kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজি, নৈরাজ্য

৪৭ আমদানিকারককে শুল্ক গোয়েন্দায় তলব

ফারুক মেহেদী   

২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



৪৭ আমদানিকারককে শুল্ক গোয়েন্দায় তলব

কারসাজি করে দাম বাড়ানোর অভিযোগে দেশের শীর্ষ ৪৭ পেঁয়াজ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মালিকদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। আগামী ২৫ ও ২৬ নভেম্বর সকাল থেকে সংস্থার কার্যালয়ে তাঁদের হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অতি মুনাফার অভিযোগে এ রকম মোট ৩৪১ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের তালিকা করেছে শুল্ক গোয়েন্দা। তারাও নজরদারিতে আছে। প্রয়োজনে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদেরও ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

পেঁয়াজ নিয়ে চরম নৈরাজ্য চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। ৩০ টাকা কেজিতে কেনা পেঁয়াজ ২৫০ টাকায় বিক্রির বিষয়টি গেল সপ্তাহে কালের কণ্ঠে প্রকাশ পায়। শুল্ক বিভাগের তথ্যের ভিত্তিতে করা ওই প্রতিবেদন তৈরির সময় বিষয়টি এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার নজরে আনা হয়। ওই সময় তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, এ ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরে তিনি শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরকে কারসাজির সঙ্গে জড়িত পেঁয়াজ আমদানিকারদের তালিকা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তারই ভিত্তিতে এনবিআর কাস্টমসের অত্যাধুনিক সফটওয়্যার অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড থেকে তথ্য নিয়ে যাচাই-বাছাই করে ওই তালিকা তৈরি করে।

তালিকা থেকে দেখা যায়, গেল আগস্ট মাস থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত ৩৪১ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান দেশের আটটি স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশন দিয়ে মোট এক লাখ ৬৭ হাজার ৮০৬ টন পেঁয়াজ আমদানি করে। এর পেছনে খরচ হয় ৬৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে আসে ৫১ হাজার ৬৪৯ টন পেঁয়াজ। ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আসে ৪৬ হাজার ৩৭০ টন, টেকনাফ দিয়ে আসে ৩৪ হাজার ৮৬১ টন, হিলি দিয়ে ২৪ হাজার ৩০৮ টন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ছয় হাজার ৬৯৩ টন, বাংলাবান্ধা দিয়ে ১৭১ টন ও ঢাকা কাস্টম হাউস দিয়ে আসে ২৭ টন পেঁয়াজ। কারসাজির সন্দেহে মোট ৩৪১ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব আমদানিকারক এক হাজার টনের বেশি পেঁয়াজ এনেছে তাদেরই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ আমদানি করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুরাতন বাজারের টিএম এন্টারপ্রাইজ। এ প্রতিষ্ঠানটি ৯ হাজার ২০ টন পেঁয়াজ আনে ৩৯ কোটি ২৬ লাখ টাকায়। এরপর বেশি আনে একই জেলার ডাকবাংলা রোডের দীপা এন্টারপ্রাইজ। এ প্রতিষ্ঠান ১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকায় আনে পাঁচ হাজার ৬৯৩ টন।

৪৭ পেঁয়াজ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যরা হচ্ছে কানসাটের আরএম অ্যাগ্রো, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের নূর এন্টারপ্রাইজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিশ্বরোডের বিএইচ ট্রেডিং, নওগাঁর জগদীশ চন্দ্র রায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাজ্জাদ এন্টারপ্রাইজ, একই জেলার একতা সসা ভাণ্ডার, রাজশাহীর বোয়ালিয়ার ফুলমোহাম্মদ ট্রেডার্স, সাতক্ষীরার ফারহা ইন্টারন্যাশনাল, বগুড়ার সুমাইয়া এন্টারপ্রাইজ, একই জেলার হামিদ এন্টারপ্রাইজ, নাচোলের আলী রাইচমিল, হিলির খান ট্রেডার্স, ঢাকার বিজয়নগরের এসএম করপোরেশন, যশোরের এমএস রহমান ইমপেক্স, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোল্ডেন এন্টারপ্রাইজ, বগুড়ার রাজাবাজারের রায়হান ট্রেডার্স, সাতক্ষীরা সদরের সোহা এন্টারপ্রাইজ, একই জেলার মরিয়ম এন্টারপ্রাইজ, ভোমরা স্থলবন্দরের নূর এন্টারপ্রাইজ ও শামিম এন্টারপ্রাইজ।

দিনাজপুরের এমএস খান ট্রেডার্স, জয়পুরহাটের এমআর ট্রেডার্স, সাতক্ষীরার ডিএ এন্টারপ্রাইজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবনগরের টাটা ট্রেডার্স, টেকনাফের মা এন্টারপ্রাইজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের হুদা ইন্টারন্যাশনাল, খুলনার সাহা ভাণ্ডার, ভোমরা স্থলবন্দরের আরডি এন্টারপ্রাইজ, ঢাকার ফরাশগঞ্জের জেনি এন্টারপ্রাইজ, টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপের মাহি অ্যান্ড ব্রাদার্স, ভোমরা স্থলবন্দরের মেসার্স মুক্তা এন্টারপ্রাইজ, বগুড়া রাজাবাজারের রায়হান ট্রেডার্স, ভোমরা স্থলবন্দরের সাইফুল এন্টারপ্রাইজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের রিজু রিটু এন্টারপ্রাইজ, ফেনী সদরের জাবেদ অ্যান্ড ব্রাদার্স, টেকনাফের আলম অ্যান্ড সন্স, টেকনাফের নিউ বড় বাজার শপিংমল, ঢাকার ভাটারা থানা এলাকার রচনা ট্রেডিং কম্পানি, কেকে পাড়া টেকনাফের এসএস ট্রেডিং, ভোমরা স্থলবন্দরের সুপ্তি এন্টারপ্রাইজ, ঢাকার ফরাশগঞ্জের ব্রাদার্স ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, টেকনাফের আল মদিনা স্টোর, বগুড়া সদরের বিকে ট্রেডার্স, দিনাজপুর হাকিমপুরের ধ্রুব ফারিহা ট্রেডার্স ও বগুড়া রাজাবাজারের মেসার্স সালেহা ট্রেডার্স। এসব আমদানিকারক এক হাজার টনের বেশি পেঁয়াজ এনেছে।

এ ছাড়া ৯৩০ টন থেকে ৮০০ টন পর্যন্ত পেঁয়াজ এনেছে ১২ আমদানিকারক। ৭৭৮ টন থেকে ৬০০ টন পর্যন্ত এনেছে ১৭ আমদানিকারক। ৫৭৯ থেকে ৪০০ টন পেঁয়াজ এনেছে ২০ আমদানিকারক। ৩৯৯ টন থেকে ২০০ টন পর্যন্ত পেঁয়াজ এনেছে ৫৭ আমদানিকারক। ১৯৯ টন থেকে ১০০ টন পর্যন্ত পেঁয়াজ এনেছে ৫৯ আমদানিকারক ও ৯৯ টন থেকে এক টন পর্যন্ত আমদানি করেছে ১২৯ আমদানিকারক।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. শহিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেসব আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এক হাজার টনের বেশি পেঁয়াজ আমদানি করেছে, প্রথমে এমন ৪৭ প্রতিষ্ঠানের মালিকদের ডাকা হয়েছে। আগামী ২৫ নভেম্বর সোমবার শীর্ষ ১৩ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এর পরদিন অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। মূলত আমরা দেখব তাঁরা কোথায়, কার কার কাছে কী দামে বিক্রি করেছে, কী মজুদ ছিল ইত্যাদি। তাঁদের নথিপত্র দেখেই আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব। দ্বিতীয় দফায় হয়তো আরো যাঁরা আছেন তাঁদের ডাকা হতে পারে।’

সাবেক শুল্ক কর্মকর্তা ও এনবিআরের সাবেক ভ্যাট নীতির সদস্য আবদুল মান্নান পাটোয়ারী কালের কণ্ঠকে বলেন, আমদানিকারকরা সাধারণত এ ধরনের পণ্য আমদানি করে এর কেনা দাম, ব্যাংকঋণের সুদ, পচনশীল পণ্য হিসেবে কিছুটা অবচয়, পরিবহন ব্যয় ইত্যাদি ধরে এর পর মুনাফা রাখে। এটা ১০, ২০ বা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এটাই যুক্তিসংগত। এর বাইরে নয়। তবে এবার তো পেঁয়াজের দাম অনেক বেশি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শুল্ক গোয়েন্দার তদন্তে হয়তো বিষয়টি পরিষ্কার হবে যে প্রকৃতপক্ষে আমদানিকারকরা কত দামে পাইকারি বিক্রেতার কাছে বিক্রি করেছে। যদি ধরা পড়ে যে অযৌক্তিক মুনাফা করেছে, তাহলে তো অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হবে।

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা