kalerkantho

বুধবার। ৬ মাঘ ১৪২৭। ২০ জানুয়ারি ২০২১। ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

এনসিসি ব্যাংকের এমডির খুঁটির জোর কোথায়

ব্যাপক দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলন, তবু ব্যবস্থা নিতে কালক্ষেপণ

জিয়াদুল ইসলাম   

৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



এনসিসি ব্যাংকের এমডির খুঁটির জোর কোথায়

মোসলেহ উদ্দিন

মানি লন্ডারিং অপরাধে সম্পৃক্ত থাকার পরও বহাল তবিয়তে আছেন এনসিসি ব্যাংকের এমডি মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ। তাঁর বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও কর ফাঁকির সুনির্দিষ্ট তথ্য উদ্ঘাটন হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি তদন্ত চলাকালে সাময়িক বরখাস্ত পর্যন্ত করা হয়নি তাঁকে। এতে অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে—কোন খুঁটির জোরে তাঁর প্রতি এমন আচরণ; কিভাবে তিনি এখনো এমডি পদে বহাল আছেন।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, সরকারি দলের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে সখ্য আছে মোসলেহ উদ্দিনের। এ ছাড়া এনসিসি ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যানের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক রয়েছে তাঁর। ফলে তদন্তকাজে কালক্ষেপণ এবং ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হচ্ছে।

যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো ব্যাংকের এমডির বিষয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ মিললে ব্যাংক কম্পানি আইনের ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সে অনুযায়ী এনসিসি ব্যাংকের এমডির বিষয়ে বিএফআইইউয়ের পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রেরণ করা হয়। এ ছাড়া মানি লন্ডারিং ও কর ফাঁকিসংক্রান্ত বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুদক ও এনবিআরে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। বিএফআইইউর যা করণীয় সেটা করা হয়েছে।’

গত এপ্রিলের দিকে বিএফআইইউ ব্যাংক মনিটরিং ইউটিতে সংরক্ষিত ক্যাশ ট্রানজেকশন রিপোর্ট (এসটিআর) পর্যালোচনায় দেখতে পায়, এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন ও তাঁর স্ত্রী লুনা শারমিনের নামে যমুনা ব্যাংকে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক অঙ্কের নগদ লেনদেন হয়েছে। সে অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে অনুসন্ধান চালিয়ে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শেয়ারবাজারে মোসলেহ উদ্দিন ও তাঁর স্ত্রীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১৪টি ব্যাংক হিসাব, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ছয়টি মেয়াদি আমানত, সীমাতিরিক্ত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ এবং শেয়ারবাজারে চারটি বিও হিসাব পরিচালিত হওয়ার তথ্য পায় বিএফআইইউ। এতে মোট ৩৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা (মার্কিন ডলার বাদে) অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য উদ্ঘাটিত হয়।

বিএফআইইউর পর্যালোচনায় বলা হয়, মোসলেহ উদ্দিন কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা থাকা অবস্থায় নৈতিকস্খলন, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও কর ফাঁকির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থের মালিক হয়েছেন, যা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২-এর ২(শ)(১) এবং ২(শ)(১৯)-এ বর্ণিত অপরাধ। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শেয়ারবাজারে হিসাব খোলার সময় তিনি অর্থের উৎস সম্পর্কে অসত্য তথ্য দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা ও বিনিয়োগ করেছেন, যা মানি লন্ডারিংয়ের ভাষায় প্লেসমেন্ট হিসেবেও পরিগণিত। সঞ্চয়পত্র ক্রয় বিধিমালার সর্বোচ্চ সীমা একের পর এক লঙ্ঘন করেছেন। নিজ নামে ও স্ত্রীর নামে সাড়ে ছয় কোটি টাকার অধিক সঞ্চয়পত্র ক্রয় ও মুনাফা উত্তোলন করেছেন, যা শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের শামিলই নয়, একটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে নৈতিকস্খলনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ ধরনের একজন ব্যক্তির কাছে একটি ব্যাংক তথা আমানতকারীদের আমানত সুরক্ষিত নয় মর্মে প্রতীয়মান হয়। এ ছাড়া এনবিআরে দাখিলকৃত আয়কর বিবরণীতেও বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদের তথ্য গোপন করে মোটা অঙ্কের রাজস্ব থেকে সরকারকে বঞ্চিত করেছেন। বিএফআইইউ বলছে, নৈতিকস্খলন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অর্থ-সম্পদ অর্জনের বিষয়টি দুদক কর্তৃক তদন্তযোগ্য অপরাধ। আর কর ফাঁকির বিষয়টি এনবিআর কর্তৃক তদন্তযোগ্য অপরাধ। এ ছাড়া নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃকও বিষয়টি পর্যালোচনা করে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। 

ব্যাংক কম্পানি আইনের ১৫(৪) ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিযুক্ত হন। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যাংকের আমানতকারীদের ক্ষতিকর কার্যকলাপ রোধকল্পে বা জনস্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই এমডির বিরুদ্ধে ব্যাংক কম্পানি আইনের বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। জানা যায়, বিএফআইইউর পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন পাওয়ার পর মোসলেহ উদ্দিনের অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে তাঁর কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়। তিনি যে ব্যাখ্যা দেন তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। এর প্রেক্ষিতে তাঁকে অপসারণ নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে তিন মাস আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামানকে প্রধান করে তিন সদস্যের স্ট্যান্ডিং কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এনসিসির এমডিকে শুনানির জন্য ডাকা হয়নি বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে এস এম মনিরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

সূত্র বলছে, মোসলেহ উদ্দিন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) ২০১৮ সালে দাখিলকৃত আয়কর বিবরণীতে তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১৮টি হিসাবের তথ্য গোপন করেছেন, যা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ২(শ) ধারা মোতাবেক করসংক্রান্ত অপরাধ। সূত্র বলছে, এনবিআরে মিথ্যা তথ্য দাখিলের পর জরিমানা বাবদ তিনি চার কোটি টাকা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু তাঁর হিসাবগুলো জব্দ থাকার পরও নগদে এত টাকা কোথায় পেয়েছেন, এর উৎস কী সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। মোসলেহ উদ্দিনের বিষয়ে দুদক থেকেও তদন্ত শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে দুদকের একটি সূত্র।

জানা যায়, গত ২৭ জুলাই মোসলেহ উদ্দিন ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট নামে পাঁচটি ব্যাংক ও দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত হিসাবসমূহ মহানগর দায়রা জজ ও সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের নির্দেশে জব্দ করা হয়েছে। ওই সব হিসাবে জমা স্থিতির পরিমাণ প্রায় আট কোটি টাকা।

মোসলেহ উদ্দিনের হিসাবে যত অসংগতি : মোসলেহ উদ্দিনের এনসিসি ব্যাংকের বেতন হিসেবে প্রতি মাসের ২৫ তারিখে পাঁচ লাখ ৯৯ হাজার টাকা জমা হয়। এটি মূলত বৈতনিক হিসাব হলেও বিভিন্ন সময় নগদ ও ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হওয়াও পরিলক্ষিত হয়। অন্যদিকে, এ হিসাব থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নগদে, ট্রান্সফার, ক্লিয়ারিং ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। এ ছাড়া ব্যাংকটিতে তাঁর নামে পরিচালিত আরএফসিডি হিসাবে বিভিন্ন সময় পাঁচ হাজার ডলার করে অর্থ জমা হয়। ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি তারিখে উক্ত হিসাবে আট হাজার ডলার জমা হয় যার সমর্থনে এফএমজে ফর্মের কপি পাওয়া যায়নি। এনসিসি ব্যাংকে যোগদানের আগে মোসলেহ উদ্দিন যমুনা ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। ওই ব্যাংকে নিজের ও তাঁর স্ত্রীর নামে পরিচালিত যৌথ হিসাবে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা জমা হয়েছে; যার অধিকাংশই তৃতীয় পক্ষীয় অনলাইন ট্রান্সফার, ক্লিয়ারিং ও নগদ জমার মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। দি সিটি ব্যাংকে মোসলেহ উদ্দিনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট তিনটি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ছয় কোটি ৫০ লাখ টাকা জমা করা হয়েছে; যার উৎস বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, ইন্স্যুরেন্স কম্পানি, ক্যাপিটাল মার্কেট এবং এনসিসি ব্যাংকের কর্মকর্তারা। একইভাবে প্রাইম ব্যাংকে তাঁর নামে পরিচালিত হিসাবে জমা চার কোটি ৩৩ লাখ টাকা; যার উৎস কনসালট্যান্সি ফার্ম, কনস্ট্রাকশন কম্পানি, লিমিটেড কম্পানি, প্রোপ্রাইটরশিপ ফার্ম, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্যাপিটাল মার্কেট। রিলায়েন্স ফাইন্যান্স নামের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মোসলেহ উদ্দিনের নামে চার কোটি টাকার এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেস প্রতিষ্ঠানে দুই কোটি টাকার মেয়াদি আমানত হিসাব খোলা হয়েছে। এ হিসাবগুলো খোলার ফর্মে অর্থের উৎস হিসেবে চাকরি (বেতন-ভাতা) উল্লেখ করা হলেও বিএফআইইউয়ের বিশ্লেষণে অর্থের প্রকৃত উৎস এনসিসি, যমুনা ও ট্রাস্ট ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাইভেট চিহ্নিত হয়; যা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২-এর ২(এফ) ধারায় বর্ণিত সংজ্ঞা অনুযায়ী মানি লন্ডারিং কর্মকাণ্ড। এ ছাড়া ক্যাপিটাল মার্কেটে মোসলেহ উদ্দিনের কয়েক কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে; যা তাঁর পেশা ও অর্থের উৎসর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

নিয়ম বহির্ভূতভাবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ : সঞ্চয়পত্র বিধিমালা অনুযায়ী, মহিলা ও ৬৫ বছরের বেশি বয়স্ক নাগরিক একক নামে ৪৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন। আর যৌথ নামে কিনতে পারেন সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকার। কিন্তু মোসলেহ উদ্দিন ও তাঁর স্ত্রী ছয় কোটি টাকার অধিক সঞ্চয়পত্র কিনেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি পেনশনার না হয়েও চাকরিরত অবস্থায় দুটি ব্যাংক থেকে ৬০ লাখ টাকার পেনশনার সঞ্চয়পত্র কিনেছেন। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্র কেনার কোনো তথ্যই বিএফআইইউকে অবহিত করেননি তিনি, যা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ২৩-এর ৪ ধারায় জরিমানাযোগ্য অপরাধ।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা