঘর সঞ্চয় প্রকল্পে সুদের হার কমিয়ে দেওয়ায় সালমা নাজনিনের মতো অনেকেই এখানে টাকা রাখতে নিরুৎসাহ হচ্ছেন। আর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের এই অনীহার কারণে এই সঞ্চয় প্রকল্প থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার সুযোগও কমে যাবে। ফলে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপরই সরকারকে অধিক নির্ভরশীল থাকতে হবে। অথচ অর্থবছরের সাত মাস না যেতেই সরকার ইতিমধ্যে পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার বেশি ব্যাংকঋণ নিয়ে ফেলেছে।

সব ধরনের ডাকঘর সঞ্চয় প্রকল্পে সুদের হার কমিয়ে গত বৃহস্পতিবার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ থেকে কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ শতাংশ। অনুরূপভাবে দুই বছর মেয়াদি সঞ্চয় প্রকল্পের সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ৫ শতাংশ, যা আগে ছিল ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ। আর এক বছর মেয়াদে সুদহার ১০ দশমিক ২০ থেকে কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ শতাংশ।

ডাকঘরের আমানতকারী চাইলে প্রতি ছয় মাস অন্তর মুনাফা উত্তোলন করতে পারেন। আর সেখানেও সুদের হার কমবে। প্রথম বছরে ৪, দ্বিতীয় বছরে সাড়ে ৪ ও তৃতীয় বছরে ৫ শতাংশ হারে মুনাফা মিলবে। আগে যা ছিল যথাক্রমে ৯, সাড়ে ৯ ও ১০ শতাংশ। তবে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন সুদহারে ডাকঘরে টাকা রাখলে প্রকৃত মুনাফা বলে কিছুই থাকবে না। কারণ বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার আর ডাকঘর সঞ্চয় প্রকল্পের সুদের হার প্রায় একই বা তার চেয়েও কম। ফলে এখানে টাকা রাখলে প্রকৃত অর্থে আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ফলে তাঁরা সঞ্চয়ে নিরুৎসাহ হবেন। সঞ্চয়ে তাঁদের আগ্রহ কমে যেতে পারে। কিংবা উচ্চ সুদের প্রলোভনে সঞ্চয় অপ্রাতিষ্ঠানিক হায় হায় কম্পানিতে চলে যেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এভাবে মানুষকে সঞ্চয়ে নিরুৎসাহ করা মোটেও ঠিক হচ্ছে না। এটা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত। এর ফলে সাধারণ মানুষ সঞ্চয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে সঞ্চয় অপ্রাতিষ্ঠানিক উেস চলে যাওয়ারও শঙ্কা তৈরি হবে, যা অর্থনীতির জন্য ভালো হবে না। তিনি বলেন, এমনিতেই সঞ্চয়ের হার কমে গেছে। আর সঞ্চয় না হলে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

সঞ্চয়পত্রে এর আগেই উেস কর বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর উেস কর ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। আবার এক লাখ টাকার বেশি অঙ্কের সঞ্চয়পত্র কিনতে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে সঞ্চয়পত্রের বিক্রিও অস্বাভাবিক হারে কমে গেছে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা, যা পুরো অর্থবছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ২০ শতাংশ। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৭৮ শতাংশ কম। আগের অর্থবছরের একই সময়ে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা।

এদিকে ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই সব ধরনের আমানতে ৬ শতাংশ সুদহার কার্যকর শুরু করেছে ব্যাংকগুলো। সব ঋণে ৯ শতাংশ সুদ হার কার্যকরে গত জানুয়ারি মাসে বৈঠক করে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো সার্কুলার জারি করা হয়নি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা