kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ জানুয়ারি ২০২০। ১০ মাঘ ১৪২৬। ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

সুদহার কমানোর নামে ব্যাংক পেল ২৫৫০০ কোটি টাকা

সজীব হোম রায়   

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সুদহার কমানোর নামে ব্যাংক পেল ২৫৫০০ কোটি টাকা

সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা। বিশাল অঙ্কের এই টাকা কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে ঢোকেনি। ঢুকেছে ব্যাংকগুলোর পকেটে। গত দেড় বছরে এক অঙ্কের সুদহার বাস্তবায়নের কথা বলে ব্যাংকগুলো যে সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে তার পরিমাণ এই সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা। অথচ দু-একটি বাদে কোনো ব্যাংকই এক অঙ্কের সুদহার বাস্তবায়ন করেনি। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে এই পরিমাণ টাকার কথা উঠে এসেছে। এই টাকা দিয়ে আরেকটি পদ্মা সেতু প্রকল্প (প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা) বাস্তবায়ন সম্ভব। কিংবা মেট্রো রেলের (২২ হাজার কোটি টাকা) মতো আরেকটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অথবা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের (১২ হাজার কোটি টাকা) মতো দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র এবং নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সব ধরনের সুবিধা তাদের দিয়েছে। তাই সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার ব্যাপারে ব্যাংকগুলো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রতিশ্রুতি রাখা তাদের দায়িত্ব এবং প্রতিশ্রুতি তাদের রাখতে হবে। এ জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।’ কমিটির প্রতিবেদন অনুসারে সুদহার এক অঙ্কে নেমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সূত্র মতে, সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত দেড় বছরে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক দফায় দফায় ৯টি সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু সরকারি ব্যাংক এবং কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক ছাড়া বাকিগুলো ঋণে সুদহার এক অঙ্কে নামায়নি। সুদহার এক অঙ্কে না এলেও ৯টি সুবিধার চারটিতেই ব্যাংকগুলো ২৫ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা পেয়েছে।

করপোরেট করহার কমানোয় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা সুবিধা : গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ব্যাংক-কম্পানির করপোরেট করহার ৪২.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। ফলে ব্যাংকগুলো ২.৫ শতাংশ ট্যাক্স সুবিধা পায়। এতে ব্যাংকগুলো ১৩ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকার সুবিধা পায়।

নগদ জমা সংরক্ষণ হারে সুবিধা : ব্যাংকগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১৫ এপ্রিল থেকে নগদ জমা সংরক্ষণ হার (সিআরআর) কমিয়ে দ্বি-সাপ্তাহিক গড় ভিত্তিতে ৫.৫ শতাংশ এবং দৈনিক ভিত্তিতে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছরের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত হিসাবে ব্যাংকগুলো এ ক্ষেত্রে ১১ হাজার ১১২ কোটি টাকার সুবিধা পেয়েছে।

কৃষি খাতে রক্ষিতব্য সাধারণ প্রভিশন সংরক্ষণের হারে সুবিধা : ব্যাংক সংগঠনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি খাতে প্রদত্ত ঋণের বিপরীতে রক্ষিতব্য সাধারণ প্রভিশন সংরক্ষণের হার ২.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে এতে ব্যাংকগুলো ৫৩৪ কোটি টাকা সুবিধা ভোগ করেছে।

গৃহায়ণ খাতে রক্ষিতব্য সাধারণ প্রভিশন সংরক্ষণ হারে সুবিধা : কৃষি খাতের মতোই গৃহায়ণ খাতে রক্ষিতব্য সাধারণ প্রভিশন সংরক্ষণ হারে সুবিধা দেওয়া হয়। গৃহায়ণ খাতে সাধারণ প্রভিশন সংরক্ষণের হার ২ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এতে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ২৫৫ কোটি টাকা সুবিধা পায়।

সব মিলিয়ে শুধু এ চার সুবিধা থেকে ব্যাংকগুলোর লাভ হয়েছে ২৫ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। এ ছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সরকারি তহবিল জমার হার বৃদ্ধি, পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত থাকার মেয়াদ ও একক পরিবারের সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি, ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ১০ বছর মেয়াদে পুনঃ তফসিল এবং ঋণ শ্রেণীকরণ নীতিমালা শিথিলকরণ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। দেড় বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি এক অঙ্কের সুদহার। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল একপ্রকার বাধ্য হয়েই সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে কমিটি গঠন করে দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক ডিজি ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, ঋণের সুদ এক অঙ্কে নামিয়ে আনার অজুহাতে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন নানা সুবিধা নিয়েছে। আসলে এদের এসব সুবিধা দিয়ে লাভ নেই। বরং সরকারের উচিত খেলাপি ঋণ কমানোতে মনোযোগ দেওয়া। খেলাপি ঋণ কমলে ঋণের সুদহার এমনিতে এক অঙ্কে নেমে আসবে। এ জন্য প্রণোদনা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা