kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

ফাঁদ পেতে ৩৫ জন পাকি ঘাতককে মেরে ফেলি

মো. আব্দুল হালিম, ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ)   

৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ফাঁদ পেতে ৩৫ জন পাকি ঘাতককে মেরে ফেলি

মুক্তিযোদ্ধা, মো. হাবিবুর রহমান

১৩ জুলাই ১৯৭১ সাল। কম্পানি কমান্ডার শেখ মোজাফফরের নেতৃত্বে ৮০ থেকে ৯০ জন মুক্তিযোদ্ধা ত্রিশালের কাটাখালী বাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবস্থান করছি। আমার গ্রাম (ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার বালিয়ান ইউনিয়নের তেলিগ্রামের চামাড়বাজাইল গ্রাম) থেকে খবর আসে তেলিগ্রাম এলাকার লাল মাহমুদ, মেঘা ডাক্তার ও আক্কাছ আলীকে রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ফুলবাড়িয়া থানায় ধরে নিয়ে গেছে। খবর পেয়ে খুব ভোরে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গ্রামে আসি আমি হাবিবুর রহমান, শেখ মোজাফফর, বাবু মান্নান, এ কে এম ফজলুল হক, খোরশেদ আলী, মোজাম্মেল হক, ইদ্রিস আলীসহ ১৭ জন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা। গ্রামে এসে খবর পাই ফুলবাড়িয়া থানা থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দল ময়মনসিংহ যাবে। সকাল থেকে আমরা তেলিগ্রাম লক্ষ্মীপুর বাজারের কাছেই সড়কে অ্যামবুশ (ফাঁদ) পেতে বসে থাকি। প্রায় দুই ঘণ্টা পর পাকিস্তানি সেনা বোঝাই বড় একটি ট্রাক লক্ষ্মীপুর ব্রিজ পর্যন্ত আসতেই চারদিক থেকে গুলি ছুড়তে শুরু করি মুক্তিযোদ্ধারা। এমন আচমকা হামলার মুখে দিশা হারিয়ে গাড়ি থেকে লাফিয়ে সড়কের উত্তর ও পূর্ব পাশে কচুরিপানায় ভরপুর হাঁটুপানির একটি ডোবায় পড়ে হানাদাররা। সেখানে ব্রাশফায়ার (বার্স্টফায়ার) করে মুহূর্তের মধ্যেই ৩৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে মেরে ফেলি আমরা। গাড়িতে থাকাহানাদারদের অস্ত্র-গোলাবারুদ হস্তগত হয় আমাদের। এরপর গ্রেনেড ছুড়ে গাড়িটি ধ্বংস করে চলে যাই কুতুবখানা বাজার ক্যাম্পে। হানাদাররা ফুলবাড়িয়া থেকে রওনা করার আগে লাল মাহমুদ, মেঘা ডাক্তার ও আক্কাছ আলীকে নির্মম নির‌্যাতন করে ছেড়ে দেয়।এদিকে আমরা পরিকল্পনা করি দাপুনিয়া ব্রিজ উড়িয়ে দেব। বড় ভাই চান মিয়াকে রেকি করতে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ভাই দাপুনিয়ায় পৌঁছলে রাজাকাররা তাকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলে। ভাইয়ের লাশটি পর্যন্ত খুঁজে পাইনি। একাধিক সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। ঘাতকদের বুলেটে চোখের সামনে গলা কাটা মুরগির মতো অনেক সহযোদ্ধাকে ছটফট করতে দেখেছি। নিজেও দুইবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে আসি। মুক্তিযুদ্ধের সেই সব উত্তাল দিনের কষ্ট আর গৌরবমাখা ঘটনাসমূহের কিছু স্মৃতি এভাবে তুলে ধরেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান।

ফুলবাড়িয়ার বালিয়ান ইউপির তেলিগ্রাম চামাড়বাজাইল গ্রামের বাড়িতে বসে কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। এখন ৭৪ বছর বয়সে স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যার কারণে প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি থেকে বের হন না। স্ত্রী এবং চার ছেলে এক মেয়ে রয়েছে তাঁর। যুদ্ধদিনের কথা বলতে গিয়ে বারবার আবেগে কেঁদে ওঠেন তিনি। কেন যুদ্ধে গিয়েছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তরে যুদ্ধাহত এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, পাকিস্তানিদের অত্যাচার-নির‌্যাতন, মা-বোনদের ওপর চালানো নিপীড়ন-ধর্ষণের কারণে সম্মুখযুদ্ধ নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমার। ফুলবাড়িয়ার রাঙ্গামাটিয়া গ্রামে ৭২ ঘণ্টার ওপরে সম্মুখযুদ্ধ হয় পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে। সেখানে ২০ থেকে ২৫ জন হানাদার মারা যায়। আমাদেরও অনেকে আহত হয়েছে। একপর‌্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনী সেখান থেকে পিছু হটে। মুক্তাগাছা বটতলায় তাদের সঙ্গে ফের এক ঘণ্টা সম্মুখযুদ্ধ করি। সহযোদ্ধা ইদ্রিস কোমরের নিচে গুলিবিদ্ধ হয়। রক্তাক্ত ইদ্রিসকে নিয়ে আমরা পিছু হটি। ধুরধুরিয়া গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুুদ্ধ করি। অনেক রাজাকার ও আলবদর মারা যায়। সেখানে আ. রশিদ ও আমি গুলিবিদ্ধ হই। আমার বাঁ পায়ে গুলি লেগেছিল।

হাবিবুর রহমান ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। পেশোয়ার শহরে কর্মরত থাকাকালে ১৯৭১ সালে ৬ ফেব্রুয়ারি তিন মাসের ছুটি নিয়ে বাড়িতে আসেন। ছুটিতে থাকা অবস্থায় ২৬ মার্চ নিকটবর্তী সেনাছাউনিতে যোগদান করতে জরুরি নির্দেশ দেয় সেনা কর্তৃপক্ষ। সেই নির্দেশ অমান্য করে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে যান। সেখানে তাঁর সঙ্গী অন্য দুজন সেনা সদস্য ও দুজন ছাত্র ভারতীয় বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। তাঁদের পাঁচজনকে প্রথমে পাকিস্তানি গুপ্তচর মনে করে হত্যার সিদ্ধান্ত হয়। মৃত্যু নিশ্চিত জেনে কলেমাও পড়তে শুরু করেন তাঁরা। এ সময় মুক্তিবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের তৎপরতায় তাঁরা মুক্ত হন। এরপর এই পাঁচজনকে ডালু ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। গেচুয়াপাড়া এলে বিএসএফ ক্যাপ্টেন বালজিৎ সিং ছাত্র দুজনকে ট্রেনিংয়ের জন্য নিয়ে যান। আর তাঁদের নেওয়া হয় লেফটেন্যান্ট মাহবুব, ইপিআর সুবেদার জিয়াউল হক, সুবেদার আজিজুল হক ও আমজাদ হোসেনের কাছে। সেখান থেকে সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশের পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর অনেক সফল অভিযান চালানোর পর ডালু ক্যাম্প থেকে হাবিবুরসহ ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধাকে কিছু অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে এপ্রিল মাসে নালিতাবাড়ী সীমান্ত পথে দেশে পাঠিয়ে দেয়। ফুলবাড়িয়ায় এসে বাবু মান্নানের নেতৃত্বে ক্যাম্প করা হয়। পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ, ইপিআর ও সেনা সদস্যরা যাঁরা ভারতে যেতে পারেননি, তাঁদের খোঁজখবর নিয়ে সবাইকে একসঙ্গে করে অস্ত্র সংগ্রহ শুরু করেন তাঁরা। একপর‌্যায়ে ৩০০ থেকে ৪০০ সদস্য হয়ে যায়। একটি কাঁঠালবাগানে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একসময় কাদের সিদ্দিকী ও লতিফ সিদ্দিকী ক্যাম্প পরিদর্শনে আসেন। যুদ্ধ শেষে ১৯৭২ সালে বিডিআরে সৈনিক হিসেবে চাকরি হয়। পরে পদোন্নতি পেয়ে নায়েক হন। ১৯৮৪ সালে মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর বিডিআর থেকে অবসরে যান।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা