kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ জানুয়ারি ২০২০। ৭ মাঘ ১৪২৬। ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

কেরানীগঞ্জে প্লাস্টিক কারখানায় আগুন

বার্ন ইউনিটে ১৮ শ্রমিকের ১০ জনই লাইফ সাপোর্টে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বার্ন ইউনিটে ১৮ শ্রমিকের ১০ জনই লাইফ সাপোর্টে

কেরানীগঞ্জে প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে আফসানার স্বামী ফারুক হোসেনও আছেন, যাঁর লাশ রাখা আছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। গতকাল সেখানেই ‘ভবিষ্যৎ’ আঁকড়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন আফসানা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধদের মধ্যে ১৮ জনের কেউই আশঙ্কামুক্ত নন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন এসব দগ্ধ রোগীর মধ্যে ১০ জনকেই লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। ওই অগ্নিকাণ্ডে মৃতদের মধ্যে ১২ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এদিকে আগুন লাগা ‘প্রাইম প্লেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ নামের কারখানাটি সিলগালা করে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত দেবনাথ গতকাল শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে কারখানাটি সিলগালা করে দেন।

গতকাল বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা গেছে চিকিৎসাধীন রোগীদের স্বজনরা আছেন চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। দগ্ধদের চিকিৎসার বিষয়ে জানতে চাইলে বার্ন ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘দগ্ধদের কারো কারো চেহারাটুকুও চেনা যাচ্ছে না। তাদের শ্বাসনালি খুব খারাপভাবে পুড়ে গেছে। এখানে চিকিৎসাধীন ১৮ রোগীর মধ্যে ১০ জনকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে আব্দুর রাজ্জাক নামের একজনের শরীরের শতভাগ পুড়ে গেছে। অন্য অনেকের শরীরের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পুড়েছে।’

হাসপাতাল সূত্র জানায়, দগ্ধ ১৮ জনের মধ্যে ১০ জন শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে ভর্তি রয়েছেন। তাঁদের শরীরের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পুড়ে গেছে। এ ছাড়া বার্ন ইউনিটের কেবিনে থাকা আটজনের শরীরের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পোড়া।

চিকিৎসকরা বলছেন, চিকিৎসাধীন কোনো রোগীই এখনো শঙ্কামুক্ত নন। এ ছাড়া কর্তৃপক্ষের নিষেধের পরও দুর্জয় দাস নামের এক রোগীকে কেরানীগঞ্জের বাসায় নিয়ে গেছেন তাঁর বাবা মন্টু দাস। ৯৫ শতাংশ দগ্ধ ওই রোগীর সর্বশেষ অবস্থা জানা যায়নি।

বার্ন ইউনিট সূত্র জানায়, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ার হিজলতলা এলাকায় প্রাইম প্লেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামের কারখানায় গত বুধবার বিকেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন ঘটনাস্থলে মারা যান। ১২ জন মারা গেছেন চিকিৎসাধীন অবস্থায়। এই ১২ জনের মধ্যে ১০ জনের মরদেহ গত বৃহস্পতিবার রাতে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর দুজনের লাশ গতকাল তাঁদের পরিবার নিয়ে গেছে। মৃতরা সবাই ওই কারখানার কর্মী ছিলেন।

ঢাকা জেলার সহকারী কমিশনার আব্দুল আওয়াল জানান, লাশ হস্তান্তরের পাশাপাশি দাফনের জন্য মৃতদের প্রত্যেকের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আপাতত ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। যাঁদের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে তাঁরা হলেন—কেরানীগঞ্জের আলম (৩৫), পিরোজপুরের জাহাঙ্গীর হোসেন (৫৫), নরসিংদীর বাবলু (২৬), নড়াইলের রায়হান বিশ্বাস (১৬), পটুয়াখালীর ইমরান হাওলাদার (১৮), বরিশালের বাকেরগঞ্জের আব্দুল খালেক (৩৫), মাগুরার জিনারুল মোল্লাহ (৩২), জয়পুরহাটের সুজন দেওয়ান (১৯), মুন্সীগঞ্জের ফয়সাল দেওয়ান (২৪), টাঙ্গাইলের সালাউদ্দিন (২৬), জয়পুরহাটের ওমর ফারুক (৩২) ও মেহেদী হাসান। আরো একজনের মরদেহ মর্গে রয়েছে, যাঁর হাতের আংটি দেখে মাহবুব হোসেন বলে শনাক্ত করেছে একটি পরিবার। তবে আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাঁর ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে।

গতকাল শুক্রবার ছেলে মাহবুব হকের লাশ শনাক্ত করতে মর্গে ডিএনএ নমুনা দিতে এসে শোকে বারবার মূর্ছা যান বাবা গুলজার হোসেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি জানান, আগুনে পুড়ে যাওয়া ছেলেকে চেনার উপায় নেই। হাতের ব্রেসলেট দেখে লাশ শনাক্ত করতে পেরেছেন।

থানায় মামলা, গাঢাকা দিয়েছেন মালিক

কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, প্রাইম প্লেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা হয়েছে। নিহত আলম ও রাজ্জাকের ছোট ভাই জাহাঙ্গীর বাদী হয়ে কারখানা মালিক নজরুল ইসলামসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরো ১০-১২ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেছেন।

এদিকে গত বুধবার আগুন লাগার ঘটনার পর থেকেই কারখানার মালিক নজরুল ইসলাম গাঢাকা দিয়েছেন। তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের নম্বরটিও ঘটনার পর থেকে বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলে থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি শাহ জামান বলেন, ‘আগুন লাগার ঘটনায় নিহত আলমের ছোট ভাইয়ের দায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে—কারখানার মালিক নজরুল ইসলাম পরিকল্পিতভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে তাঁর দুই ভাইসহ অন্য শ্রমিকদের হত্যা করেছেন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে মালিক পলাতক রয়েছেন। তাঁকে গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে। আশা করি দ্রুতই তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারব। আর পুড়ে যাওয়া কারখানা ঘিরে কেউ যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য কারখানাটি পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।’

আরো দুটি কারখানা সিলগালা : গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো কেরানীগঞ্জে অবৈধ কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। দুপুরে শুভাঢ্যা ইউনিয়নে অবৈধ কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন কেরানীগঞ্জের ইউএনও অমিত দেবনাথ এবং কেরানীগঞ্জ সহকারী কমিশনার ভূমি ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট কামরুল হাসান সোহেল। অভিযানে আগুনে পুড়ে যাওয়া কারখানাটির পাশেই ‘মায়ের দোয়া’ ও ‘মক্কা ডায়িং’ নামে দুটি কারখানা সিলগালা করা হয়।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অমিত দেবনাথ বলেন, শ্রমিকদের জন্য অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ এবং কাগজপত্র ত্রুটিপূর্ণ থাকায় ডায়িং কারখানা দুটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। কেরানীগঞ্জে অবৈধ কারখানার বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত থাকবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা