kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

রোহিঙ্গা ইস্যুতে টিআইবি

নিজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা মানছে না জাতিসংঘ

► প্রত্যাবাসন না হওয়া সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়, কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা
► সংকট মোকাবেলায় এরই মধ্যে সরকারের ব্যয় কমপক্ষে ২৩০৮ কোটি টাকা

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নিজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা মানছে না জাতিসংঘ

অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে স্বচ্ছতা প্রত্যাশা করলেও জাতিসংঘ নিজেই তা মানছে না বলে অভিযোগ করেছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল  ঢাকায় ‘বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের (রোহিঙ্গা) নাগরিকদের বাংলাদেশে অবস্থান : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে টিআইবি ওই অভিযোগ করে।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘আমরা জাতিসংঘের কাছে রোহিঙ্গা কর্মসূচির পরিচালনা ব্যয় সম্পর্কে বেশ কয়েকবার তথ্য চেয়েছি। তারা আমাদের বলেছে, সর্বনিম্ন পরিচালনা ব্যয় ৩ শতাংশ ও সর্বোচ্চ ৩২ শতাংশ। তবে তারা নিজেরা কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করে না। বিভিন্ন সংস্থা সেগুলো বাস্তবায়ন করে।’

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জাতিসংঘ নিজেকে স্বচ্ছ সংস্থা হিসেবে দাবি করলেও বাস্তবে তা নয়। তিনি বলেন, কেবল একটি সংস্থা তাদের পরিচালনা ব্যয় সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়েছে। তবে তারাও এই তথ্য প্রকাশ করতে চায় না।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বাগত জানানো হলেও এর ফলে বাংলাদেশ বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বাংলাদেশ সরাসরিভাবে আর্থিক বোঝার পাশাপাশি বহুমুখী আর্থ-সামাজিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সরকারের বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত তথ্য মতে সংকট মোকাবেলায় এরই মধ্যে সরকারের কমপক্ষে দুই হাজার ৩০৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।’ তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সহায়তার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা ধরে রাখার সম্ভাবনা কম দেখা যাচ্ছে এবং প্রয়োজনের তুলনায় আন্তর্জাতিক সূত্র থেকে অর্থের বরাদ্দ কমে আসছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে দীর্ঘকাল অবস্থান করার সম্ভাবনা প্রকট হচ্ছে। তাই সরকারের উচিত হবে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে এই সমস্যার বহুমুখী সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন প্রাক্কলন করা এবং তার ওপর ভিত্তি করে পর্যাপ্ত সম্পদ ও সক্ষমতা অর্জনের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো।

মানবিক সহায়তা কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী সুশাসনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে বলে উল্লেখ করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম এক ধরনের বিবেকমান শিল্পের মতো। এ জন্যই বিশ্বব্যাপী জাতিগত নিধন ও গণহত্যার মতো নৃশংসতার প্রস্তুতি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের চোখের সামনে ঘটার পরও সেগুলো প্রতিরোধ করা হয় না। বরং ঘটনা ঘটার পর প্রতিকার করার জন্য সবাই মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে যৌক্তিকভাবেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। রোহিঙ্গা সংকটও এর ব্যতিক্রম নয়। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংস অভিযানের প্রস্তুতির তথ্য জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলের অজানা ছিল—এমনটি ধারণা করা অযৌক্তিক। তাই আন্তর্জাতিক আদালতে সত্যিকার অর্থেই ন্যায়বিচার চাইলে যারা এই জাতিগত নিধনের জন্য দায়ী তাদের যেমন বিচারের আওতায় আনা উচিত, তেমনি যারা এই নিধন ঘটতে যাচ্ছে জেনেও পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়নি কিংবা প্রতিরোধমূলক কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি বলে অভিযোগ আছে তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সামর্থ্য অনুযায়ী কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের একগুঁয়েমি এবং ভারত, চীন, জাপানের মতো শক্তিশালী দেশগুলোর কৌশলগত সমর্থনের ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে প্রতিবন্ধকতা অব্যাহত রাখতে মিয়ানমার অনড়। তাই এটি সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়, কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা।’

১৩ সুপারিশ : সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের বিবেচনার জন্য ১৩ দফা সুপারিশ পেশ করা হয়েছে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় এফডি-৭-এর আওতায় প্রকল্পগুলোকে বিশেষ ও জরুরি হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করার অনুমতি ও ছাড়পত্র প্রচলিত ব্যবস্থার বদলে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) মাধ্যমে করতে হবে; ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় আরআরআরসির জনবল বাড়াতে হবে এবং প্রতিটি ক্যাম্প ইনচার্জের (সিআইসি) আওতায় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করতে হবে; প্রতিটি ক্যাম্পে রাতে সিআইসির অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে; সিআইসিদের মানবিক নীতিগুলো মেনে চলার বাধ্যবাধকতাসহ এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে; মানবিক সহায়তায় খাতভিত্তিক প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে; রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক ব্যয়সহ বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব নিরূপণ করে তা মোকাবেলায় কৌশলগত পরিকল্পনা নিতে হবে এবং তার অর্থায়নসহ বাস্তবায়ন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে হবে; মানবিক সহাতায় প্রকল্প, অর্থ ব্যয়ের বিভিন্ন খাত, বাস্তবায়নের স্থান ও অগ্রগতিবিষয়ক তথ্য একটি সমন্বিত ওয়েবসাইটে প্রকাশ এবং তা হালনাগাদ করতে হবে; রোহিঙ্গাদের সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে বিভিন্ন রাষ্ট্র, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতা সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক  মোহাম্মদ রফিকুল হাসান, সিনিয়র প্রগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম. আকরাম এবং আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক শেখ মনজুর-ই-আলম। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন গবেষণা ও পলিসি বিভাগের প্রগ্রাম ম্যানেজার শাহনুর রহমান এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রগ্রাম ম্যানেজার নাজমুল হুদা মিনা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা