kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ জানুয়ারি ২০২০। ৯ মাঘ ১৪২৬। ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১          

স্কুলের ছাদেই লাশ হয় চার রাজাকার

ফখরে আলম, যশোর   

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



স্কুলের ছাদেই লাশ হয় চার রাজাকার

‘নভেম্বর মাস। জমিতে পাকা ধান। গ্রামে এক ধরনের নীরবতা। মানুষ ঘর থেকে বের হতে ভয় পায়। গোপনে জানতে পারি, হাশিমপুর স্কুলে রাজাকার আর পাঞ্জাবিরা ঘাঁটি গেড়েছে। আমরা ৩০ জন যোদ্ধা সেখানে আক্রমণের প্রস্তুতি নিই। সেদিন মুষলধারায় বৃষ্টি হচ্ছিল। আমরা যখন স্কুলের কাছে পৌঁছি তখন রাত ২টা। আমরা চারদিক থেকে স্কুল ঘিরে চুপচাপ পজিশন নিয়ে বসে থাকি। এর মধ্যে স্কুলের ছাদে পাহারারত রাজাকাররা টর্চ মারে। অমনি ফায়ার শুরু করি। চারজন রাজাকার মারা যায়। ছাদ থেকে তাদের লাশ নিচে পড়ে। ভোরে লড়াই শেষ হয়। হানাদাররা পিছু হটে। আমরা জয় বাংলা স্লোগানে শত্রুদের ঘাঁটি দখল করি।’

যশোর শহরের বারান্দীপাড়া এলাকার মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী স্বপন এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করলেন। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের সাহসের গল্প শোনালেন।

স্বপন ১৯৭১ সালে দশম শ্রেণির ছাত্র। দেশ উত্তাল হওয়ার সময় স্বপন গোপনে রাইফেল প্রশিক্ষণ নেন। ডামি রাইফেলের এই প্রশিক্ষণে নেতৃত্ব দেন ইপিআর সুবেদার সেকেন্দার, বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা জাহীদ সাহেব, রবিউল আলম আর আব্দুল হাই। যশোর এমএম কলেজের পুরাতন হোস্টেলে, বেজপাড়া কবরস্থানের সুপারিবাগানে গোপন এই অস্ত্রের প্রশিক্ষণ ২৫ মার্চের আগেই শুরু হয়। তারপর মুক্তিযুদ্ধ।

সেদিনের স্মৃতিচারণা করে স্বপন বলেন, ‘ওই যুদ্ধে রাজাকারের পাশাপাশি হতাহত হয় কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা। যশোর সদর উপজেলার হাশিমপুরের এই যুদ্ধে জয়লাভের পর গ্রামবাসী ঘর থেকে বের হয়ে এসে আমাদের বাহবা দিয়েছে। এরপর দোগাছিয়া গ্রামে একবার আমরা দখলদার বাহিনীর কাছে ঘেরাও হয়ে যাই। ওরা সংখ্যায় আমাদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ছিল। ওদের কাছে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রও ছিল। আমি কাভারিং ফায়ার করে অন্য সাথীদের নিরাপদে সরে যেতে সাহায্য করি। একপর্যায়ে আমার সাথী যোদ্ধা মাজেদ শহীদ হন। আমি কোনো মতে প্রাণে রক্ষা পাই। অন্যদেরও প্রাণ বাঁচাই।’

স্বপন বললেন, ‘যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদাররা শহরে প্রবেশ করে নিরীহ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমরা বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড দিই। সাঁজোয়া বহরে হাতে তৈরি বোমা ছুড়ে মারি। এপ্রিল মাসে আমি যশোর মহিলা কলেজের অধ্যাপক লুত্ফর রহমানের সঙ্গে সাইকেল চালিয়ে প্রথমে কলারোয়া, সেখান থেকে হাকিমপুর হয়ে ভারতের বনগাঁ চলে যাই। বনগাঁ টালিখোলা রিক্রুটিং ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম লেখাই। কলকাতার বারাকপুর ক্যান্টনমেন্টে কিছুদিন প্রশিক্ষণ নিই। সেখান থেকে আমাদের শিলচর নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর যাই আসামের হাকলং। সেখানে এক মাস উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। মে মাসের শেষে অস্ত্র ও গোলা নিয়ে বয়রা আসি। সেখান থেকে আমরা ৩১ জন যোদ্ধা চৌগাছার সীমান্ত পেরিয়ে যশোর সদরের কাশিপুর গ্রামে অবস্থান নিই। শহরের শত্রু ঘাঁটি রেকি করার জন্য আমাদের মধ্য থেকে চারজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমরা রেকি করি। এইচএমএম সড়কের পাঞ্জাবিদের ঘাঁটি শাহিন ট্রেডার্সে গ্রেনেড চার্জ করে পালিয়ে যাই। এতে অনেক পাঞ্জাবি হতাহত হয়। এ ছাড়া আমি আরো কয়েকটি অপারেশনে অংশ নিয়েছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা