kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ জানুয়ারি ২০২০। ৯ মাঘ ১৪২৬। ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১          

বায়ুদূষণে ঢাকা আবার শীর্ষে

যানবাহনে ধোঁয়া ও বর্জ্য পোড়ানোতে নিয়ন্ত্রণ নেই

আরিফুর রহমান   

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যানবাহনে ধোঁয়া ও বর্জ্য পোড়ানোতে নিয়ন্ত্রণ নেই

চলতি শীত মৌসুমের শুরুতেই রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণ অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের তথ্য মতে, বায়ুদূষণে ভারতের দিল্লিকে হটিয়ে এ বছর শীর্ষ অবস্থানে উঠে আসে ঢাকা। এরপর আদালত থেকে নির্দেশনা এলে নড়েচড়ে বসে পরিবেশ অধিদপ্তর। মাঝে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও বায়ুদূষণের ভয়াবহতায় ঢাকা গতকাল রবিবার আবারও সারা বিশ্বে এক নম্বরে উঠে এসেছে।

আদালতের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর আশপাশের ইটভাটা ও নগরে চলমান বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু রাতে আবর্জনা পোড়ানো ও কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযান নেই। অথচ ঢাকার বায়ুর মান সূচকে অবনতির জন্য এ দুটি বিষয় ব্যাপকভাবে দায়ী। যদিও পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, জনবল সংকটের কারণে অভিযানের কলেবর বাড়ানো যাচ্ছে না। মাত্র দুজন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে পাঁচ জেলায় ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন ও রাতের বেলায় বর্জ্য পোড়ানোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে যতসংখ্যক জনবল থাকা দরকার তা নেই।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্রের দাবি, ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য ৫৮ শতাংশ দায়ী ইটভাটা। আদালতের নির্দেশনার পর থেকে এ পর্যন্ত রাজধানীর আশপাশের ৭৪টি অবৈধ ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। জরিমানা আদায় করা হয়েছে দুই কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ইটভাটার পরই রয়েছে অবকাঠামো নির্মাণ। তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থানে রাতের বেলায় বর্জ্য পোড়ানো ও যানবাহনের ধোঁয়া। অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দাবি, তাঁদের কঠোর অবস্থানের কারণে ঢাকার বায়ুদূষণে কিছুটা উন্নতি ঘটছে।

এদিকে ২৫ নভেম্বর আদালত থেকে ঢাকার আশপাশে পাঁচটি জেলায় অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার আদেশ পাওয়ার পর ২৭ নভেম্বর থেকে মাঠে নামে পরিবেশ অধিদপ্তর। অভিযান পরিচালনার পর থেকে বায়ুদূষণের মাত্রা কমে আসে। দুই সপ্তাহের বেশি সময় এয়ার ভিজ্যুয়ালের তালিকায় ২০-এর মধ্যে ছিল না ঢাকা। তবে গতকাল সকালে ফের বায়ুদূষণে আবারও এক নম্বর অবস্থানে উঠে আসে রাজধানী। বিকেলের দিকে অবশ্য চতুর্থ স্থানে নেমে যায়।

দুই সপ্তাহ কিছুটা ভালো থাকার পর বায়ুদূষণে ঢাকা হঠাৎ করে এক নম্বর অবস্থানে উঠে আসার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ুদূষণের মাত্রা কমিয়ে আনতে প্রথম দিকে সরকারি সংস্থাগুলো ব্যাপক সক্রিয় ছিল। কিন্তু কয়েক দিনের ব্যবধানেই কর্মকর্তারা অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন। অবশ্য রাতের তামপাত্রা কমে যাওয়া ও বায়ুপ্রবাহের দিক পরিবর্তনও বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণ।

জানা গেছে, রাজধানীর ৪০টি স্থানে রাতে আবর্জনা পোড়ানো হয়। গত ২৫ নভেম্বর সচিবালয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্ত মন্ত্রণালয় সভায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে রাতে আবর্জনা পোড়ানো বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি।

বাপার যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১০ ডিসেম্বর রাজধানীর খামারবাড়ি এলাকায় গণনা করে দেখা যায়, প্রতি মিনিটে ১৬০টি যানবাহন চলাচল করছে। সেখানে প্রতি ঘনমিটারে পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম) ২.৫ পাওয়া গেছে ১২০ মাইক্রোগ্রাম। দুপুরে একই স্থানে প্রতি মিনিটে যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে ৩৫টি। আর ওই সময় প্রতি ঘনমিটারে পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম) ২.৫ পাওয়া গেছে ৪০ থেকে ৪৫ মাইক্রোগ্রাম। এতেই প্রমাণিত হয় যে ঢাকার বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ যানবাহন। পক্ষান্তরে আশপাশ এলাকার ইটভাটার দূষণ ঢাকার মধ্যে আসার আশঙ্কা কম। তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো যানবাহন থেকে বের হওয়া কালো ধোঁয়া ও রাতের বেলায় বর্জ্য পোড়ানো। বায়ুর মান সূচক অবনতিতে বড় ভূমিকা রাখা এ দুটি বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কোনো অভিযান পরিচালনা করছে না।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট শাখার পরিচালক রুবিনা ফেরদৌসী বলেন, ‘২৭ নভেম্বর থেকে আজ ১৫ ডিসেম্বর (গতকাল) পর্যন্ত মাত্র দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ৩০টি অভিযান পরিচালনা করে মোট ৭৪টি অবৈধ ইটভাটা গুঁড়িয়ে দিয়েছি। এত কম জনবল দিয়ে বিশাল কাজ করা অসম্ভব। তার পরও বায়ুদূষণ রোধে চলমান অভিযান ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। আর আমরা ঢাকায় যেসব যানবাহনে কালো ধোঁয়া দেখি সেগুলোর তালিকা করে বিআরটিএতে পাঠিয়ে দিই।’

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানের পর থেকে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে নিয়মিত পানি ছিটাতে দেখা যাচ্ছে। গতকাল কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রো রেল প্রকল্প এলাকায় সকাল-বিকেল পানি ছিটানো হচ্ছে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বনানী অংশেও তেমন চিত্র দেখা গেছে। বনানী অংশে দেখা গেল, প্রকল্পের জন্য ব্যবহৃত বালি ঢেকে রাখা হয়েছে।

গত ২৫ নভেম্বর আদালত ঢাকার আশপাশে পাঁচটি জেলায় অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ১৫ দিনের মধ্যে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৭ নভেম্বর মাঠে নামে পরিবেশ অধিদপ্তর। তার পর থেকে প্রতিদিনই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে ঢাকার আশপাশে পাঁচটি জেলার ইটভাটাগুলোতে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ইটভাটার পাশাপাশি অভিযান চালানো হয়েছে অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পকে জরিমানা করা হয় দুই লাখ টাকা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্পকে মৌখিকভাবে সতর্ক করার পর থেকে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে থাকে।

তবে ঢাকার যানবাহন ও আবর্জনা পোড়ানোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হলে বায়ুদূষণের মাত্রা আরো কমে আসবে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা