kalerkantho

সরকারের কাছে গোয়েন্দা প্রতিবেদন

সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে নিত্যপণ্যের বাজার

► আড়তদার ও মিল মালিকদের আধিপত্য চালের বাজারে
► পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের কারসাজির কবলে ভোজ্য তেল
► চিনির বাজার অযৌক্তিকভাবে অস্থির করার পাঁয়তারা
► রমজানে ছোলাসহ মসলার দাম বাড়ানোর অপচেষ্টা

সজীব হোম রায়   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে নিত্যপণ্যের বাজার

ব্যবসায়ী, আড়তদার ও মিল মালিকদের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে নিত্যপণ্যের বাজার। পর্যাপ্ত উৎপাদন, আমদানি, মজুদ থাকার পরও এরই মধ্যে চাল, ভোজ্য তেলসহ কয়েকটি নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। আসছে রমজান মাস ঘিরে ছোলা, মটর ডালসহ আরো কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছেন বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ীরা। চীনের করোনাভাইরাসে ‘আমদানি বন্ধের’ গুজব ও অজুহাত তুলে মসলাজাতীয় পণ্যের দাম বাড়ানোরও অপচেষ্টা আছে। গত সপ্তাহে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) এক গোপন প্রতিবেদন এসব বিষয় উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে রমজান মাসে ব্যবসায়ীরা যাতে নিত্যপণ্যের দাম লাগামছাড়া না বাড়াতে পারেন, সে জন্য অসৎ ব্যবসায়ীদের নজরদারিতে আনা, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া এবং টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকিতে পণ্য বিক্রির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন বলছে, দেশে কিছু কিছু পণ্যের মজুদ চাহিদার চেয়ে বেশি। এর পরও বাজারে প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়তি। গত ১০ দিনে চাল প্রতি কেজি তিন-আট টাকা, ডাল ১০-১৫ টাকা, পেঁয়াজ ৪০-৫০ টাকা, রসুন ৪০-৫০ টাকা, ভোজ্য তেল আট-দশ টাকা, চিনি তিন-চার টাকা বেড়েছে। আর এর প্রধান কারণ অসৎ মিল মালিক, আড়তদার ও আমদানিকারকরা। তেলের দাম বাড়াতে মিল মালিক থেকে পাইকারি বিক্রেতারা নিজেদের মধ্যে তেলের বারবার হাত বদল করেন। এ ছাড়া কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে কিছু পণ্যের মজুদ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মুনতাকিম আশরাফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এফবিসিসিআই প্রতিবারের মতো এবারও রমজানের বাজারে যেন ভোগ্য পণ্যের দাম না বাড়ে সে জন্য মনিটর করবে। তবে আমরা এখন চীনে করোনাভাইরাস ঘটনার কী প্রভাব পড়তে পারে তা নিয়ে চিন্তিত। চীনের কারখানাগুলোয় উৎপাদন শুরু না হওয়ায় সামনে স্থানীয় বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছি।’

চাল : এসবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমন মৌসুমে কৃষক মোটামুটি ন্যায্য মূল্য পেয়েছে। তবে বর্তমানে কৃষকের হাতে ধানের মজুদ খুবই কম। আমন মৌসুমে সরকার ধান কিনলেও সরকারি বিক্রিতে নানা জটিলতার কারণে অধিকাংশ ধান খোলাবাজারের মাধ্যমে মিল মালিক ও আড়তদাররা কিনেছে। এদের কাছে বর্তমানে ধানের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। এ কারণে বাজারে চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে গেছে। ফলে বেশি মুনাফা লাভের সুযোগ পেলেই তারা বাজারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাতে পারে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর কৃষি শাখার হিসাবে, গত বোরো মৌসুমে ধানের উৎপাদন ছিল ১৯৫ দশমিক ৬১ লাখ টন। আমন মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে ১৪০ দশমিক ৫৫ টন এবং আউশ উৎপাদন হয়েছে ২৭.৭৫ টন। সর্বমোট উৎপাদন ৩৬৩ দশমিক ৯১ লাখ টন। অন্যদিকে মোট বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৮৩ লাখ টন। অর্থাৎ উদ্বৃত্ত প্রায় ৮০ লাখ টন। অথচ চালের দাম গত দশ দিনে বেড়েছে কেজিপ্রতি তিন-দশ টাকা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমনের মৌসুমে ফসল ঘরে ওঠার পর কৃষকের হাতে থাকাকালে বাজারে চালের মূল্য স্থিতিশীল ছিল। ধান কৃষকের হাত থেকে মিল মালিক ও আড়তদারদের হাতে চলে যাওয়ার পরই চালের দামের ঊর্ধ্বগতি ঘটছে।

ভোজ্য তেল : গত ১০-১১ দিনে বাজারে সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি আট-দশ টাকা বেড়েছে। গত মাসের শেষ সপ্তাহে সয়াবিনের পাইকারি মূল্য ছিল প্রতি লিটার ১০০-১০২ টাকা (বোতলজাত) ও খুচরা মূল্য ১০৫-১০৬ টাকা। খোলা তেলের খুচরা মূল্য ছিল লিটার ৮৭-৮৮ টাকা। বর্তমানে সয়াবিনের পাইকারি মূল্য লিটার ১০৫-১০৭ টাকা, খুচরা ১১৩-১১৫ টাকা। এ মূল্যবৃদ্ধির পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। মিলগুলোর কাছে পরিশোধনের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ ক্রুড অয়েল আছে। বাজারে পরিশোধিত তেলের সরবরাহে কোন ঘাটতি নেই। এর পরও দাম বাড়ার কারণ হিসেবে এসবি বলছে, মালিক/আমদানিকারকরা অপরিশোাধিত ভোজ্য তেল পরিশোধন করার সময় বা আগে নির্দিষ্ট এজেন্টের (মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী) কাছে ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) বিক্রি করেন। প্রতি মণ তেলে ৩০ থেকে ৪০ টাকা লাভে ডিও  এজেন্টদের কাছে বিক্রি করা হয়। এজেন্টরা আবার স্থানীয় পাইকারি বিক্রেতার কাছে মণপ্রতি ৩০-৪০ টাকা লাভে ওই ডিও বিক্রি করেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে ডিও হাতবদল হয়ে ধাপে ধাপে তেলের দাম বাড়ে। একপর্যায়ে দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকারি বিক্রেতাদের কাছে আবার মণপ্রতি ৩০-৪০ টাকা লাভ যোগ করে ডিও বিক্রি করা হয়। এভাবে বিক্রয়মূল্যের তুলনায় স্থানীয় পাইকারি বিক্রেতার কাছে তেলের কেজিপ্রতি ছয়-সাত টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার কাছে ১০-১১ টাকা দাম বাড়ে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্ন্তজাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় আমদানিকারক ও এজেন্টরা তেলের দাম বাড়ান। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে তাঁরা কমান না। বর্তমানে বাজারে সরবরাহকৃত ভোজ্য তেল অন্তত ১০ থেকে ৪৫ দিন আগে আমদানি করা। এ ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির কোনো কারণ নেই।

চীন বিশ্বে ভোজ্য তেল আমদানিকারকের তালিকায় শীর্ষে। করোনাভাইরাসের প্রভাবে চীনে তেল আমদানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে পাম তেল ও সয়াবিন তেলের দাম প্রতি কেজিতে সাড়ে সাত টাকা কমেছে। মালয়েশিয়ায় পাম তেলের দাম ৮৫০ ডলার থেকে ৭২০ ডলারে নেমেছে। সয়াবিনের দাম ৯০০ ডলার থেকে ৮১০ ডলারে নেমেছে। বিশ্ববাজারে দাম কমতে থাকায় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে পাম অয়েল কেজিতে ১২ টাকা এবং সয়াবিন তেল কেজিতে ৯ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে। অথচ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন খুচরা বাজারে ভোজ্য  তলের দাম কেজিতে আট থেকে দশ টাকা বেড়েছে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

পেঁয়াজ : দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ২৪ লাখ টন। দেশে গড় উৎপাদন ১৬ লাখ টন। চাহিদার বাকি আট-দশ লাখ টন আমদানি করতে হয়। বেশির ভাগই ভারত থেকে আমদানি হয়। চীন, মিসর ও মিয়ানমার থেকেও কিছু  আমদানি হয়। ভারত হঠাৎ এলসি মূল্য বাড়ালে দেশে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়। গত সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ৩৬-৪০ টাকা দরে বিক্রি হওয়া পেঁয়াজ এক মাসের ব্যবধানে দ্বিগুণ দাম বাড়ে,  যা একপর্যায়ে কেজি ২২০-২৩০ টাকায় ওঠে। পেঁয়াজ চাষিরা বেশি লাভের আশায় ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে ক্ষেত থেকে অপরিপক্ব পেঁয়াজ ওঠাতে শুরু করেন। ফলে এ বছর পেঁয়াজ পরিপুষ্ট বা স্বাভাবিক উৎপাদন উপযোগী হওয়ার সুযোগ পায়নি। তাই এ বছর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন হবে না। সে ক্ষেত্রে অধিক পরিমাণে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে। আগামী এপ্রিল মাসে রমজানের সময় পেঁয়াজের ভরা মৌসুম থাকলেও দেশের উৎপাদন দিয়ে বিগত ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হবে। কারণ রমজানে অন্যান্য মাসের তুলনায় দ্বিগুণ অর্থাৎ তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টন পেঁয়াজের প্রয়োজন হবে। তাই ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে মিসর, তুরস্ক, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশ থেকে চাহিদা অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারিভাবে আমদানির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এখনই উদ্যোগ না নিলে রপ্তানিকারক দেশগুলো থেকে পেঁয়াজ দেশে পৌঁছতে যে সময়ের প্রয়োজন হবে, তাতে সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি জনমনে অহেতুক আতঙ্কের কারণে রমজানে দর প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।

চিনি : চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের তথ্য মতে, দেশে চিনির বছরে চাহিদা ১৬ লাখ টন। সে হিসাবে প্রতি মাসে চাহিদা এক থেকে সোয়া লাখ টন। তবে রমজানে চাহিদা দুই থেকে আড়াই লাখ টন হয়। চিনিকলগুলোর গোডাউনে বর্তমান মজুদ ৫৬ হাজার টন। চিনি রিফাইনারি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, এ বছর তারা ১২ লাখ টন চিনি উৎপাদন করবে। বিআইএসএফের তথ্য মতে দেশের বাজারে চিনির ঘাটতি নেই। তবে রমজানে বাড়তি চাহিদা মেটাতে রিফাইনারি মিলগুলোর উৎপাদন যথাযথ পর্যায়ে রাখাসহ সরকারি মিলগুলোর গোডাউন থেকে চিনির বাজারজাতকরণ পরিকল্পিত ও সমন্বিতভাবে করা প্রয়োজন। অন্যথায় রিফাইনারি মিল মালিকরা সিন্ডিকেট তৈরির মাধ্যমে উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে সংকট তৈরি করতে পারেন। 

ছোলা, মটর ও ডালজাতীয় ভোগ্য পণ্য : বাজারে গত ১০ দিনে মসুর ডালের মূল্য কেজিপ্রতি ১০-১৫ টাকা বেড়েছে। গত মাসের শেষ সপ্তাহে এর পাইকারি মূল্য ছিল ৯৫-১০০ টাকা, খুচরা মূল্য ছিল ১০০-১০৫ টাকা। এখন পাইকারি মূল্য ১০৫-১১০ টাকা এবং খুচরা বিক্রি হচ্ছে ১১৫-১২০ টাকায়। রমজান সামনে রেখে অতি চাহিদাসম্পন্ন ভোগ্য পণ্য ব্যাপক হারে আমদানি হচ্ছে। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জকেন্দ্রিক আমদানিকারকরা ছোলা, ডালজাতীয় পণ্যের প্রচুর এলসি করেছেন এবং এরই মধ্যে শিপমেন্টও হয়েছে। রমজানে ছোলার চাহিদা প্রায় ৮০ হাজার টন, অন্যান্য মাসে থাকে ১০-১২ হাজার  টন। রমজানে মসুর ডালের চাহিদা ৭৫-৮০ হাজার টন। বাংলাদেশে ছোলা ও ডালজাতীয় পণ্য আমদানির অন্যতম দেশ অস্ট্রেলিয়া। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় দাবানলের কারণে ফসলের ক্ষতি হওয়ায় বুকিং রেট বা রপ্তানি মূল্য বেড়ে গেছে। প্রতিটন ছোলার রপ্তানি মূল্য ৫৬০ ডলার থেকে বেড়ে ৭৪০ ডলার, মসুর ডাল ৪৬০ থেকে ৫৯০ ডলার, মটর ২৬০ ডলার থেকে ৩২৫ ডলার হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও ছোলাসহ ডালজাতীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। এতে রমজান মাস সামনে রেখে ছোলা ও ডালজাতীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে। সরকারি উদ্যোগে টিসিবির মাধ্যমে প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে এখনই এসব পণ্য আমদানির ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশের এই বিশেষ শাখা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রসুন, আদা ও মসলাজাতীয় পণ্য আমদানি করা হয়। চীনে সাম্প্রতিক করোনাভাইরাসের কারণ দেখিয়ে ‘আমদানি বন্ধ থাকার’ অজুহাত বা গুজব তুলে অসাধু ব্যবসায়ীরা এরই মধ্যে রসুনের দাম কেজিপ্রতি ৪০-৫০ টাকা, আদা কেজিপ্রতি ২৫-৩০ টাকা, এলাচ কেজিপ্রতি ৮০০-১০০০ টাকা ও দারুচিনি কেজিপ্রতি ২০০-২৫০ টাকা বাড়িয়েছেন। আমদানির বিকল্প বাজার সৃষ্টি না করলে রমজানে দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা